আন্তর্জাতিক মিত্র বাড়াচ্ছে সংসদীয় মৈত্রী গ্রুপ

সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে বৈরিতা নয়’ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মূল্যবোধসমৃদ্ধ বলিষ্ঠ এই পররাষ্ট্রনীতির আলোকে প্রতিবেশী দেশসহ সারাবিশ্বের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক জোরদারে কাজ করছে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, জাপানসহ প্রভাবশালী দেশগুলোর সঙ্গে সংসদীয় মৈত্রী গ্রুপ গঠনের মাধ্যমে এই নীতি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর নেতৃত্বে চলা নবম ও দশম সংসদে আশিয়ানভুক্ত অধিকাংশ দেশসহ বিশ্বের প্রায় অর্ধেক দেশের সঙ্গে এরই মধ্যে মৈত্রী হয়েছে। বাকি রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গেও মৈত্রী গ্রুপ গঠনের কাজ প্রক্রিয়াধীন আছে বলে জানিয়েছে সংসদ সচিবালয়।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও সংসদ বিশ্লেষকরা বিভিন্ন রাষ্ট্রের সঙ্গে সংসদীয় মৈত্রী গ্রুপ গঠনের বিষয়টিকে ‘নজিরবিহীন’ আখ্যা দিয়ে বলছেন, এর মাধ্যমে বাংলাদেশ বিশ্বসমাজে নিজের আসনটি পাকাপোক্ত করে ফেলছে। প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলোর আজ্ঞাবহ থেকে তাদের প্রভু হিসেবে না মেনে তাদের সঙ্গে মৈত্রী করে নিজেকে প্রভাবশালীদের কাতারে সামিল করার এই নীতিটি প্রশংসনীয়। এর মাধ্যমেই কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি অ্যাসোসিয়েশন (সিপিএ) ও ইন্টার পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের (আইপিইউ) মতো আন্তর্জাতিক দুটি বড় সংস্থার নেতৃত্ব পাওয়াটা সহজতর হয়েছে বলে মনে করছেন তারা।
সংসদ সচিবালয় সূত্রে জানা গেছে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের সার্বিক যোগাযোগ আরো নিবিড় করতে এমপিদের সক্রিয় করা হচ্ছে। বিশ্বের প্রভাবশালী বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যোগাযোগ প্রক্রিয়া বেগবান করতে এমপিদের দিয়ে সংসদীয় মৈত্রী গ্রুপ গঠন করে দিচ্ছেন জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী। সম্প্রতি স্পিকারের অনুমোদন নিয়ে বাংলাদেশ ও ব্রিটেন সংসদীয় মৈত্রী গ্রুপের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক লে. কর্নেল (অব.) মুহাম্মদ ফারুক খানকে সভাপতি করে গঠিত এই গ্রুপে সদস্য রয়েছেন- আওয়ামী লীগের এমপি আশিকুর রহমান, ড. আবদুর রাজ্জাক, মাহবুব আরা বেগম গিনি, সানজীদা খানম এবং জাতীয় পার্টির এমপি সেলিম উদ্দীন।
জিল্লুল হাকিম এমপিকে সভাপতি করে গঠিত হয়েছে বাংলাদেশ-জাপান সংসদীয় মৈত্রী গ্রুপ। এই কমিটির অন্য সদস্যরা হলেনÑ হুইপ শেখ আবদুল ওহাব, মনোয়ার হোসেন চৌধুরী, সানজিদা খানম প্রমুখ। জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ আ স ম ফিরোজকে সভাপতি করে গঠন করা হয় বাংলাদেশ-জার্মান সংসদীয় মৈত্রী গ্রুপ। এই গ্রুপের অন্য সদস্যরা হলেনÑ মোহাম্মদ সুবিদ আলী ভূঁইয়া, শফিকুর রহমান চৌধুরী, গোলাম দস্তগীর গাজী, এবিএম আনোয়ারুল হক, মো. ইসরাফিল আলম, মো. মনোয়ার হোসেন চৌধুরী ও মো. আবদুছ সাত্তার।
বাংলাদেশ-বাহরাইন সংসদীয় মৈত্রী গ্রুপের সভাপতি ও আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী। এই গ্রুপে সদস্য রয়েছেন- ফজিলাতুন নেসা বাপ্পি, ওয়ারেসাত হোসেন বেলালসহ আরো অনেক এমপি।
