চিম্বুক- নীলগিরিতে দাঁড়িয়ে মেলে মেঘের স্পর্শ ॥ স্বস্তির ছোঁয়া

রাঙ্গামাটি, বান্দরবান আর সিলেট- তিন জেলায় পা রাখলেই বোঝা যায় প্রকৃতি আসলেই উদার। চারদিকে তাকালে চোখ জুড়িয়ে যায়। এ সৌন্দর্যের কাছে শিল্পীর তুলির ছোঁয়াও তুচ্ছ। মনেই হতে পারে এত রূপে প্রকৃতি খুব কমই সেজেছে। সবুজের বুকে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে চাইলে বেছে নিতে হবে এমন মন হারানো প্রকৃতিকে। একেকটি জেলার সৌন্দর্য একেক ধরনের। যদিও মিল রয়েছে পাহাড়ে আর সবুজে। তবে একটি জেলা দেখলেই আরেকটি দেখার আগ্রহ সৃষ্টি হয়। দেশে খুব কম সৌন্দর্য পিপাসু আছেন যারা রাঙ্গামাটি, বান্দরবান আর সিলেট যাননি। তিন জেলাই অনেক আগে থেকে পর্যটনশিল্পে সমৃদ্ধ, এখন নতুন নতুন সাজসজ্জায় যা আরও সমৃদ্ধ হয়ে উঠছে। দেশের অভ্যন্তরীণ পর্যটকদের পাশাপাশি প্রায়ই এখানে ছুটে আসেন ভিনদেশীরাও। এ তিন জেলায় শুধু শীতে নয়, পর্যটকদের ভিড় থাকে বছরজুড়েই। এখন আধুনিক সব অবকাশযাপন কেন্দ্রে মানুষের লাইন লেগে থাকে। আগে থেকে সবকিছু ঠিকঠাক না করে গেলে থাকার জায়গা মেলাই কঠিন হয়ে ওঠে।

একটু রোমাঞ্চপ্রিয় যারা তারা তো যেতেই চাইবে বান্দরবানের দুর্গম থানচিতে। জেলা সদর থেকে থানচির বাস সার্ভিস রয়েছে। জনপ্রতি ২০০ টাকা ভাড়ায় থানচিতে পৌঁছানো যাবে। রোমাঞ্চটা এর পরই বড় পাহাড়ে যাওয়ার পথে। এখানে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় পাহাড়ী নদী ধরে এগোলে দেখা যাবে একদিকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে সবুজ পাহাড়, অন্যদিকে নদীর ওপর দাঁড়িয়ে আছে বড় বড় পাথর। বিমোহিত করার মতো এ সৌন্দর্য নিজের চোখে কম মানুষই দেখেছেন। নাফাকুমে যেতেই চোখে পড়বে রেমাক্রি মুখ, পাথরের ভাঁজে ভাঁজে প্রবাহিত পানির ঝর্ণা। আর এ জায়গা থেকে পাহাড় ও বন মাড়িয়ে মোটামুটি ১৩ কিলোমিটার হাঁটা পথ পেরিয়ে যেতে হয় নাফাকুমে। ২৫-৩০ ফুটের এ জলপ্রপাতটি রেমাক্রি হয়ে মিলেছে সাঙ্গু নদীতে। তবে সেখানে থাকার ব্যবস্থায় আছে নতুনত্ব। এখানে নেই কোন হোটেল-মোটেল-কটেজ। এখানে থাকতে হবে আদিবাসীদের বাড়িতে। জনপ্রতি ১৫০ টাকা করে খরচ হয়। খাবার খরচ আলাদা। পছন্দমতো নিজের ইচ্ছায় খাবার পাওয়া যায়। এখানে আসার দুটি উদ্দেশ্য- এক সৌন্দর্য দর্শন, দুই আদিবাসীদের জীবন ঘনিষ্টভাবে দেখা, তাদের জানা।

