নারী জাগরণে বিস্ময়

হচ্ছেন সংসদ স্পিকার বিচারপতি পাইলট পুলিশ কর্মকর্তা পর্বতারোহী রেল চালক নাবিক
যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রকাশিত ব্যবসাভিত্তিক ফোর্বস ম্যাগাজিনে বিশ্বের ক্ষমতাধর ১০০ নারীর তালিকায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বিশ্বের ৩৬ নম্বর ক্ষমতাধর নারী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। শেখ হাসিনার এ সাফল্য স্বীকৃতিই বলে দেয়, বর্তমান সময়ে বাংলাদেশে নারী জাগরণের এক বিস্ময়কর উত্থান ঘটেছে। দেশে চিকিৎসক, শিক্ষক ও ব্যাংকার হিসেবে কর্মরত নারীর সংখ্যা অগণিত। তবে গতানুগতিক পেশার বাইরেও সাহসী দায়িত্ব পালনেও নারী যে পারদর্শী তার প্রমাণ দিয়েছেন বাংলাদেশের নারী নাবিক, সৈনিক, খেলোয়াড় ও নিরাপত্তা কর্মীরা। ইতিবাচক বিষয় এই যে, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার বাংলাদেশ শাখায় গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে শুরু করে করপোরেট অফিসের গুরুত্বপূর্ণ পদে এমনকি হোটেলের অভ্যর্থনা কর্মী এবং গাড়ির মেকানিক হিসেবে কাজ করে আমাদের নারীরা দিন দিন তাদের যোগ্যতার প্রমাণ দিয়ে যাচ্ছেন। বিভিন্ন চ্যালেঞ্জিং কাজে নারীর অংশগ্রহণে পেশাগত লিঙ্গবৈষম্য নারীর অগ্রযাত্রাকে এখন আর আটকাতে পারছে না। সে কারণে এখন সংসারের হাল ধরতে একজন নারী তার স্বল্প পুঁজি দিয়ে যেমন মুদি দোকান দিচ্ছেন তেমন ঢাকার বাইরে অনেকেই ইজিবাইক চালিয়ে সংসারের হাল ধরছেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত এক দশকে বিভিন্ন পেশায় নারীর সরব অংশগ্রহণে দেশে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটেছে। মেধা ও যোগ্যতা থাকলে যে সব বাধা-বিপত্তিরই মোকাবিলা করা সম্ভব বাংলাদেশের বিভিন্ন পেশার কর্মজীবী নারী তা প্রতিনিয়ত প্রমাণ করে যাচ্ছেন। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘ধীরে ধীরে নারীর ক্ষমতায়ন ঘটছে এ কথা সত্য। তবে আমি মনে করি, নারীবান্ধব নীতিমালা প্রণয়ন ও পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হলে নারীর ক্ষমতায়নের পথ আরও প্রশস্ত হবে।’এরই মধ্যে বাংলাদেশের নারীরা বিচারপতি, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর, জাতীয় সংসদের স্পিকার, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, পর্বতারোহী এবং প্যারাট্রুপার হওয়ার কৃতিত্ব দেখিয়েছেন। এমনকি বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্টে উঠে দেশের সুনাম বাড়িয়েছেন নিশাত মজুমদার ও ওয়াসফিয়ারা। দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম নারী উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ফারজানা ইসলাম তার দায়িত্ব পালন করছেন। একইভাবে দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে সফলভাবে দায়িত্ব পালন করছেন। আর সংসদে বিরোধীদলীয় নেত্রীও একজন নারী। ২০১৩ সালের ১ এপ্রিল নাজমুন আরা সুলতানা দেশের প্রথম নারী বিচারপতি হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। এমনকি দীর্ঘ সময় পরে হলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকে দেশের প্রথম নারী ডেপুটি গভর্নর হিসেবে নাজনীন সুলতানা নারীসমাজের কৃতিত্বকে