সবুজের বিপুল সমারোহ

নারায়ণগঞ্জের আদমজী ইপিজেডে পরিবেশবান্ধব কারখানা—রেমি হোল্ডিংসের উন্নত কর্মপরিবেশে পোশাক তৈরির কাজ করছেন নারী শ্রমিকেরাসবুজের সমারোহ। ঢাকা থেকে ৬০ কিলোমিটার দূরে ময়মনসিংহের ভালুকার জামিরদিয়ায় মূল সড়কের ঠিক সঙ্গেই কারখানাটি। আর সেখানে ঢুকতেই চোখে পড়ে বিপুল সবুজের এই সমারোহ। সবুজকে ধরে রাখার চেষ্টায় বিশ্বের অন্যতম সফল নাম এনভয় টেক্সটাইল লিমিটেড। এটি স্বীকৃতি পাওয়া বিশ্বের প্রথম পরিবেশসম্মত জিনস বা ডেনিম কাপড় তৈরির কারখানা।

বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত এই একটি বস্ত্র উৎপাদনকারী কারখানাই পরিবেশসম্মত হিসেবে ‘প্লাটিনাম লিড’ সনদ পেয়েছে। বাংলাদেশের বাইরে সম্প্রতি তুরস্কের একটি কারখানা একই সনদ পায়। পরিবেশ ও জ্বালানি-সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক মান রক্ষা স্থাপনাগুলোর সর্বোচ্চ সনদ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান ইউএস গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিল (ইউএসজিবিসি) এনভয় টেক্সটাইলকে এই সনদ দিয়েছে গত জুনে। ১১০-এর মধ্যে এনভয় টেক্সটাইল পেয়েছে ৮৭ নম্বর। ডেনিম কাপড় উৎপাদক কারখানা হিসেবে এটিই সর্বোচ্চ নম্বর। লিড সনদ প্রাপ্তির অর্থ হলো বেশি উৎপাদনশীলতা, পরিবেশের ওপর কম চাপ এবং কাঁচামালের সর্বোচ্চ ব্যবহার।

সর্বোচ্চ সনদ পাওয়া কারখানাটি কেমন, কীভাবে চলে, প্রায় ২৫ কোটি টাকা বাড়তি খরচ করে উদ্যোক্তারা কেনই-বা সনদ পেতে চাইলেন, শ্রমিকেরা কেমন থাকেন—এসব দেখতেই এই প্রতিবেদক হাজির হন সেখানে। এনভয় গ্রুপের চেয়ারম্যান কুতুবউদ্দিন আহমেদ পোশাকমালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ এবং দেশের অন্যতম প্রভাবশালী চেম্বার এমসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি। ব্যবসা শুরু করেছিলেন তৈরি পোশাক দিয়ে, এখন দেশের অন্যতম প্রধান বস্ত্রশিল্পের প্রতিষ্ঠাতা। জানালেন আট বছর ধরে টেক্সটাইলটি গড়ে তোলার নানা ইতিবৃত্ত।