সারাবছরই বান্দরবানে পর্যটকদের ভিড় থাকে। তবে শীত আর বর্ষার সৌন্দর্য যেন তার আর ধরে না। যেদিকে দু’চোখ যায় সেদিকে সবুজের সমাহারে বর্ণিল এক সাজে নতুন সাজ ধারণ করে আছে বান্দরবান। বর্ষার অবিরাম বর্ষণের জলধারার পরশে পাহাড়ের বৃক্ষরাজি নব যৌবন লাভ করে। মেঘ আর পাহাড়ের সম্পর্ক এখানে বড্ড ঘনিষ্ঠ। পাহাড়ের সঙ্গে আকাশের সারি সারি মেঘ যেন ছুঁয়ে ছুঁয়ে যায়। জেলার অন্যতম পর্যটন দেশের দ্বিতীয় স্বাস্থ্যকর স্থান চিম্বুক আর নীলগিরির ওপর দাঁড়িয়ে মেঘ স্পর্শ করার অপূর্ব সুযোগ হাতছাড়া না করতে চাইলে ভ্রমণের জন্য বেছে নিতে হবে বান্দরবানকে।

ঢাকা থেকে মোটামুটি সব পরিবহনের এসি, নন-এসি বাস যায় বান্দরবান। ভ্রমণকারীদের কথা মাথায় রেখে এ জেলায় চলাচল করে বিলাসবহুল পরিবহন। ভাড়া মোটামুটি ৮০০ থেকে এক হাজার ৫০০’র মধ্যে। বান্দরবানে হোটেল মালিক সমিতির তথ্য অনুযায়ী ৪৬ হোটেল-মোটেল রয়েছে। এর ভাড়া ৫০০ থেকে পাঁচ হাজারের মধ্যে। এখন মোটামুটি ডিজিটাল যুগে সব হোটেলের ঠিকানাই পাওয়া যাবে অনলাইনে। এর সঙ্গে হোটেলের সুযোগ-সুবিধা, ভাড়ার পরিমাণ সবই জানা যাবে ঘরে বসেই। কোন কোন ক্ষেত্রে ফোনে আপনি হোটেল বুকিংও দিতে পারবেন ঘরে বসেই।

আকাশের মেঘমালা পাহাড়ের বুকে নিজেকে স্পর্শ করার জন্য এতটা নিচে নেমে আসে যা নিজে না দেখলে হয়ত আপনার কাছে অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে। তবে এতটাই সত্য যে, চিম্বুক আর নীলগিরির মেঘের মধ্যে আপনি অদৃশ্য হয়ে যাবেন। যেদিকে তাকাবেন সেদিকের সবুজ পাহাড় সাদা মেঘের আড়ালে চলে যাবে তখন ওই মুহূর্তটি আপনার কাছে যেমন আনন্দের মনে হবে আবার এ কোন জায়গায় এলাম এমনও মনে হতে পারে আপনার।

বান্দরবানের প্রতিটি উপজেলায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে অসংখ্য দর্শনীয় স্থান। সবুজ পাহাড়ের সঙ্গে মারমা, মুরং, ত্রিপুরা, বম, তংচঙ্গা, চাকমা, চাক্, খেয়াং, খুমী, লুসাই, কুকি, পাংখোসহ মোট এগারোটি নৃ-জনগোষ্ঠীর নাগরিক জীবনের সুযোগ-সুবিধা থেকে অনেকটা বঞ্চিত থেকে ও পাহাড়ের বুকে জীবনযুদ্ধে কিভাবে টিকে আছে তাদের বৈচিত্র্যময় জীবনধারা আপনি দেখতে পাবেন বান্দরবানে। আর এজন্যই হয়ত এ আবাসভূমি ধীরে ধীরে হয়ে উঠছে সৌন্দর্যপিয়াসী পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। জীবনের ছকে বাঁধা একঘেঁয়েমি থেকে বেরিয়ে যে কেউ এখানে হারিয়ে যেতে পারেন নীলাচলের মেঘে ঢাকা পাহাড়ে, মেঘলা লেকের স্বচ্ছ জলে ভাসাতে পারেন ডিঙ্গি নৌকা অথবা ঘুরে আসতে পারেন চিম্বুক পাহাড়ের ম্রো নৃ-গোষ্ঠীর গ্রামে।

অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর জাতিবৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ এ জেলা বছরজুড়ে পর্যটকদের পদচারণায় মুখরিত থাকে। জেলার সব উপজেলাজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা মেঘলা, মিলনছড়ি, নীলাচল, চিম্বুক, শুভ্রনীলা, রিজুক ঝর্ণা, নীলগিরি, মিরিজ্ঞা, শৈলপ্রপাত, বড় মদক, ছোট মদক, রেমাক্রি, নাফাকুম, বগালেক, কেওক্রাডং, প্রন্তিক লেক, বৌদ্ধ ধাতুজাদী, রামজাদী, তাজিংডংসহ (বিজয়) অসংখ্য পর্যটনের দর্শনীয় স্থান।

জেলা শহর থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে মেঘলা পর্যটন কমপ্লেক্সে রয়েছে মিনি চিড়িয়াখানা, লেকের উপর দুটি ঝুলন্ত ব্রিজ, কেবলকার, রেস্টুরেন্ট আর নৌকা ভ্রমণের ব্যবস্থা। মেঘলার সঙ্গেই রয়েছে পর্যটন কর্পোরেশনের মোটেল এবং বেসরকারী পর্যটন কেন্দ্র হলিডে ইন রিসোর্ট। হলিডে ইনে উন্নতমানের খাবারের পাশাপাশি রয়েছে প্রকৃতির সান্নিধ্যে নজরকাড়া কটেজে রাতযাপনের সুযোগ।

বান্দরবান-কেরাণীহাট রোডের টাইগারপাড়ায় গড়ে তোলা হয়েছে পর্যটন কেন্দ্র নীলাচল ও শুভ্র নীলা রেস্তরাঁ। ১৮শ’ ফুট উঁচু নীলাচল থেকে একনজরে বান্দরবান শহর যেমন দেখা যায়, তেমনই দেখা যায় দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ পাহাড়ের সারি আর রাতের বন্দরনগরী চট্টগ্রামের রহস্যময় দৃশ্য। আরও দেখে নিতে পারেন বান্দরবান শহরকে আর অন্যদিকে নৃ-জাতি বম সম্প্রদায়ের পাহাড়ের বুকে বসবাসের দৃশ্য। বান্দরবান-চিম্বুক রোডের চার কিলোমিটারে গড়ে তোলা হয়েছে মিলনছড়ি। আর মিলনছড়িতে রয়েছে মারমা, ম্রো ও বম জনগোষ্ঠীর আদলে তৈরি মাচাংঘর, যা নজর কাড়ে।

বান্দরবান থেকে ২৬ কিলোমিটার দূরে রয়েছে বাংলার দার্জিলিংখ্যাত চিম্বুক পাহাড়। তিন হাজার ৫শ’ ফুট উঁচু এ পাহাড়ে না উঠলে বান্দরবান ভ্রমণের মূল আনন্দই যেন অদেখা থেকে যায়। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পর্যটকরা ভারতের দার্জিলিংয়ে বেড়াতে যান। পর্যাপ্ত আধুনিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা এবং জেলার অভ্যন্তরীণ সড়ক যোগাযোগ অবকাঠামো আরও উন্নত করা গেলে বান্দরবান ভারতের দার্জিলিংকেও হার মানাবে। পার্বত্য চট্টগ্রামের দ্বিতীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ ম্রো সম্প্রদায়ের বাস সেখানে। পাহাড়ের বুক চিরে সর্পিলগতিতে চলে যাওয়া উঁচু-নিচু রাস্তার দু’পাশের সারি সারি পাহাড় দেশের সীমানা পেরিয়ে মিশে গেছে মিয়ানমারের আরাকান পর্বতশ্রেণীর সঙ্গে। সমতল থেকে যেসব পাহাড়কে মনে হয় অনেক উঁচু, চিম্বুক ও এর আশপাশের পাহাড় থেকে সেগুলোকে মনে হবে ছোট ছোট টিলা। জেলা শহরের কাছেই রুমা উপজেলায় রয়েছে দেশের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ তাজিংডং, দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ কেওক্র্যাডং, দুই হাজার ৫শ’ ফুট উঁচু পাহাড়ের চূড়ায় কিংবদন্তির বগালেক ও রিজুক ঝর্ণা। এসবের আকর্ষণে প্রতি বছর শত শত পর্যটক ছুটে যান সেখানে। শহর থেকে তিন কিলোমিটার দূরে বালাঘাটায় পাহাড়ের চূড়ায় স্থাপত্যকলার এক অপূর্ব নিদর্শন বৌদ্ধজাদী। সোনালী রঙের কারুকার্য খচিত জাদীর বিভিন্ন স্থানে শোভা পাচ্ছে চীন, জাপান, থাইল্যান্ড ও মিয়ানমারসহ বিশ্বের ১৪ দেশ থেকে আনা অনেক প্রাচীন বুদ্ধমূর্তি। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের পাশাপাশি অন্য ধর্মের অনুসারী পর্যটকরাও সেখানে ভিড় করেন এসব স্থাপত্য নিদর্শন দেখার জন্য।

