বিশাল কর্মযজ্ঞে পাল্টে যাবে চট্টগ্রামের দৃশ্যপট

চট্টগ্রামে একদিকে ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ অর্থনৈতিক করিডর। অপরদিকে চীনের সাংহাইয়ের আদলে ‘ওয়ান সিটি টু টাউন’ প্রতিষ্ঠার জন্য চীনের আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় যে বিশাল কর্মযজ্ঞ শুরু হতে যাচ্ছে এর বাস্তবায়ন যখন ঘটবে তখন সম্পূর্ণভাবে পাল্টে যাবে চট্টগ্রামের দৃশ্যপট। কর্ণফুলী নদীর বুক চিরে উত্তরাংশে বর্তমান মহানগরী ও দক্ষিণ আনোয়ারা। এ আনোয়ারায় ইতোমধ্যে সরকারী-বেসরকারী পর্যায়ে বিশাল অঙ্কের অর্থায়নে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হতে যাচ্ছে চীনা অর্থনৈতিক জোন। এছাড়াও প্রতিষ্ঠা পাবে মেরিন ড্রাইভ এক্সপ্রেসওয়ে।

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের উপস্থিতিতে গত শুক্রবার ঢাকায় যে ২৬টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে এসব প্রকল্প এরই অংশ। এছাড়া বাঁশখালীতে বেসরকারী পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে ১৩২০ মেগাওয়াটের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুত কেন্দ্র। চট্টগ্রামের এস আলম গ্রুপের সঙ্গে চীনা সরকারী প্রতিষ্ঠান সেপকো এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে। এতে বিনিয়োগ হবে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা।

বিশ্ব অর্থনীতিতে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশে চীনের সরকারী-বেসরকারী পর্যায়ে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় বিশাল সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সকল মহল ধারণা করছে। মেরিন ড্রাইভ এক্সপ্রেসওয়ে ও উপকূলরক্ষা বাঁধ প্রকল্পটি হবে ২৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে। আনোয়ারায় চায়না অর্থনৈতিক জোন প্রতিষ্ঠায় ব্যয় হবে ১৬ হাজার কোটি টাকা, কর্ণফুলী টানেল নির্মাণে ব্যয় হবে সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকা, সীতাকু- থেকে টেকনাফ পর্যন্ত মেরিন ড্রাইভ সড়ক এবং উপকূলরক্ষা বাঁধ নির্মাণ হবে। এছাড়া মীরসরাইতে বাংলাদেশ ইকোনমিক জোন অথরিটির (বেজা) উদ্যোগে বিশেষ অর্থনৈতিক জোনের কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। এটি হবে দেশের বৃহত্তম অর্থনৈতিক অঞ্চল। এতে দেশীয় ছাড়া বিদেশীদের বিনিয়োগই থাকবে বেশি। এটি পরিপূর্ণ একটি শিল্প শহরে রূপ নেবে বলে বেজা কর্তৃপক্ষ আশাবাদী।

চট্টগ্রামকেন্দ্রিক এ উন্নয়ন কর্মকা-কে ঘিরে চট্টগ্রামবাসী এখন স্বপ্নে বিভোর। ব্যবসায়ী মহল আনন্দিত। বাণিজ্যিক কর্মকা- সম্প্রসারণে তারা বড় ধরনের আশার আলো দেখছেন। চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স, চট্টগ্রাম উইমেন চেম্বার অব কমার্স, বন্দর ব্যবহারকারী বিভিন্ন সংস্থা, গার্মেন্টসহ রফতানি খাতের ব্যবসায়ী মহলের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এত বিশাল কর্মযজ্ঞ পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়ন হলে একদিকে চট্টগ্রামের চেহারা যেমন পাল্টে যাবে, তেমনি দেশের অর্থনৈতিক ভিত আরও মজবুত হয়ে ব্যাপকতর রূপ নেবে। বিশেষ করে কর্ণফুলীর তলদেশকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ, চীন, ভারত ও মিয়ানমারের জন্য একটি অর্থনৈতিক করিডর প্রতিষ্ঠা পেতে যাচ্ছে, যা বিসিআইএম নামে চিহ্নিত করা হচ্ছে। টানেল নির্মাণ প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কর্ণফুলী নদীর তলদেশ দিয়ে এ টানেল নির্মিত হওয়ার পর চট্টগ্রামের উত্তর ও দক্ষিণ অংশে শিল্পায়ন হবে দ্রুতগতিতে। এ টানেলের মূল পয়েন্ট হবে উত্তরে অর্থাৎ পতেঙ্গার নেভাল একাডেমি থেকে, শেষ হবে দক্ষিণ পাড়ে কাফকো (কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি) ও সিইউএফএলের (চিটাগাং ফার্টিলাইজার) মধ্যবর্তী স্থান দিয়ে। চলতি বছরের ডিসেম্বর থেকে ২০২০ সালের জুন মাসের মধ্যে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন হবে। টানেল নির্মাণ করবে চায়না কমিউনিকেশন কনস্ট্রাকশন কোম্পানি।

