যেসব কারণে চীন বাংলাদেশকে গুরুত্ব দিচ্ছে

যেসব কারণে চীন বাংলাদেশকে গুরুত্ব দিচ্ছেচীনের প্রেসিডেন্ট ঢাকায় এলেন, অনেক কিছু দিয়ে গেলেন। বিষয়টি যেন রোমান সম্রাট জুলিয়াস সিজারকে কেন্দ্র করে প্রচলিত প্রবাদের মতো তিনি এলেন, জয় করলেন আবার চলে গেলেন। শি জিনপিংও তেমনি যেন অকস্মাৎ এলেন, আমাদের মন জয় করে গেলেন। যদিও ঢাকায় যে ২২ ঘণ্টা তিনি থাকলেন ঢাকার মানুষ দুইদিনই রাস্তায় যানজটে পড়ে বিপর্যস্ত ছিলেন। তবুও সব কষ্টই মানুষ হাসিমুখে মেনে নিলেন। যদিও অনেকেরই কষ্টের কোনো সীমা ছিল না। কিন্তু কিছু পেতে হলে তো কষ্ট কিছু করতেই হবে। তবে তা ঢাকার মানুষদের একটু বেশি করতে হলো। অবশ্য ঢাকার অধিবাসীরা এসব বিষয়ে অভ্যস্ত হয়ে গেছেন। বেগম খালেদা জিয়া হজ করে এলেন। এর জন্যও ঢাকাবাসীকে নাকাল হতে হলো। প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘের অধিবেশন শেষে ঢাকায় ফিরলেন এবং তার জন্যও ঢাকার মানুষদের যানজটের কবলে পড়তে হলো। এর চাইতে চীনা রাষ্ট্রপতির সফর উপলক্ষে ঢাকায় দুদিন যানজটে কষ্টের বিষয়টি খুবই গৌণ মনে হয়। তবে সরকার আগে থেকেই রাস্তা বন্ধ থাকার সময়সূচির বিষয়টি মিডিয়ার মাধ্যমে জানিয়ে দিলে মানুষজন হিসাব-নিকাশ করে ঘরে থেকে বের হতে পারতেন। আশা করি ভবিষ্যতে সংশ্লিষ্ট মহল বিষয়টি ঢাকাবাসীদের একটু আগেভাগে জানিয়ে দিলে ভোগান্তির কারণটি এতটা প্রকট হবে না।
মূল প্রসঙ্গে ফিরে আসি। শি জিনপিংয়ের সফরের আগে অনেকেই ভেবেছিলেন যে, তিনি গোয়ায় যাওয়ার পথে ঢাকায় হয়তো সৌজন্য সফর করবেন। কিন্তু ঢাকায় তার নামার পরপরই বোঝা গেল এ সফর শুধুই নামমাত্র সফর নয়, এ যে এক ব্যতিক্রমী ঘটনা হতে যাচ্ছে। তার সঙ্গে সরকারের শীর্ষ নেতারাই নয়, বেশ ক’জন শীর্ষ ব্যবসায়ী এবং বিনিয়োগকারীও এলেন। সম্পাদিত হলো ২৭টি চুক্তি ও সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর। বেসরকারি খাত থেকেই ১৩৬০ কোটি ডলারের চুক্তি হলো। সব মিলিয়ে প্রায় ৩৮ বিলিয়ন ডলারের ব্যাপক সহযোগিতা প্রতিশ্রুতি হলো। সড়ক, টানেল, সমুদ্র, শিল্প এলাকা, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, রেল, আইসিটি ইত্যাদি খাতে ব্যাপক পরিবর্তনের চুক্তি হলো। চীনা প্রেসিডেন্ট ‘কৌশলগত অংশীদারিত্বের’ চিহ্ন হিসেবে এটিকে অভিহিত করেছেন। ২০১৭ সালকে তিনি দুই দেশের সহযোগিতা এবং বন্ধুত্বের বছর হিসেবেও অভিহিত করেছেন। তিনি ঢাকা সফরের আগে বাংলাদেশের জন্য ব্যাপক সহযোগিতার প্রস্তুতি নিয়ে আসেন। তিনিই হচ্ছেন চীনের দ্বিতীয় প্রেসিডেন্ট যিনি ৩০ বছর পর ঢাকা সফর করেছেন। তবে এও সত্য যে, তিনিই হচ্ছেন প্রথম প্রেসিডেন্ট যিনি ঢাকাকে অনেক বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন, বাংলাদেশকে এর আর্থ-সামাজিক বিকাশে অবদান রাখার জন্য বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের ডালা পূর্ণ করে বহন করে নিয়ে আসেন।
শি জিনপিং যাওয়ার প্রাক্কালে গেলেন বাংলাদেশের জাতীয় স্মৃতিসৌধে যা এক ব্যতিক্রমী ঘটনা। চীন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সহযোগিতা করেনি, পাকিস্তানের পক্ষে ছিল। কিন্তু ইতিহাসের সেই অবস্থানে যেসব কারণে চীন বাংলাদেশকে গুরুত্ব দিচ্ছেচীন আবদ্ধ থাকেনি। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এখন আর অস্বীকার করার কোনো নজির চীন স্থাপন করেনি। অধিকন্তু সাভার স্মৃতিসৌধে গিয়ে জানান দিলেন শি জিনপিং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে তারা এখন সম্মান জানাচ্ছেন। প্রশ্ন হচ্ছে কেন চীন এতটা নতুনভাবে বাঁক ঘুরিয়েছে? এর উত্তর হচ্ছে, একদিকে বাংলাদেশের উন্নতির গতিধারা চীনসহ সারা পৃথিবীকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশের বাজার এখন অনেক দ্রুত বিকাশমান। বাংলাদেশের জনসংখ্যা বেশি হলেও এখানকার মানুষ এখন শিল্প কলকারখানায় কাজ করতে আগ্রহী। প্রায় এক কোটি মানুষ প্রবাসে অবস্থান করছে। রেমিট্যান্স দেশে পাঠাচ্ছে। এখানে সস্তা শ্রমঘন শিল্প গড়ে তোলার বাস্তবতা রয়েছে। বাংলাদেশ গার্মেন্টস শিল্প বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। ফলে বাংলাদেশে চীন বিনিয়োগ করলে অধিকতর লাভবান হবে এই সম্ভাবনাই উজ্জ্বল। বাংলাদেশে এখন বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ রয়েছে। তা দ্বারা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে যেভাবে দেশটি এগিয়ে যাচ্ছে তাতে চীনের পক্ষে এখনই এগিয়ে আসার উপযুক্ত সময়।
অন্যদিকে এই মুহূর্তে মিয়ানমারে মার্কিন প্রভাব আগের তুলনায় বেড়ে যাওয়ার লক্ষণ বোঝা যাচ্ছে। এটি চীনের জন্য নতুন অভিজ্ঞতা। ফলে বঙ্গোপসাগরের দিকে চীনকে তাকাতে হলে বাংলাদেশের কথা বিবেচনা করতেই হবে। চীন বিষয়টি সেভাবেই হয়তো বিবেচনা করছে। এই অঞ্চলে মার্কিন উপস্থিতির বিষয়টি চীনকে অবশ্যই ভাবিয়ে তুলেছে। ফলে চীন দ্রুতই বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করার সিদ্ধান্ত নেয়ার কোনো বিকল্প দেখেনি। তাছাড়া বাংলাদেশ সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে বৈরিতা নয় এমন নীতিতে অবিচল থাকার ক্ষেত্রে যে দৃঢ়তা দেখাচ্ছে তাতে অনেক সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও কখনো কখনো বাংলাদেশকে আস্থায় নিতে পারছে না। বিষয়টি চীনের জন্য ইতিবাচক। চীন এ মুহূর্তে অর্থনৈতিকভাবে মার্কিন যক্তরাষ্ট্রকে টেক্কা দিতে সব শক্তি নিয়োগ করছে। সে ক্ষেত্রে এশিয়া মহাদেশে তার বন্ধু রাষ্ট্রের সংখ্যা বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। অন্যদিকে ভারতের সঙ্গে তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য ভালো চলছে। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক চমৎকার। বাংলাদেশ স্বাধীন আত্মমর্যাদাশীল। বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী এই সময়ে বিশ্ব পরিসরে অত্যন্ত ঝানু রাষ্ট্রনায়কের অবস্থানে থেকে কাজ করছেন। তিনি বন্ধুত্বকে মর্যাদা দিচ্ছেন আবার আত্মমর্যাদাও রক্ষা করছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, বিশ্বব্যাংক কারো কাছেই মাথা নত করছেন না। স্বাধীন এবং দৃঢ়চেতা অবস্থানের কারণে শেষ পর্যন্ত সব শক্তিই শেখ হাসিনাকে গুরুত্ব দিতে বাধ্য হচ্ছে। এর আগে তাকে জাপানে জি শীর্ষ সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানিয়ে বাংলাদেশের উন্নয়ন রূপকথা শুনেছেন। জাতিসংঘ তাকে বিভিন্ন বিষয়ে পুরস্কৃত করেছে। গত দুদিন আগে গোয়ায় তিনি আমন্ত্রিত হয়েছেন বিশ্ব নেতাদের সঙ্গে বসে অভিজ্ঞতার বিনিময় করতে।
ভারতে বিজেপি নেতৃত্ব ক্ষমতাসীন হওয়ার পর অনেকেই ভেবেছিলেন যে, শেখ হাসিনার নেতৃত্বকে ভারত হয়তো কংগ্রেস সরকারের মতো গুরুত্ব দেবে না। কিন্তু মোদি সরকার শেখ হাসিনাকে অনেক বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। সন্ত্রাসবাদ, জঙ্গিবাদবিরোধী অভিযানে শেখ হাসিনার দৃঢ় অবস্থান বিশ্ব নেতাদের অনেক বেশি বাংলাদেশের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও আস্থাশীল করেছে। এ ধরনের অবস্থায় শুধু চীন নয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ভারতসহ সব রাষ্ট্রই বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক আরো মজবুতে আগ্রহী হয়ে উঠেছে। শেখ হাসিনা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে দারিদ্র্য দূরীকরণে যেভাবে ভূমিকা রেখেছেন তাতে বাংলাদেশ সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে এখন একটি পরিবর্তিত দেশ। এখানে বিনিয়োগ পরিস্থিতি এখন অনেক ভালো। এখানে জীবনমান ক্রমেই উন্নত হচ্ছে। সব মিলিয়ে শেখ হাসিনা বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক খাতে যুগান্তকারী পরিবর্তন নিয়ে এসেছেন। এ ধরনের পরিস্থিতিকে চীনের বিবেচনায় বাংলাদেশ অনেক বেশি ব্যবসাবান্ধব, অনেক বেশি কৌশলগত অংশীদার হওয়ার জন্য যোগ্য যা শি জিনপিং ঢাকায় উল্লেখও করে গেছেন। সেটিই আসল কথা কিংবা সম্পর্ক উন্নয়নের মূল কারণ। দু’দেশের সামনে সম্পর্ক উন্নয়নসহ নানা বিষয়ে সম্ভাবনার দরজা আরো প্রশস্ত হয়েছে।
লেখক: শিক্ষা ও ইতিহাসতত্ত্ববিদ