কাপ্তাই হ্রদ একেক ঋতুতে একেক রূপ ধারণ করে। বিশাল কাপ্তাই হ্রদে পতিত ছোট-বড় ঝর্ণার সংখ্যা ২১। এদের মধ্যে সুভলং, বরকল ও রাইনখং ঝর্ণা বিখ্যাত। এসব ঝর্ণা ঋতুভেদে ভিন্ন ভিন্ন রূপ ধারণ করে। শুষ্ক মৌসুমে ঝর্ণাধারা যেমন শুকিয়ে যায়, বর্ষায় তা জেগে ওঠে। পাহাড়ী শহর রাঙ্গামাটির শহীদ মিরার ঘাট থেকে ছোট ইঞ্জিনচালিত নৌকায় কাপ্তাই লেকে ভ্রমণ করা যায়। হ্রদের ঢেউয়ের ওপর দিয়ে মৃদু বাতাসে চলতে চলতে দিগন্তজোড়া শুভ্রতায় মন ভরে যায় আগন্তুকের।

হ্রদের একদিকে দেখা যায় ঝুম ঝুম বৃষ্টি পড়ছে, অপরদিকে প্রখর রৌদ্র। অথচ পাশের পাহাড়ের কোলঘেঁষে ভেসে বেড়ায় শুভ্র খ- খ- মেঘমালা। এ যেন অন্য রকম ভাল লাগার দ্যুতি। কান্দার মুখ যেতেই চোখে পড়ল হ্রদের দু’পাশে সুউচ্চ পাহাড়ের সারি। হ্রদ থেকে এ পাহাড়ের উচ্চতা গড়ে ৫শ’ ফুটের উপরে। এ পাহাড়ে রয়েছে হরেক রকমের পশু-পাখি আর বানর-হনুমানের পাল। এ পাহাড়ের হাজারো বছরের পুরনো পাললিক শিলা বিন্যাসের স্তর দেখলে মন ভরে উঠবে অনাবিল আনন্দে। আরেকটু এগিয়ে যাওয়ার পার চোখ ধাঁধানো বিখ্যাত সুভলংয়ের ঝর্ণা চোখে পড়বে। এখানে রয়েছে বেশ কয়েকটি ছোট-বড় ঝর্ণা। এখানকার নয়নাভিরাম প্রকৃতি অপূর্ব দৃশ্য দেখে থমকে দাঁড়াতে হবে। পাহাড়ের চারদিকের সৌন্দর্যে অনাবিল স্বর্গের আনন্দ স্পর্শ পাওয়া যাবে।

