বাংলাদেশে মুগ্ধ কিম

দারিদ্র্য বিমোচনে বাংলাদেশের অসাধারণ সাফল্যে অভিভূত বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম। দুইদিনের সফরশেষে গতকাল মঙ্গলবার রাতে ঢাকা ছাড়েন তিনি। এর আগে বিকেলে সফরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশকে জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবেলায় দুইশ কোটি ডলার সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। জানিয়েছেন বাংলাদেশকে দেখে তার মুগ্ধতার কথা। তবে বিনিয়োগ আকর্ষণে পিছিয়ে থাকা বাংলাদেশকে ব্যবসায় পরিবেশ উন্নত করার তাগিদ দিয়েছেন। সেইসঙ্গে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ দেখানো হবে বলেও উল্লেখ করেছেন তিনি।

প্রায় দশ বছর পর বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট পদমর্যাদার কেউ বাংলাদেশ সফর করলেন। জিম ইয়ং কিম ঢাকায় এসেছিলেন রবিবার রাতে। মঙ্গলবার পরিদর্শন করেছেন বরিশালের উপকূলীয় অঞ্চল। দুই দিনের সফরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতসহ সুশিল সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও সাক্ষাত করেন তিনি। সফর শেষে অভিজ্ঞতা বিনিময় করেন রাজধানীর আগারগাঁওস্থ বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসে।

সংবাদ সম্মেলনে বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম বলেন, ‘বাংলাদেশকে দেখে আমি মুগ্ধ। দারিদ্র্য বিমোচন দিবস পালন ছাড়াও বাংলাদেশে প্রত্যন্ত গ্রামীণ অঞ্চলে জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবেলায় জনগণ কী ভাবে নিজেদেরকে খাপখাইয়ে নিচ্ছে তা দেখেছি আমি। স্বাধীনতার জন্য বহু মানুষের আত্মত্যাগ, সরকারি ও বেসরকারি পর্যায় থেকে নেতৃত্ব উঠে আসা, দরিদ্র্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নতুন কৌশল, নারীর ক্ষমতায়ন এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় লড়াইসহ মুগ্ধতার অনেক উদাহরণ রয়েছে বাংলাদেশে। আমি এদেশের মানুষের উজ্জ্বল ভবিষ্যত্ দেখতে পাচ্ছি।’

পদ্মাসেতু নিয়ে অতীতে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন বাতিলের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে কিম বলেন, আমরা সব দেশের জন্যই একই নীতি পালন করি অর্থাত্ দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’। ভবিষ্যতে এ ধরনের বিষয় উদ্ভব হলে আমাদের একই নীতি থাকবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে বিনিয়োগে বিশ্বব্যাংক ঝুঁকি মনে করছে কিনা সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে কিম বলেন, নিরাপত্তা বিষয়ে আমি খুবই সন্তুষ্ট। তবে বিশ্বের কোন দেশই সন্ত্রাসের ঝুঁকিমুক্ত নয়। ফ্রান্স, বেলজিয়াম ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত দেশগুলোও সম্প্রতি ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার শিকার হয়েছে। আমি মনে করি বাংলাদেশে চমত্কার পরিবেশ বিরাজ করছে। নিরাপত্তা নিয়ে কোন উদ্বেগ নেই।

বিশ্বব্যাংক প্রধান আরো বলেন, বাংলাদেশের সাথে বিশ্বব্যাংকের সম্পর্ক নিবিড়। বিশ্বব্যাংক আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার (আইডা) মাধ্যমে গত ৪৫ বছরে ২৪ বিলিয়ন ডলার সহায়তা করেছে। বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় উন্নয়ন অংশীদার। আমরা বাংলাদেশ থেকে শিখছি এবং বাংলাদেশও আমাদের কাছ থেকে শিখছে। গত পাঁচ বছরে বিশ্বব্যাংকের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক আরো নিবিড় হয়েছে। আইডা ফান্ড থেকে বিশ্বব্যাংকের প্রতিশ্রুতির আকার ৯শ ৭০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স কর্পোরেশনের (আইএফসি) মাধ্যমে সাড়ে ৬৩ কোটি ডলার বিনিয়োগ হয়েছে। আসছে বছরগুলোতে আইডা ও আইএফসি দুটো খাতের মাধ্যমেই সহায়তা আরো বাড়ানো হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

বাংলাদেশে প্রথম সফর বিষয়ে তিনি বলেন, আমি ঘোষণা করছি আগামি তিন বছরে জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবেলা সংশ্লিষ্ট প্রকল্প বাস্তবায়নে ২ বিলিয়ন ডলার সহায়তা করা হবে। বরিশালের উপকূলীয় অঞ্চল প্রসঙ্গে বলেন, শিশুরা স্কুলে যাচ্ছে। একই ভবন স্কুল, সাইক্লোন শেল্টার এবং সম্মিলনকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহূত হচ্ছে। আমি স্কুলের শিশুদের সাথে কথা বলেছি, তারা বাল্য বিবাহ নিয়ে সচেতন। তারাও ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হতে চায়।

কিম বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ একটি। এই ঝুঁকি মোকাবেলায় বাংলাদেশ সরকারকে সহায়তার জন্য আমরা সব ধরনের সহযোগিতা করবো। বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। তবে ২০৩০ সালের মধ্যে দারিদ্র্য বিমোচন এবং নিম্ন মধ্য আয়ের দেশ হতে উচ্চ মধ্য আয়ের দেশে উন্নীত হতে বাংলাদেশের এখনও অনেক প্রতিবন্ধকতা রয়েছে।

এ বাধা মোকাবেলায় তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব দেয়ার আহ্বান জানান তিনি। এর প্রথমটি হলো ব্যবসায় পরিবেশ উন্নয়নের জন্য নীতি সহায়তার সংস্কার। দ্বিতীয়ত, সরকারের নেয়া ৭ম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়াতে হবে। তৃতীয়, সুশাসন শক্তিশালীকরণের বিষয়ে জোর দিতে হবে। কিম আরো বলেন, বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের মানুষের প্রতি সহযোগিতার হাত আরো বাড়িয়ে দেবে। বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রাধিকার, দারিদ্র্য বিমোচন, কর্মসংস্থানসহ বেসরকারি খাতের উন্নয়নে পাশে থাকবে বিশ্বব্যাংক। সংবাদ সন্মেলনে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ কান্ট্রি ডিরেক্টর চিমিয়াও ফান।