বাংলাদেশ ও ইরানের এমপিদের মধ্যে পারস্পরিক বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক সুদৃঢ়করণের লক্ষ্যে ইতিমধ্যে বাংলাদেশ-ইরান সংসদীয় মৈত্রী গ্রুপ গঠন করা হয়েছে। এই কমিটি দু’দেশের সংসদীয় রীতি-নীতি ও ভাবের আদান-প্রদান ছাড়াও রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক বিষয়ে সহযোগিতার সম্ভাব্য দিকগুলো খুঁজে বের করবে।
সবচেয়ে বড় সংসদীয় মৈত্রী গ্রুপ হচ্ছে বাংলাদেশ-সৌদি আরব সংসদীয় মৈত্রী গ্রুপ। এই গ্রুপে সদস্য সংখ্যা ১২ জন। বজলুল হক হারুন এমপিকে সভাপতি করে গঠিত এই গ্রুপে সদস্য রাখা হয়েছে একেএম আউয়াল (সাইদুর রহমান), গিয়াস উদ্দিন আহমেদ, তালুকদার মো. ইউনুস, মো. নজরুল ইসলাম বাবু, বেনজীর আহমেদ, মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরী, মো. সফিকুল ইসলাম, মোল্লা জালাল উদ্দীন ও জিল্লুল হাকিম এমপিকে।
জাতীয় সংসদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি সূত্রে জানা গেছে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের যোগাযোগ আরো নিবিড় করতে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্তে সংসদীয় মৈত্রী গ্রুপ গঠনের কাজ শুরু হয়। বিশ্বের প্রভাবশালী বিভিন্ন দেশ বিশেষ করে আসিয়ানভুক্ত অধিকাংশ দেশের সঙ্গে এরই মধ্যে মৈত্রী গ্রুপ গঠন করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, চীন, রাশিয়ার সঙ্গে মৈত্রী গ্রুপ গঠনের কাজ চলমান রয়েছে। অন্য দেশগুলোর সঙ্গেও গঠনের কাজ প্রক্রিয়াধীন।
সূত্র জানায়, দশম সংসদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি গঠিত হওয়ার পর প্রথম বৈঠকেই প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত, মিয়ানমার, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, চীন, জাপান, মধ্যপ্রাচ্য, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, রাশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকার দেশগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক কেমন হবে, সে বিষয়ে আলোচনা করা হয়। ওই বৈঠকেই যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সংসদীয় মৈত্রী গ্রুপ গঠনের সুপারিশ করেন কমিটির সব সদস্য। এরপরই বিভিন্ন দেশের সঙ্গে গ্রুপ গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করেন স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ও ব্রিটেন সংসদীয় মৈত্রী গ্রুপের সভাপতি ও আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ফারুক খান বলেন, বাংলাদেশ ও ব্রিটেনের সংসদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক আরো নিবিড় করতে এই কমিটি গঠন করে দিয়েছেন স্পিকার। এটি সংসদীয় কমিটি হলেও এই কমিটির মধ্য দিয়ে দু’দেশের এমপি এবং রাজনীতিবিদদের মধ্যকার সম্পর্ক আরো জোরদার হচ্ছে। গ্রুপ গঠনের বিষয়টিতে সবাই আগ্রহ প্রকাশ করছেন জানিয়ে তিনি বলেন, দক্ষিণ কোরিয়াসহ অনেক দেশ বাংলাদেশের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে একই ধরনের মৈত্রী গ্রুপের কার্যক্রম শুরুর পক্ষে ইতিমধ্যে আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিক উইংয়ের কাছে তাদের আগ্রহের কথা জানিয়েছেন। সব দেশের সঙ্গে গ্রুপ গঠিত করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ প্রভাবশালী দেশ হিসেবেই পরিগণিত হবে।