যন্ত্র থেকে বের হয়ে আসছে ডেনিম কাপড়কলকারখানা বলতেই যাঁরা নোংরা পরিবেশ, সারি সারি দালান, শ্রমিক শোষণ করে মালিকদের মুনাফা করাকেই বোঝেন, সেই ভাবনাকে বদলে দেয় এই প্রতিষ্ঠান।
প্রায় ১৩০ বিঘা জায়গাজুড়ে তৈরি এনভয় টেক্সটাইল। প্রায় ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে। যন্ত্রপাতি আধুনিক, ব্যবস্থাপনা আরও আধুনিক। কাজ করেন প্রায় ২ হাজার ২০০ কর্মী, তাঁরা থাকেনও কারখানার ভেতরে। প্রতিদিনকার জীবন যাপনের সব ধরনের উপকরণের ব্যবস্থা আছে এখানে। এমনকি বিনোদনেরও। পুরো কারখানা ঘুরে দেখলে মনে হবে এমনটিই তো হওয়া উচিত একটি আদর্শ শিল্পপ্রতিষ্ঠান।
তুলা আমদানি করে সুতা, আর সেই সুতা থেকে বস্ত্র তৈরি হয় এনভয় টেক্সটাইলে। তারা তৈরি করে ডেনিম বা জিনস কাপড়। বস্ত্র কারখানায় প্রচুর পরিমাণ রাসায়নিক ও রংয়ের ব্যবহার হয়। এ কারণে এ ধরনের শিল্পকারখানাকে পরিবেশবান্ধব করা সহজ নয়। সুতরাং চ্যালেঞ্জটা ছিল অনেক বড়—এমনটাই জানালেন এনভয় গ্রুপের চেয়ারম্যান কুতুবউদ্দিন আহমেদ। তিনি বললেন, এক দিনে এই কারখানা গড়ে ওঠেনি। চার বছর ধরে কাজ করতে হয়েছে। পরিবেশসম্মত হতে নিতে হয়েছে প্রতিটি পদক্ষেপ। করতে হয়েছে বাড়তি প্রায় ২৫ কোটি টাকা বিনিয়োগ।
পরিবেশবান্ধব একটি বস্ত্র কারখানার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ হচ্ছে পানি পরিশোধনব্যবস্থা। বড় জায়গা নিয়ে তৈরি করা হয়েছে বর্জ্য পানি পরিশোধনের প্ল্যান্ট বা ইটিপি। এই পানিতে মাছ চাষও হয়। এখান থেকে পানি চলে যায় বড় একটি জলাধারে, এটি বড়সড় একটি লেক। লেকটি এখানকার সৌন্দর্য অনেকখানিই বাড়িয়ে দিয়েছে। অগ্নিনির্বাপণের জন্যও ব্যবহার করা হয় এই পরিশোধিত পানি। ধরে রাখা হয় বৃষ্টির পানিও। সব মিলিয়ে এনভয় টেক্সটাইলস পানির চক্রকে সঠিকভাবে কাজে লাগিয়ে বছরে প্রায় ৪০ হাজার কিলো-গ্যালন পানির অপচয় কমাচ্ছে।

কারখানা ভবনের চারদিকে লাগানো আছে সারি সারি গাছ। আছে একটি ইকোপার্ক। পরিকল্পিত বনায়ন এখানকার অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রাকে কমিয়েছে। আবার বনায়নের সঙ্গে প্রাকৃতিক সার ব্যবস্থাপনাও করা হচ্ছে। তৈরি করা হয় জৈব সার। এ জন্য আছে গরুর খামার। রয়েছে কারখানার ভেতরে ও বাইরের তাপমাত্রার পার্থক্য দূর করার নানা ব্যবস্থা। শ্রমিকেরা থাকেন কারখানা চত্বরেই, ভেতরে চলাচলের জন্য রাখা আছে সাইকেল। এর ফলে কারখানায় আসতে এবং ভেতরে চলাচলে যান্ত্রিক কোনো যান ব্যবহার না হওয়ায় শূন্য কার্বন নিঃসরণ হচ্ছে।

জ্বালানি ব্যবহারে একটি দক্ষ ব্যবস্থাপনাই এনভয় টেক্সটাইলকে সবচেয়ে সবুজ হতে বেশি সাহায্য করেছে। বছরে এখানে বিকল্প ব্যবহারের মাধ্যমে জ্বালানি সাশ্রয় করা হয় ১৫ হাজার কিউবিক মিটার। ব্যবহার করা হয় বিদ্যুৎ-সাশ্রয়ী এলইডি বাতি। এতেও প্রতিবছর ৩৫ হাজার কিউবিক মিটার জ্বালানি কম লাগছে।

