শুল্ক গোয়েন্দায় যুক্ত হচ্ছে হেলিকপ্টার

হেলিকপ্টার, ফরেনসিক ল্যাব ও উচ্চ প্রযুক্তির গোয়েন্দা সামগ্রী যুক্ত হতে যাচ্ছে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরে। এসব সরঞ্জামের মাধ্যমে চোরাচালান ও শুল্ক ফাঁকি রোধে র‌্যাব ও বিজিবির মতোই দেশজুড়ে অভিযান চালাবে সংস্থাটি। এ লক্ষ্যে সংস্থাটির জনবল কাঠামো ঢেলে সাজানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
এসব প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর একটি পূর্ণাঙ্গ গোয়েন্দা সংস্থার অনুরূপ প্রতিষ্ঠান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। একই সঙ্গে চোরাচালান রোধে দেশজুড়ে আরও বিস্তৃত পরিসরে কার্যক্রম চালাতে পারবে সংস্থাটি।
সম্প্রতি অধিদফতরের পক্ষ থেকে এ সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব সরকারের উচ্চ পর্যায়ে পাঠানো হয়। প্রস্তাবটি বর্তমানে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের বিবেচনাধীন রয়েছে বলে জানা গেছে। এ বিভাগের একটি দায়িত্বশীল সূত্র যুগান্তরকে জানায়, শুল্ক গোয়েন্দা অধিদফতরের প্রস্তাবটি খুবই যুক্তিযুক্ত। এ বিষয়ে শিগগির ইতিবাচক সিদ্ধান্ত আসতে পারে। বিশেষ করে জনবল বাড়ানোসহ হেলিকপ্টার প্রদানের প্রস্তাব গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।
সূত্র জানায়, দেশজুড়ে চোরাচালান, মানি লন্ডারিং ও জঙ্গি অর্থায়ন বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে শুল্ক গোয়েন্দার কার্যক্রম আরও গতিশীল করতে নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণের বিষয়টি সামনে চলে আসে। বিশেষ করে ১৩ ফেব্রুয়ারি শুল্ক গোয়েন্দার উদ্যোগে অনুষ্ঠিত একটি সেমিনারে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিরা এ প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বেশকিছু সিদ্ধান্ত নেন। সেখানেই শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করার পক্ষে মতামত দেন তারা।
শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের কর্মকর্তারা বলছেন, চোরাচালান ও শুল্ক ফাঁকির সঙ্গে অর্থ পাচার ও জঙ্গি অর্থায়নের সংযোগ রয়েছে। এছাড়া পরিবর্তিত বৈশ্বিক প্রেক্ষিতে বৈদেশিক বাণিজ্যের মোড়কে সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ এমনকি সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় অপরাধও সংঘটিত হচ্ছে। সে কারণেই অবৈধ বাণিজ্যের ক্ষেত্র সংকুচিত করা প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের বর্তমান সক্ষমতা এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় যথেষ্ট নয়। কারণ এ অধিদফতরের বর্তমান জনবল মাত্র ১৮৪ জন। এর মধ্যে মাঠ পর্যায়ে কর্মরত আছেন সর্বসাকুল্যে ৬৪ জন। অথচ দেশের বিস্তৃত সীমান্ত ও বন্দর এলাকার তুলনায় এ জনবল কাঠামো একেবারেই অপ্রতুল। এছাড়া এ অধিদফতেরর প্রধান হিসেবে মহাপরিচালকসহ আরও কয়েকটি পদের মর্যাদা বিন্যাসের ক্ষেত্রে বৈষম্য রয়েছে। শুল্ক গোয়েন্দার প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, র‌্যাব, বিজিবি এবং অন্য গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানদের মর্যাদা প্রথম ও দ্বিতীয় গ্রেডের। এমনকি ভারতীয় শুল্ক গোয়েন্দা ডিআরআই (ডাইরেক্টরেট অব রেভিনিউ ইন্টেলিজেন্স) মহাপরিচালকের পদমর্যাদা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সদস্যের অনুরূপ। কিন্তু বাংলাদেশে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের মহাপরিচালকের পদটি এখনও তৃতীয় গ্রেডেই রয়ে গেছে। প্রস্তাবিত কাঠামোয় এ পদটিকে প্রথম গ্রেডে উন্নীতকরণসহ ৩ হাজার ১৬৮ জনের পূর্ণাঙ্গ জনবলের কথা বলা হয়েছে। এছাড়া দুর্গম সীমান্ত এলাকায় অভিযান চালানোর জন্য দুটি হেলিকপ্টার, ৫টি নৌযান ও অন্যান্য কৌশলগত গোয়েন্দা সামগ্রী চাওয়া হয়েছে। অধিদফতরের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষায় শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর দেশের অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থার মতোই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। বিশেষ করে অর্থ আইন ২০১৬ অনুযায়ী শুল্ক সংক্রান্ত যে কোনো অপরাধ তদন্তের ক্ষেত্রে এ অধিদফতরের দায়িত্ব অনেক। অনেকটাই পুলিশের মতো। আইনে অধিদফতরকে ফৌজদারি কার্যবিধি মোতাবেক তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। এছাড়া মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ২০১২ (সংশোধনী ২০১৫) অনুযায়ী চোরাচালানসহ আরও ৫টি অপরাধ তদন্তের ক্ষেত্রেও শুল্ক গোয়েন্দা ক্ষমতাপ্রাপ্ত। কিন্তু যথোপযুক্ত জনবল ও প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সরঞ্জামের অভাবে এ অধিদফতর অভিযান ও তদন্তের ক্ষেত্রে নানা সীমাবদ্ধতার সম্মুখীন হচ্ছে।
শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের কর্মকর্তারা বলছেন, বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর যে পরিমাণ অর্থ পাচার (মানি লন্ডারিং) হয় তার বেশির ভাগ ঘটে বৈদেশিক বাণিজ্যের আড়ালে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার পর্যবেক্ষণেও বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে। এ প্রসঙ্গে গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি (জিএফআই) ২০১৫ সালে যে রিপোর্ট প্রকাশ করে তাতে বলা হয়, ২০১৪ সালে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৭৬ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়েছে। এভাবে গত তিন দশকে দেশ থেকে অন্তত ৫০ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ অর্থ বিভিন্ন দেশে স্থানান্তরিত হয়েছে। এমনকি প্রতি বছর গড়ে দেশ থেকে অন্তত ৫ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হচ্ছে। এসব অর্থ পাচারের ৮০ ভাগই ঘটছে কথিত বৈদেশিক বাণিজ্যের মোড়কে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের মহাপরিচালক ড. মইনুল খান যুগান্তরকে বলেন, দেশ থেকে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার প্রতিরোধ করতে হলে শুল্ক গোয়েন্দার সাংগঠনিক কাঠামো ঢেলে সাজানোর কোনো বিকল্প নেই। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রস্তাবিত জনবল কাঠামো বাস্তবায়ন ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম দেয়া হলে অর্থ পাচার রোধে শুল্ক গোয়েন্দা দৃশ্যমান সফলতা দেখাতে সক্ষম হবে। ইতিমধ্যে দেশের কয়েকটি বিমানবন্দরে স্বর্ণ, মাদক ও বৈদেশিক মুদ্রাসহ ক্ষতিকর পণ্যের অবাধ চোরাচালান প্রতিরোধে শুল্ক গোয়েন্দা ইতিমধ্যে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখাতে সক্ষম হয়েছে।