ঢাকায় হচ্ছে সাবওয়ে

যানজট এখন রাজধানী ঢাকার সবচেয়ে বড় নাগরিক সমস্যা। রাস্তায় গাড়ি নিয়ে নামলেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা পড়ে থাকতে হয় যানজটে। এর ফলে নষ্ট হয় গুরুত্বপূর্ণ কর্মঘণ্টা। এতে করে দেশের অর্থনীতিও কাক্সিক্ষত গতি পাচ্ছে না বলে অভিযোগ বিশেষজ্ঞদের। অবস্থা নিরসনে একাধিক উদ্যোগ নেয়া হলেও নিয়ন্ত্রণে আসছে না যানজট। এ অবস্থায় ঢাকা মহানগরীতে সাবওয়ে (আন্ডারগ্রাউন্ড মেট্রো) স্থাপনের বিষয়টি জোরেশোরে বিবেচনা করছে সরকার। এ বিষয়ে একটি কনসেপ্ট পেপার তৈরি করা হয়েছে। সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজও শুরু হবে শিগগিরই। এ লক্ষ্যে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় সম্ভাব্যতা যাচাই শীর্ষক একটি প্রকল্প হাতে নিচ্ছে। প্রকল্পের প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। প্রস্তাবের ওপর বিশেষ প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (এসপিইসি) বৈঠক করতে যাচ্ছে।
জানা যায়, প্রাথমিক পর্যায়ে রাজধানীর চারটি রুটে তৈরি হবে এ সাবওয়ে। এসব রুটে ১০০ বাস প্রতি ঘণ্টায় ৬০ হাজার যাত্রী পরিবহন করতে পারবে। অথচ বিদ্যমান রাস্তায় ১০০ বাস ১ ঘণ্টায় মাত্র ১০ হাজার যাত্রী পরিবহন করতে পারে। এ উদ্যোগ বাস্তবতার মুখ দেখলে ঢাকা মহানগরীর যানজট অনেকটাই কমে আসবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। সেতু বিভাগের সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম এ বিষয়ে বলেন, পৃথিবীর সব বড় শহরেই সাবওয়ে রয়েছে। এটি নির্মাণ করা গেলে জনগণকে দুই ভাগে ভাগ করে দেয়া যাবে। একটি অংশ ওপরে থাকবে আর অন্য অংশটি মাটির নিচে থাকবে। ফলে যানজট কমে যাবে।
সেতু বিভাগ সূত্র জানায়, সাবওয়ে নির্মাণের জন্য প্রাথমিকভাবে চারটি রুট চিহ্নিত করা হয়েছে। টঙ্গী-বিমানবন্দর-কাকলি-মহাখালী-মগবাজার-পল্টন-শাপলা চত্বর-সায়েদাবাদ-নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড রুটের দৈর্ঘ্য হবে ৩২ কিলোমিটার। আমিন বাজার-গাবতলী-আসাদগেট-নিউমার্কেট-টিএসসি-ইত্তেফাক ও সায়েদাবাদ রুটের দৈর্ঘ্য ১৬ কিলোমিটার। প্রস্তাবিত তৃতীয় রুটের আওতায় থাকবে গাবতলী-মিরপুর-১-মিরপুর-১০-কাকলি-গুলশান-২-নতুনবাজার-রামপুরা টিভি ভবন-খিলক্ষেত-শাপলা চত্বর-জগন্নাথ হল ও কেরানীগঞ্জ পর্যন্ত। রামপুরা টিভি ভবন-নিকেতন-তেজগাঁও-সোনারগাঁও-পান্থপথ-ধানমন্ডি-২৭-রায়ের বাজার-জিগাতলা-আজিমপুর-লালবাগ ও সদরঘাট পর্যন্ত প্রস্তাব করা হয়েছে চতুর্থ রুট।
সাবওয়ে নির্মাণের ক্ষেত্রে যুক্তি দেখিয়ে সেতু বিভাগ বলেছে, ঢাকা শহরে বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ। এখানে প্রতি বর্গকিলোমিটারে জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রায় ৭ হাজার ৯৫০ জন। মোট সড়কের দৈর্ঘ্য রয়েছে ১ হাজার ২৮৬ কিলোমিটার। সড়কের ঘনত্ব ৯ দশমিক ০১ শতাংশ। অথচ আদর্শমান হচ্ছে ২০ থেকে ২৫ শতাংশ সড়কের ঘনত্ব। ফাঁকা জায়গা রয়েছে ৩ দশমিক ০৯ শতাংশ, কিন্তু থাকার প্রয়োজন ১৫ থেকে ২০ শতাংশ। সড়কের বর্তমান সক্ষমতা ৩ লাখ হলেও বিআরটিএ‘র নিবন্ধিত গাড়ি প্রায় ৯ লাখ। ঢাকা শহরে যানজটের কারণে প্রতি বছর প্রায় ৫৫ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের জন্য সেতু বিভাগ ঢাকা শহরে সাবওয়ে নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, সড়কপথে ১০০ বাসে ঘণ্টায় ১০ হাজার যাত্রী চলাচল করতে পারেন। সেখানে একই পরিমাণ বাসে সাবওয়েতে ঘণ্টায় ৬০ হাজার যাত্রী চলাচল সম্ভব। সাবওয়ে নির্মাণ হলে জনসংখ্যার একটি বড় অংশ মাটির নিচ দিয়ে চলাচল করতে পারবে। ফলে ভূমির ওপর জনসংখ্যার চাপ কমবে এবং যানজট হ্রাস পাবে। সূত্র জানায়, এর আগে সাবওয়ে নির্মাণে প্রধানমন্ত্রী সেতু বিভাগকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরীর সভাপতিত্বে সেতু কর্র্তৃপক্ষের কনসেপ্ট পেপারের ওপর একটি আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় বিদেশি ঋণের অপেক্ষা না করে সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে দ্রুত সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের সুপারিশ করা হয়। এরপর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিবের সভাপতিত্বে অপর এক সভায় সাবওয়ে নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। প্রকল্পটি চলতি অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) বিদেশি সহায়তা পাওয়ার লক্ষ্যে বরাদ্দ ও অনুমোদন ছাড়াই অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সূত্র জানায়, সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের মাধ্যমে প্রস্তাবিত সাবওয়ের অবস্থান ও দৈর্ঘ্য নির্ধারণ করা হবে। এছাড়া নির্মাণ পদ্ধতি, জিওটেকনিক্যাল ইনভেস্টিগেশন, সিসমিক স্টাডি ও সার্ভে এবং ট্রাফিক সার্ভে করা হবে। সেইসঙ্গে পরিবেশ ও পুনর্বাসন সংক্রান্ত সমীক্ষা পরিচালনা ও পরিকল্পনা প্রণয়ন, প্রাথমিক ডিজাইন প্রণয়ন ও এর ভিত্তিতে প্রাক্কলন প্রস্তুত, ভূমি অধিগ্রহণ পরিকল্পনা প্রণয়ন, অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ এবং ক্রয়, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ পরিকল্পনা তৈরি করা হবে।