অভাবনীয় সাফল্য

দারিদ্র্য বিমোচনে বাংলাদেশের অভাবনীয় সাফল্যের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিল বিশ্বব্যাংক। বর্তমানে বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার মাত্র ১৮ শতাংশ। বিশ্বব্যাংকের নতুন পদ্ধতিতে করা হিসাবে এ তথ্য তারা প্রকাশ করেছে। পুরনো পদ্ধতি অনুযায়ী ২০১৫ সালে দেশে দারিদ্র্যের হার ছিল ৪৩ দশমিক তিন শতাংশ।

অন্যদিকে গত ছয় বছরে অতি দারিদ্র্যের হার কমেছে সাড়ে চার শতাংশ। প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকায় অতি দরিদ্রের সংখ্যা মোট জনগোষ্ঠীর মাত্র ১২ দশমিক ৯ শতাংশ।

সোমবার বিশ্বব্যাংকের ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ প্রতিবেদনে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়। রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিশ্বব্যাংক কার্যালয়ের লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন এই প্রতিবেদন এবং বাংলাদেশের অর্থনীতির হালনাগাদ তথ্য তুলে ধরেন। কান্ট্রি ডিরেক্টর চিমিয়াও ফান এ সময় উপস্থিত ছিলেন। উদযাপন করার মতো অনেক সাফল্য এখন বাংলাদেশের রয়েছে উল্লেখ করে চিমিয়াও ফান বলেন, শিক্ষায় জেন্ডার সমতা, সফল পরিবার পরিকল্পনা এবং নগদ অর্থ ট্রান্সফারের ক্ষেত্রে উদ্ভাবনী পদ্ধতির প্রয়োগ দারিদ্র্য হার কমানো এবং নাগরিকদের জীবনমান উন্নয়নের ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, আগে দৈনিক ১.২৫ ডলারের (প্রায় ১০০ টাকা) কম আয়ের মানুষদের আন্তর্জাতিকভাবে অতি দরিদ্র বিবেচনা করা হতো। মূল্যস্ফীতির কারণে ২০১৫ সাল থেকে দারিদ্র্য পরিমাপের এই ভিত্তি ১.৯০ ডলার (প্রায় ১৫০ টাকা) করা হয়। প্রকৃত চিত্র পাওয়ার জন্য ডলার বিপরীতে টাকার বাজারদরের পরিবর্তে ক্রয়ক্ষমতা (পারচেজিং পাওয়ার প্যারিটি) বিবেচনায় নেয়া হয়েছে। ক্রয়ক্ষমতার ভিত্তিতে বর্তমানে বাংলাদেশের ১২ দশমিক ৯ শতাংশ মানুষের দৈনিক আয় ১৫০ টাকার কম।

এ প্রসঙ্গে ড. জাহিদ হোসেন বলেন, দারিদ্র্য বিমোচনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের যে ধারাবাহিকতা তা এই অঞ্চলের ভারত, পাকিস্তান ও ভুটানের চেয়ে অনেক ভাল। ক্রয়ক্ষমতা ও গত অর্থবছরে অর্জিত ৭.১ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধিকে ভিত্তি ধরে অতি দরিদ্রের হিসাব করা হয়েছে। ক্রয়ক্ষমতার হারে প্রতি এক ডলার সমান ৫২.৪ টাকা ধরে আগে দারিদ্র্যের হিসাব করা হতো। প্রকৃত অর্থে টাকার এই ক্ষমতা আরও বেশি। দেখা গেছে, ক্রয়ক্ষমতার ভিত্তিতে ২৪.৮ টাকা দিয়ে এক ডলার সমপরিমাণ পণ্য বা জিনিস কেনা যায়। জাহিদ হোসেন বলেন, আন্তর্জাতিক মানদ-ে কোন দেশের দারিদ্র্যের হার বলতে মূলত হতদরিদ্রকেই বোঝানো হয়। প্রত্যেক অর্থবছরের জিডিপি প্রবৃদ্ধির ভিত্তিতে বিচার করে বিশ্বব্যাংক এই হার ঠিক করে। সেই হিসাবে ২০১০-১১ অর্থবছরে বাংলাদেশে অতি দারিদ্র্যের হার ছিল ১৭ দশমিক ৪ শতাংশ। ২০১১-১২ অর্থবছরে ছিল ১৬ দশমিক ৪ শতাংশ, ২০১২-১৩ অর্থবছরে ছিল ১৫ দশমিক ৫ শতাংশ; ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ছিল ১৪ দশমিক ৭ শতাংশ এবং ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ছিল ১৩ দশমিক ৮ শতাংশ। উল্লেখ্য, দারিদ্র্যের সূচকে বিশ্বের ১৫৪টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থান ৬৪তম।

তবে বর্তমান যে প্রবৃদ্ধি হচ্ছে তার মাধ্যমে এসডিজি নির্ধারিত শূন্য দারিদ্র্য (জিরো পোভার্টি) লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয় বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। প্রবৃদ্ধির বর্তমান ধারা বজায় থাকলে ২০৩০ সালে দারিদ্র্যের হার দাঁড়াবে ৫ দশমিক ৯৮ শতাংশ। শূন্য দারিদ্র্যের লক্ষ্য অর্জনে ৮ দশকি ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন।

চলতি বছর প্রবৃদ্ধি হবে ৬ দশমিক ৮ শতাংশ ॥ সরকার চলতি অর্থবছরে ৭ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ঠিক করলেও বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস বলছে, শেষ পর্যন্ত প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৬ দশমিক ৮ শতাংশ। তাদের মতে রেমিটেন্স ও বেসরকারী বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রবণতাসহ কয়েকটি কারণে আগামী অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়াবে ৬ দশমিক ২ শতাংশ। এই হারে প্রবৃদ্ধি হলে ২০১৭ সালে অতি দারিদ্র্য হার কমে দাঁড়াবে ১২ দশমিক ১ শতাংশ এবং এরপরের বছর তা আরও কমে হবে ১১ দশমিক ৪ শতাংশ।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বব্যাপী দুর্বল প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকা এবং অভ্যন্তরীণ কিছু চ্যালেঞ্জ থাকায় প্রবৃদ্ধি এরকম হবে। বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জ হচ্ছে নিরাপত্তা এবং আর্থিক খাতের অস্থিতিশীলতা ও বিনিয়োগ সমস্যা। নিরাপত্তার অভাবে বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমে যেতে পারে। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ব্রেক্সিট ও যুক্তরাষ্ট্র নির্বাচনে বাণিজ্য সংরক্ষণের বিষয় নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। সেটি হলো ওইসব দেশে রফতানির ক্ষেত্রে করসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রবাসীদের ব্যয় বাড়বে। ফলে বাংলাদেশের রফতানি ও রেমিট্যান্স কমতে পারে, যা প্রবৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্যক্তিখাতে প্রবৃদ্ধি কমছে। অপরদিকে সরকারী বিনিয়োগ বেড়েছে। বেসরকারী বিনিয়োগ গত তিন বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম (জিডিপির ২১ দশমিক ৮ শতাংশ।)। সঞ্চয়ের অভাবে নয়, বরং বিনিয়োগের অভাবে এই সমস্যা। সঞ্চয়ের কিছু অর্থ যাচ্ছে রিজার্ভে আর কিছুটা পাচার হচ্ছে। বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ বাড়লেও এর নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি রয়েছে। এ দুটি ক্ষেত্রে আরও উন্নতি করতে হবে।