এ তো গেল এনভয় টেক্সটাইলের কারিগরি দিকের সাফল্য। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটিকে মনে রাখতে হবে এর মানবিক চেহারার জন্য। মনোরম লেকের ধার ঘেঁষেই কর্মীদের থাকার জন্য তৈরি করা হয়েছে আবাস ভবন বা ডরমিটরি। নদীর নামে নাম, পদ্মা ও যমুনা। রয়েছে প্রশস্ত খাবারের কক্ষ। মাত্র ৩০ টাকায় দুই বেলা খাবার দেওয়া হয়। বাকি অর্থ ভর্তুকি দেয় প্রতিষ্ঠান। এর বাইরে চার ঘণ্টা পরপর রয়েছে বিনা মূল্যে টিফিনের ব্যবস্থা, তাও সামান্য নয়। আমিষের চাহিদা মেটাতে ডিম আর ফলের মধ্যে কলা থাকবেই। সঙ্গে বনরুটি বা কেক। এ জন্য আছে নিজস্ব বেকারি। তৈরি করা হয়েছে মসজিদ। আছে সার্বক্ষণিক চিকিৎসাকেন্দ্র। ছোট একটি স্বপরিচালিত দোকানও আছে। সেখানে কোনো বিক্রয়কর্মী নেই। পণ্য কিনে তার দাম বাক্সে রেখে আসতে হয়। আজ পর্যন্ত মূল্য পরিশোধ না করে কেউ কখনো কিছু কেনেননি। হিসাব মিলিয়ে দেখা গেছে, টাকা তো কম নেই-ই, উল্টো ভাংতির সমস্যায় ৫৭ টাকা বেশিই পাওয়া গেছে। যা কিছু প্রয়োজন, সবই রয়েছে পুরো চত্বরে।

কেবল কাজ, খাওয়া আর ঘুমের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই এনভয় টেক্সটাইলের কর্মীদের জীবন। সারা বছর ধরে চলে নানা ধরনের প্রতিযোগিতা ও খেলাধুলা। বছরের এক দিন, ১৬ ডিসেম্বর ঘটা করে পালন করা হয় বিজয় উৎসব। দেওয়া হয় পুরস্কার। প্রত্যেক কর্মীর জন্মদিন পালন করা হয়। ঈদের আগে প্রতিষ্ঠান থেকে পান ঈদ উপহার। দেওয়া হয় চিকিৎসার খরচ। পুত্র বা কন্যার বিয়েতেও দেওয়া হয় আর্থিক সহায়তা।

বিনোদনের নানা ব্যবস্থা আছে এখানে। টেলিভিশন দেখার জন্য আছে ক্লাব ঘর, আছে থ্রিডি সিনেমা দেখার ব্যবস্থা। ডরমিটরির নিচে নামতেই দেখা গেল লেখা আছে ‘ওয়াই-ফাই জোন’। মোবাইল ফোন নিয়ে দিব্যি বসে আছেন অনেক কর্মী। এখানে কথা হয় একাধিক কর্মীর সঙ্গে। জানালেন, প্রত্যেকেই বেতন-ভাতা পান মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে। ছুটিছাটাও নিতে হয় অনলাইন পদ্ধতি ব্যবহার করে। আলাদা করে কাগুজে দরখাস্তের প্রয়োজন হয় না।

২০০৮ সালে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করার পর থেকে একের পর এক সাফল্য পেয়েছে এনভয় টেক্সটাইল। ২০০৯ সালে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার পর থেকে এই খাতের শীর্ষ কোম্পানিতে পরিণত হয়েছে এনভয় টেক্সটাইল। পেয়েছে একাধিক জাতীয় রপ্তানি ট্রফি। ২০১৬ সালে উৎপাদন ক্ষমতা দ্বিগুণ করার পর এনভয় টেক্সটাইল এখন মাসে ৪০ লাখ গজ ডেনিম কাপড় উৎপাদন করে। ১০টি দেশে সরাসরি রপ্তানি হয়, কাজ করছে বিশ্বের বড় বড় ১৪টি ব্র্যান্ডের সঙ্গে। এর মধ্যে রয়েছে মার্কস অ্যান্ড স্পেনসার, জারা, লিভাইস, ওয়ালমার্ট, জেসি পেনি, এইচ অ্যান্ড এম, নেক্সট ইত্যাদি।

বিশ্বব্যাপী জিন্স বা ডেনিম কাপড়ের চাহিদা বাড়ছে। এ নিয়ে প্রতিনিয়ত চলছে নানা পরীক্ষা। রয়েছে নিজস্ব গবেষণাগার। পুরো কারখানা দেখাতে দেখাতে কুতুবউদ্দিন আহমেদ বললেন, ‘স্বপ্ন দেখতে না পারলে এ রকম একটি কারখানা গড়ে তোলা সম্ভব না।’