তেজপাতা চাষে ভাগ্যবদল

দেশের সর্ব উত্তরের জেলা পঞ্চগড়ে দিন দিন বাড়ছে বাণিজ্যিকভাবে তেজপাতা চাষ। গত কয়েক বছরে তেজপাতা চাষ ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। এক সময়ের বিরানভূমি পঞ্চগড় জেলার মাটি ও আবহাওয়া তেজপাতা চাষের উপযোগী হওয়ায় দিনদিন বেড়েই চলছে এই বর্ষজীবী অর্থকরী ফসলের আবাদ। যা স্থানীয় চাহিদা পূরণ করে মসলা তৈরির কাঁচামাল ও ওষুধি পণ্য হিসেবে সরবরাহ করা হচ্ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। অনাবাদী ও পতিত জমিতে তেজপাতা চাষ করে স্বাবলম্বী হয়েছেন অনেক কৃষক।
শরতের এই সময়ে পঞ্চগড়ে বাণিজ্যিকভাবে ও বসতবাড়িতে লাগানো তেজপাতার গাছ সবুজ পাতায় ছেয়ে গেছে। ব্যক্তি উদ্যোগে গড়ে ওঠা এ সকল তেজপাতা বাগান এখন পাতায় পাতায় পরিপূর্ণ। কোন কোন বাগান থেকে তেজপাতা কেটে সরবরাহ করা হচ্ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। পঞ্চগড়ে উৎপাদিত তেজপাতা অনেক সুগন্ধি ও ওজনে বেশি ভারী হওয়ায় এই তেজপাতা গুলোর চাহিদা অনেক বেশি। অন্য আবাদের অনুপোযোগী জমিতে তেজপাতা বাগান করে অধিক পাতা ও বেশি মুনাফা পাওয়ায় পঞ্চগড়ের কৃষকেরা অনেকেই এখন বাণিজ্যিকভাবে তেজপাতা চাষে ঝুঁকে পড়েছেন।
বাজার মূল্য ও চাহিদার বিবেচনায় দিন দিন বেড়েই চলছে তেজপাতা বাগানের সংখ্যা। তেজপাতার বাগান করে ভাগ্য ফিরেছে কয়েক শতাধিক কৃষকের।
একটি পরিপূর্ণ চারা গাছ রোপণের ২ থেকে আড়াই বছরের মধ্যে পর্যাপ্ত পাতা সংগ্রহ করা যায়। বছরে এক থেকে দুইবার বাগান থেকে পাতা সংগ্রহ করে থাকেন চাষীরা। শুরুতে স্থানীয়রা নিজেদের বসতভিটায় স্বল্প পরিমাণে তেজপাতার গাছ রোপণ করে সফলতা পাওয়ায় ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে বণিজ্যিকভাবে তেজপাতার চাষ। গত কয়েক বছরের তুলনায় বর্তমানে প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে তেজপাতার বাগানের সংখ্যা।
তেজপাতা চাষে ভাগ্যবদলপঞ্চগড় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে পঞ্চগড়ে ৪৩ হেক্টর জমিতে বেশ কিছু তেজপাতা বাগান গড়ে উঠেছিল। যা ২০১৪-১৫ অর্থবছরে বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ৯০ হেক্টরে উত্তীর্ণ হয়। তবে চলতি অর্থবছরে তা বেড়ে ১৭৬ দশমিক ৫ হেক্টরে দাঁড়িয়েছে। পঞ্চগড়ে এখন ছোট-বড় তেজপাতা বাগানের সংখ্যা প্রায় ৬৮৪ টি। এ বছর এই পর্যন্ত জেলায় তেজপাতা উৎপাদন হয়েছে ৬৩৭ দশমিক ৭৫ মেট্রিক টন।
বোদা উপজেলার বেংহাড়ি-বনগ্রাম ইউনিয়নের ফুলতলা এলাকার তেজপাতা চাষী আনিসুর রহমান মানবকণ্ঠকে বলেন, ‘আমার ৩ একর জমি অনেক দিন অনাবাদী হিসেবে পড়ে ছিল। অন্য কোন আবাদ হতো না। চার বছর আগে ওই ৩ একর জমিতে তেজপাতা বাগান করি। গত বছর প্রথম বাগান চুক্তি হিসেবে ৮ লক্ষ টাকায় পাতা বিক্রি করেছি। আশা করছি এবারো একই পরিমাণ টাকার তেজপাতা বিক্রি হবে।’
পঞ্চগড় সদর উপজেলার জালাসীপাড়া এলাকার মো. শাহজালাল বলেন, ‘আমি সাড়ে চার বিঘা জমিতে তেজপাতা চাষ করেছি। পঞ্চগড়ে উৎপাদিত তেজপাতা অনেক সুগন্ধি ও ওজনে বেশি ভারী হওয়ায় এই তেজপাতাগুলোর চাহিদা অনেক বেশি। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ব্যবসায়ীরা এসে বাগান থেকেই এক কেজি কাঁচা তেজপাতা ৯০ থেকে ১০০ টাকা কেজি দরে আমাদের কাছ থেকে কিনে নেন। এছাড়াও বাগান চুক্তি হিসেবেও তেজপাতা বিক্রি হয়।’
পঞ্চগড় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘অল্প খরচে ও অল্প পরিশ্রমে তেজপাতা চাষ অত্যন্ত লাভজনক হওয়ায় প্রতি বছর বাণিজ্যিকভাবে তেজপাতার বাগানের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। পঞ্চগড় জেলা এখন তেজপাতা চাষে মডেল হিসেবে পরিণত হয়েছে। অন্যান্য আবাদের অনুপযোগী উচু জমিগুলোতে বর্ষজীবী ও অর্থকারী এই তেজপাতা চাষাবাদে পঞ্চগড় কৃষি বিভাগ প্রতিনিয়ত কৃষকদের নানা পরমর্শ ও সহায়তা প্রদান করছে। পঞ্চগড়ের এই তেজপাতা যেমনি ভাবে দেশের মসলার চাহিদা পূরণ করছে ঠিক তেমনি ভাবে অর্থকারী এই চাষাবাদ এই জেলার আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।’