ঢাকা থেকে কাপ্তাই যাওয়ার পথ বেশ ভাল। সরাসরি ২৩৪ কিলোমিটার পাড়ি দিলেই এ পাহাড়ী জেলার দেখা পাওয়া যাবে। এখানে থাকার সুব্যবস্থা আছে। জেলায় পর্যটকদের স্বাগত জানাতে গড়ে উঠেছে অন্তত ৩০ হোটেল-মোটেল। ভাড়াও তুলনামূলক বেশ কম। মোটামুটি এক হাজার থেকে আড়াই হাজারের মধ্যে একটি ডাবল রুম পাওয়া যাবে। আর সপরিবারে কয়েকজন মিলে থাকতে হলে রয়েছে বাহারি সজ্জার কটেজ। ভাড়া চার থেকে সাত হাজারের মধ্যে।

সুভলং বাজারে গেলেই পাহাড়ী সূর্যমুখী কলা আর বিখ্যাত ছানার মিষ্টি খেতে ইচ্ছা করবে। এখানকার সেনা ক্যাম্পে রয়েছে একটি মিনি চিড়িয়াখানা। বনের কয়েক প্রজাতির হরিণ, বানরসহ বেশকিছু বন্যপ্রাণী খাঁচায় বন্দী রয়েছে। পাহাড়ে যে এক সময় অজস্র বন্যপ্রাণী ছিল তারই প্রমাণ মেলে এ মিনি চিড়িয়াখানায়।

নিসর্গ কাকে বলে তা পাওয়া যাবে সিলেটে। সবুজ চা বাগান, সীমান্তজুড়েই আকাশছোঁয়া পাহাড়ের পাদদেশে জাফলংয়ের পাথর নদী পিয়াইন, বিছনাকান্দি, খাসিয়াপুঞ্জি, পান্থমাই, রাতারগুল, লালাখাল, হাকালুকি হাওড়সহ নানাভাবে ছড়িয়ে থাকা প্রকৃতির উদারতা। দিনের বেলা এসব জায়গা ঘুরে প্রকৃতির রূপ উপভোগ করে শহরের কোলাহল মুখরিত পরিবেশে কোন হোটেলে না এসে নিরিবিলি প্রাকৃতিক পরিবেশে রাত কাটানোর বিষয়টি প্রাধান্য দিতেই ইচ্ছা হয়। পর্যটক আর প্রকৃতিপ্রেমী ভ্রমণ পিপাসুদের আনাগোনা দিন দিন বাড়ছে সিলেটে।

সাধারণ শ্রেণীর পাশপাশি বিলাসবহুল তারকামানের হোটেল গড়ে উঠছে শহরে। নগরীর বাইরে প্রাকৃতিক পরিবেশে উন্নতমানের রিসোর্টগুলোও ভ্রমণবিলাসীদের মনোরঞ্জনে সমানতালে এগিয়ে চলছে। সিলেট শহর থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে খাদিমনগর এলাকায় নির্জনতায় গড়ে উঠেছে নাজিমগড় রিসোর্ট। তাদেরই ব্যবস্থাপনায় মেঘালয় সীমান্তে লালাখাল নদীর তীরঘেঁষে তৈরি হয়েছে পিকনিক স্পট। দিনের বেলা লালাখালে নৌকায় বেড়ানো কিংবা পাশের খাসিয়াপল্লী ঘুরে দেখা, হয়তবা চা বাগানের সরু পথে হাঁটাহাঁটি করে বিকেল-সন্ধ্যায় নিরিবিলি সময় কাটাতে অন্য রকম অবসরযাপন কেন্দ্র এ নাজিমগড় রিসোর্ট।