আরও একধাপ বিস্তৃত করেছেন। সম্প্রতি বিশ্ব অঙ্গনে বাংলাদেশের নারী ফুটবলাররা আরও একবার দেশের নাম উজ্জ্বল করেছেন। বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৬ নারী ফুটবল দলের মেয়েরা এএফসি অনূর্ধ্ব-১৬ মহিলা ফুটবলের চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে। এ ছাড়া বাংলাদেশের জাতীয় মহিলা ক্রিকেট দলের সদস্যরাও ধীরে ধীরে নিজেদের অভিজ্ঞতার পাল্লা ভারী করছেন। ইতিমধ্যেই ওয়ানডে স্ট্যাটাস অর্জন শেষে বর্তমানে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ম্যাচে অন্য পক্ষকে পরাজিত করার মতো সামর্থ্য অর্জন করতে শুরু করেছেন জাতীয় মহিলা ক্রিকেট দলের খেলোয়াড়রা। নতুন অর্জন হিসেবে এবার এসএ গেমসের দ্বাদশ আসরে ভারোত্তোলনে বাংলাদেশের হয়ে প্রথম স্বর্ণপদক আসে মাবিয়া আক্তার সীমান্তের হাত ধরে। আর সাফ সাঁতারে দীর্ঘ ১৯ বছরের রেকর্ড ভেঙে দুটি স্বর্ণপদক পান মাহফুজা খাতুন শিলা। বিচার বিভাগ ও প্রশাসনেও নারীর অংশগ্রহণ পিছিয়ে নেই। বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের ডেপুটি রেজিস্ট্রার (যুগ্ম জেলা জজ) হিসেবে নির্বাচিত হয়ে ফারজানা ইয়াসমিন নারীসমাজের মর্যাদা বাড়িয়েছেন। এ ছাড়া সিলেট বিভাগের ইতিহাসে প্রথম নারী উপজেলা চেয়ারম্যান হিসেবে নির্বাচিত হন গুলশান আরা মিলি। বিমানবাহিনীতে নারী পাইলটদের সফলতার কথা আমরা জানি। একইভাবে সেনাবাহিনীতেও এবার নারী অফিসাররা পাইলট হিসেবে দায়িত্ব পালনের জন্য নিজেদের তৈরি করছেন। এরই প্রমাণ মেজর নাজিয়া নুসরাত হোসেন ও মেজর শাহরীনা বিনতে আনোয়ার। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইতিহাসে তাদের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো দুই নারী পাইলট পাচ্ছে। আকাশজয়ী এই গর্বিত দুই নারী সদস্য গত বছর তেজগাঁও আর্মি অ্যাভিয়েশন গ্রুপে শিক্ষানবিস পাইলট হিসেবে সফলভাবে প্রশিক্ষণ বিমান ‘সেসনা ১৫২ অ্যারোবাট-’এ একক ও দ্বৈত উড্ডয়ন পরিচালনা করেন। নাজিয়া ২০১৫-এর ৭ মে উড্ডয়ন দক্ষতা প্রমাণ করতে প্রথম একক উড্ডয়ন সম্পন্ন করেন। আর শাহরীনা একই বছরের ২১ মে প্রথম একক উড্ডয়ন সম্পন্ন করেন। এ ছাড়া দেশের প্রথম নারী প্যারাট্রুপার হিসেবে ক্যাপ্টেন জান্নাতুল ফেরদৌসের নাম সবারই জানা। এমনকি বাংলাদেশ নৌবাহিনীতেও এখন যোগ দিয়েছেন নারী নাবিক, যা দেশের নারী অগ্রযাত্রার ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক। সেনাবাহিনীর বিভিন্ন কোরে নারী অফিসার ও সৈনিক থাকলেও নাবিক হিসেবে প্রথমবারের মতো নৌবাহিনীতে নারীদের অন্তর্ভুক্তি হয়েছে। গত বছরের আগস্ট থেকে বাংলাদেশের নারীরা বাণিজ্যিক জাহাজে নাবিক হিসেবে কাজ শুরু করেন, যা বাংলাদেশে প্রথম। আর প্রথম ব্যাচে মোট ১৩ জন নাবিক বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের বিভিন্ন জাহাজে মেরিন অফিসার পদে যোগ দেন। এর আগে ডিসেম্বরে তারা বাংলাদেশ মেরিন একাডেমি থেকে ক্যাডেট হিসেবে প্রশিক্ষণ শেষ করেন। গাড়িচালক নারী হামেশা দেখা গেলেও দেশের মেয়েরা রেল চালাবেন কয়েক বছর আগেও তা চিন্তা করা অসম্ভব ছিল। কিন্তু দিন বদলেছে। বাংলাদেশ রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে রেলওয়েতে ট্রেন চালনায় আছেন ১৫ জন নারী। যার মধ্যে