চীনের সহযোগিতায় এসব মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে চট্টগ্রাম দেশী-বিদেশী বিনিয়োগের জন্য একটি হাব-এ পরিণত হবে। বর্তমানে চট্টগ্রামে সরকারী- বেসরকারী উদ্যোগের তিনটি ইপিজেড রয়েছে। এর দুটি চট্টগ্রামের পতেঙ্গা ও হালিশহরে এবং অপরটি আনোয়ারায়। আনোয়ারায় প্রতিষ্ঠিত ইপিজেডটি কোরিয়ান উদ্যোগের। এ তিনটি ইপিজেডে ইতোমধ্যেই কর্মসংস্থান হয়েছে বিপুলসংখ্যক শ্রমজীবী মানুষের। বিনিয়োগ হয়েছে উন্নত বিশ্বের প্রতিষ্ঠিত বিভিন্ন কোম্পানির পক্ষ থেকে। ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে বন্দরনগরী চট্টগ্রাম এখন বিদেশী বিনিয়োগকারীদের কাছে সর্বাগ্রে প্রাধান্য পাচ্ছে, যে কারণে বর্তমান সরকার মহেষখালীতে গভীর সমুদ্রবন্দর প্রতিষ্ঠার জন্য সমীক্ষা কার্যক্রমও সম্পন্ন করেছে। এ গভীর সমুদ্রবন্দর প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে যে কোন সময় ইতিবাচক সিদ্ধান্ত চলে আসতে পারে। এ গভীর সমুদ্রবন্দর প্রতিষ্ঠার জন্য সরকার বহুদূর এগিয়েছে। কিন্তু মাঝপথে অজ্ঞাত কারণে তা থমকে আছে। অপরদিকে, জাপান এবং ভারতও ইতোমধ্যে নিজেদের জন্য বিশেষ অর্থনৈতিক জোন প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দিয়েছে। সরকার এ দুটি দেশের জন্য এ ধরনের অঞ্চল প্রতিষ্ঠার চিন্তাভাবনা করছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, বিনিয়োগের জন্য চট্টগ্রাম বিদেশীদের কাছে বিশেষ প্রাধান্য পাওয়ার কারণে আগামীতে এ শহরের অবকাঠামোগতসহ সবদিক থেকে আমূল পরিবর্তন আসার সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছে। এখন শুধু অপেক্ষা এর পরিপূর্ণ বাস্তবায়নের। সরকারের উদ্যোগে চট্টগ্রামকে নিয়ে উন্নয়নের কর্মযজ্ঞ সৃষ্টিতে বৃহত্তর চট্টগ্রামের বিশাল জনগোষ্ঠী আশায় বুক বেঁধেছে। রাতের আলোয় ঝলমল করবে পুরো চট্টগ্রাম। বিদেশী পুঁজি বিনিয়োগের পাশাপাশি বিদেশীদের সংখ্যাও বেড়ে যাবে বহুগুণ। এমনিতেই চট্টগ্রামে চীন, জাপান, কোরিয়া, ভারত, শ্রীলঙ্কা, নেপালসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের আধিক্য রয়েছে, তার ওপর চীনা সহযোগিতায় এসব মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে এ পরিস্থিতিতে আমূল পরিবর্তন যে আসবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। ‘ওয়ান সিটি টু টাউন’- চীনের সাংহাইয়ের আদলে চট্টগ্রাম মহানগরী সাজবে, এ যেন স্বপ্ন দেখার মতো ঘটনা। কিন্তু বিষয়টি স্বপ্ন নয়, এটি এখন বাস্তবতার পথে। এসব মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন হওয়ার পথে এবং হওয়ার পর বিদেশী বিনিয়োগকারীদের তৎপরতা যে হারে বৃদ্ধি পাবে তাতে স্থান সঙ্কুলান করা যাবে কি-না তা নিয়েও শঙ্কা রয়েছে। বেজা সূত্র জানায়, ওই ধরনের পরিস্থিতি হলে এ নগরীর অন্যত্র ভূমি ব্যবস্থাপনার আওতায় এনে বিশেষায়িত অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। তবে সবকিছুই নির্ভর করবে যখন যারা সরকারে থাকবে তাদের মন-মানসিকতা ও উন্নয়নধর্মী চিন্তাভাবনার ওপর।