সিলেট শহর থেকে মাত্র ১৫ মিনিটের রাস্তা। সিলেট-জাফলং মহাসড়কের পাশেই অবস্থিত এ জমকালো রিসোর্টটি। প্রায় ছয় একর জায়গার ওপর গড়ে উঠেছে দেশের অন্যতম সুন্দর এ রিসোর্টটি, যেখানে রয়েছে প্রায় দু’শতাধিক লোকের খাওয়া-দাওয়াসহ রাত্রিযাপনের সুবিধা। রিসোর্টটি সব বয়সীদের জন্যই উপযোগী। নাজিমগড় ওয়াইল্ডারনেস গ্রীষ্মম-লীয় রিসোর্ট হিসেবে অতুলনীয়। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সঙ্গে দারুণ ও সুপরিকল্পিত নির্মাণশৈলী এ রিসোর্টটিকে অপ্রতিম করে তুলেছে। সন্ধ্যায় ওয়াইল্ডারনেসের অসাধারণ এক অনুপম রূপ দেখা যায়। কৃত্রিম আলোর সঙ্গে প্রকৃতির মিশেল ঘটিয়ে রিসোর্টটি হয়ে ওঠে দারুণ সুন্দরী। আর রাতের আকাশে চাঁদ থাকলে তো কথাই নেই। নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভাল হওয়ায় রিসোর্ট সীমানায় যত রাত ইচ্ছা অবস্থান করা যায়। প্রায় ৯৯ বিঘা জায়গা নিয়ে ওয়াইল্ডারনেসের অবস্থান। এখানে জায়গা নিয়ে এর পরিধি আরও বৃদ্ধির পরিকল্পনা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। তাই নিজের মতো করে ঘুরে বেড়ানোর জায়গার অভাব নেই। ওয়াইল্ডারনেসে আছে পরস্পর সংযুক্ত চারটি ভবন (ট্রি টপ, নেস্ট, লজ ও চ্যালেট)। ভবনগুলোতে চার ধরনের ৩৮ রুম নিয়ে চমৎকার থাকার ব্যবস্থা। সারী নদীর লালাখাল ঘাটের তীরঘেঁষে এ রিসোর্টটি ২০১৩ সালে নির্মিত হয়েছে। আবাসিক অতিথি ছাড়া এ রিসোর্টে প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত। তাই এখানে নিজের সঙ্গে সময়টা বেশ আনন্দময় হয়ে ওঠে। পাহাড়ের ঢেউ দেখার দারুণ জায়গা এটি। পনেরোটি কটেজ আছে এখানে।

এখানে নদীর ওপারে ঝুলন্ত সেতু, এপারে নাজিমগড়ের রেস্টুরেন্ট। পাশেই খাসিয়াপল্লী, পানের বরজ। নদীতে চলছে পাথর উত্তোলনের কাজ। এ সৌন্দর্য উপভোগ করা থেকে কে বঞ্চিত থাকতে চায়। নাজিমগড় রিসোর্টে থাকার জন্য আছে তিন ধরনের ব্যবস্থা। আছে বিশাল টেরেস, ছোট ছোট বাংলো ও বড় ভিলা। একেকটির ভাড়া একেক রকম, তবে আধুনিক সুযোগ-সুবিধায় পাঁচতারা হোটেলের সমান। আছে স্পা ও পুল, যেখানে দূর করতে পারেন শরীরের অবসাদ। সবচেয়ে বড় কথা, প্রতিটি স্থাপনাই গাছপালা-জঙ্গলে ছাওয়া টিলার ধারে।

সিলেটে শীতের মৌসুমে এমনিতেই পর্যটকের সংখ্যা বাড়ে প্রচুর। দেশে তো বটে, বিদেশেও প্রতি বছর বেড়াতে যাওয়ার মতো বাংলাদেশীদের আর্থিক সঙ্গতি হয়েছে। বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বে অবস্থিত প্রাচীন জনপদ সিলেট। এখানে ভ্রমণকারীদের মূল টার্গেট থাকে হযরত শাহজালাল (র) ও শাহপরাণের (র) মাজার জিয়ারত। সেই সঙ্গে সুনীল আকাশ আর গাঢ় সবুজ পাহাড়ের অপরূপ সৌন্দর্য, শিল্পীর তুলিতে আঁকা মখমলের মতো চা বাগানের মনোরম দৃশ্য, পাহাড়ী নদীর স্বচ্ছ পানিতে পাথরের স্তূপ এবং অতিথি পাখি আর জলপ্রপাতের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য পর্যটকদের টেনে আনে বার বার। সিলেটে এসে যেখানে থাকবেন সেটাও যদি হয় দেখার মতো, সময় কাটানোর মতো কিছু! তাহলে ভ্রমণটা নিশ্চই চমৎকার হবে।

এক্সেলসিয়র সিলেট হোটেল এ্যান্ড রিসোর্ট। অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা এক্সেলসিয়র সিলেট যেন প্রকৃতির মাঝে আধুনিকতার এক অসাধারণ সমন্বয়। সিলেট শহর থেকে মাত্র ৯ কিলোমিটার দূরে খাদিমপাড়ায় তিনটি টিলার সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে এটি। প্রায় সতেরো একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত পঞ্চাশ হাজার বৃক্ষরাজিশোভিত এ প্রতিষ্ঠানে রয়েছে দুটি হোটেল ভবন। এক্সেলসিয়র সিলেটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাঈদ চৌধুরী এ প্রকল্পের নান্দনিক পরিবেশসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা ও ভবিষ্যত পরিকল্পনা তুলে ধরে বলেন, হযরত শাহপরাণের (র) মাজারের নিকটবর্তী সিলেটের খাদিমপাড়ায় প্রতিষ্ঠিত হলিডে রিসোর্ট ও ইকোপার্ক জাকারিয়া সিটি কিনে নিয়েছে এক্সেলসিয়র গ্রুপ। আছে প্রাইভেট বুকিং সুবিধা এবং পারিবারিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ভোজসভায় মিলিত হওয়ার অনন্য সুযোগ। এক্সেলসিয়রে রয়েছে ওয়াটার ওয়েবের মনোরম দৃশ্য, নিরাপদ পরিবেশে খেলাধুলা ও শরীরচর্চা, বৃহদাকার সুইমিংপুলে সাঁতরানো, আঁকাবাঁকা লেকে নৌকা চড়া ও মাছ শিকারের অনুপম সুযোগ।

ইউরোপ, আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের এক শ’ চল্লিশের বেশি দেশে ছড়িয়ে আছেন ৭০ লাখ বাংলাদেশী। প্রতি বছর এ বিপুলসংখ্যক প্রবাসীর একটা উল্লেখযোগ্য অংশ সিলেট ভ্রমণ করেন। সিলেটের খাদিমনগরে গড়ে উঠেছে শুকতারা নেচার রিসোর্ট। পাহাড় আর বন-বনানী এখানে মিলেমিশে একাকার। ঘরে বসেই উপভোগ করা যাবে পাহাড়ের মোহনীয় রূপ। টিলার চূড়ায় অবস্থান শুকতারার। ১৪ একর জায়গাজুড়ে এ রিসোর্ট। শুকতারার স্থাপত্য আর নির্মাণশৈলী এমন, যাতে প্রকৃতির গায়ে একটুও আঁচড় পড়েনি। চা বাগানের রাস্তা থেকে শুকতারার পথ ধরে এগোলে প্রথমে সবুজ একটি টিলা। টিলার নিচে এক পাশে রিসোর্টের ফটক। টিলার চূড়ায় ওঠার একটিই পথ। এক পাশে রয়েছে টয় ট্রেনলাইন। সমতল থেকে প্রায় ৫০ ফুট উঁচুতে উঠলে প্রকৃতিকে সঙ্গী করে নির্মিত ছোট ছোট নিবাস, কটেজ নজর কাড়বে। রিসোর্টে রয়েছে মোট ১১ কটেজ। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত আর ২৪ ঘণ্টা গরম পানির ব্যবস্থাও আছে কটেজে। বাগানের তাজা ও সতেজ চা-কফি নিজ হাতেই তৈরি করতে পারবেন। কটেজের বাসিন্দারা জানালা ও বারান্দার কাছ থেকে পাহাড়-টিলা দেখার অপূর্ব সুযোগ পান। প্রকৃতির কাছে লীন হলেও বাইরের জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হতে হবে না। গ্রন্থাগারে আছে দেশ-বিদেশের বই।