রেলের চালক হিসেবে নিয়োগ পাওয়া দেশের প্রথম নারী সালমা খাতুন এখন ঢাকায় লোকোমাস্টার বা পূর্ণাঙ্গ চালকের দায়িত্ব পালন করছেন। বাকিরা এখনো সহকারী লোকোমাস্টার। শুধু ট্রেন চালনাই নয়, এই নারীদের এর সঙ্গে ট্রেনের ইঞ্জিনের যান্ত্রিক ও তড়িৎ (মেকানিক্যাল ও ইলেকট্রিক্যাল) দিকগুলোও দেখতে হয়। খোঁজ নিয়ে আরও জানা যায়, নারীরা এখন বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানেও নিরাপত্তাকর্মীর কাজ করছেন। রাজধানীর বিভিন্ন মার্কেট, ব্যাংক, রেস্টুরেন্ট, পার্ক, পোশাক কারখানা ও মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে এখন নারী নিরাপত্তাকর্মীর চাহিদা বেশি। এমনকি আন্তর্জাতিক হোটেলগুলোর সঙ্গে মিল রেখে এখন ঢাকার বিভিন্ন অভিজাত হোটেলেও একজন নারীকে অভ্যর্থনা কর্মীর দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশের মেয়েরা পেশাগতভাবে শুধু গাড়ি চালনার সঙ্গে জড়িত নন, এখন তারা গাড়ির বিভিন্ন যন্ত্রাংশ ঠিক করার কাজও শুরু করেছেন। নারীদের মোটরসাইকেলের যাবতীয় সার্ভিসিংয়ের কাজ শেখানোর জন্য বগুড়ায় মহিলাবিষয়ক অধিদফতর একটি প্রকল্প নিয়েছে। এর মাধ্যমে নারীদের গাড়ির মেকানিক হিসেবে কাজ শেখানোর জন্য প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। বিশেষ করে বাল্যবিয়ে ও স্বামী কর্তৃক নির্যাতনের শিকার নারীদের এ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এর ফলে বিভিন্ন জায়গায় নারীদের এখন মেকানিকের কাজও করতে দেখা যাচ্ছে। এদিকে প্রথমবারের মতো ৮৭৯ জন নারী সৈনিক পেয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। টানা এক বছরের প্রশিক্ষণ শেষে ২০১৫ সালের ২৯ জানুজারি টাঙ্গাইলের শহীদ বীরউত্তম প্যারেড গ্রাউন্ডে নিজেদের সমাপনী কুচকাওয়াজে অংশ নিয়ে তারা সৈনিক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দেশে এখন ৬ হাজারের বেশিসংখ্যক নারী পুলিশ সদস্য কর্মরত আছেন। নারী পুলিশরা বর্তমানে দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে নিজেদের কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখে চলেছেন জাতিসংঘের বিভিন্ন শান্তি মিশনেও। নতুন দায়িত্ব হিসেবে পুলিশবাহিনীতে নারী ট্রাফিক সার্জেন্টও নিয়োগ দেওয়া হয় ২০১৪ সাল থেকে। ঢাকা, রাজশাহী, রংপুর, খুলনা ও হাইওয়ে পুলিশে এখন মোট ২৮ নারী সার্জেন্ট দায়িত্ব পালন করছেন। ফাতেমা বেগম বর্তমানে পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তার কাছে যখন জানতে চাওয়া হলো পেশা কেমন লাগছে? সময় না নিয়েই বললেন, ‘অবশ্যই ভালো। পুরুষদের কাজ আমরা অনায়াসেই করছি। দায়িত্ব পালনকালে কখনো মনে হয়নি যে নারী হিসেবে প্রতিকূল পরিবেশের সম্মুখীন হয়েছি।’ এমনকি ব্যতিক্রমী পেশায় জড়িত থেকেও সাধারণ মানুষের কাছে তথ্যপ্রযুক্তি ও স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিচ্ছেন ‘তথ্যকল্যাণী’রা। দেশের বিভিন্ন জেলায় তারা কাজ করছেন। তবে চ্যালেঞ্জিং পেশার পাশাপাশি নারীরা যে কঠোর পরিশ্রমের সঙ্গেও জড়িত তারই প্রমাণ কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত নারীরা। তথ্যমতে, নারী শ্রমিকদের মধ্যে ৭০ শতাংশই কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত।