স্মার্টকার্ড যুগে বাংলাদেশ

চোখের মণির ছবি ও ১০ আঙুলের ছাপ দিয়ে নিজের স্মার্টকার্ড নেয়ার মধ্যদিয়ে দেশের নাগরিকদের হাতে উন্নতমানের জাতীয় পরিচয়পত্র পেঁৗছে দেয়ার কার্যক্রম উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। নয় কোটির বেশি ভোটার অর্থাৎ যাদের বয়স ১৮ বছরের ঊধর্ে্ব তারাই এই কার্ড পাবেন। এই কার্যক্রমের মধ্যদিয়ে স্মার্টকার্ড যুগে প্রবেশ করল বাংলাদেশ। এই কার্ডের চিপে (তথ্যভান্ডার) নতুন দুই তথ্য ছাড়াও ভোটার হওয়ার সময় প্রত্যেক নাগরিকের দেয়া কমপক্ষে আরও ১৬টি তথ্যও সংরক্ষিত থাকবে।
পুরনো ৩১টি তথ্যের মধ্যে অবশ্যই দিতে হবে_এমন তথ্য ১৬টি। এগুলো হলো ব্যক্তির নাম, বাবার নাম, মায়ের নাম, পেশা, স্থায়ী ঠিকানা, বর্তমান ঠিকানা, বয়স, বৈবাহিক অবস্থা, জন্মতারিখ, রক্তের গ্রুপ, জন্ম নিবন্ধন সনদ, লিঙ্গ, জন্মস্থান, শিক্ষাগত যোগ্যতা, দৃশ্যমান শনাক্তকরণ চিহ্ন ও ধর্ম। এ ছাড়া ড্রাইভিং লাইসেন্স, পাসপোর্ট নাম্বার, আয়কর সনদ নাম্বার, টেলিফোন ও মোবাইল নাম্বার, মা-বাবার জাতীয় পরিচয়পত্র নাম্বার, স্বামী বা স্ত্রীর নাম ও পরিচয়পত্র নাম্বার থাকলে এবং মা-বাবা, স্বামী বা স্ত্রী মৃত হলে সে-সংক্রান্ত তথ্য, অসামর্থ্য বা প্রতিবন্ধী হলে সেই তথ্যও উল্লেখ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এসব তথ্যই স্মার্টকার্ডে থাকবে।
কাগজের তৈরি লেমিনেটেড জাতীয় পরিচয়পত্রের ওপরে ছয়টি তথ্য লেখা থাকে। এটি সবাই দেখতে পারে। কিন্তু স্মার্টকার্ডে আটটি তথ্য থাকবে। এখানে জন্মস্থান ও কার্ড প্রদানের সময়টি লেখা থাকবে।
জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন আইন-২০১০-এ বলা আছে, জাতীয় পরিচয়ের জন্য একজন নাগরিকের বায়োমেট্রিকস ফিচার, যেমন: আঙুলের ছাপ, হাতের ছাপ, তালুর ছাপ, আইরিশ বা চোখের মণির ছবি, মুখম-লের ছবি, ডিএনএ, স্বাক্ষর এবং কণ্ঠস্বর সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করতে হবে। এই স্মার্টকার্ডে আইনে উলি্লখিত দুটি তথ্য (আঙুলের ছাপ ও চোখের মণির ছবি) থাকছে। তাই নতুন করে আঙুলের ছাপ, চোখের মণির ছবি নেয়া হলেও নিবন্ধন আইন পুরোপুরি বাস্তবায়নের এখনো অনেক তথ্য সংগ্রহই বাকি থেকে যাচ্ছে।
স্মার্ট পরিচয়পত্র দিতে ব্যয় হবে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা। এর বাইরে কার্ড বিতরণের জন্য আরও ৮৩ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। অর্থাৎ প্রায় ৯০০ কোটি টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্পে অতিরিক্ত কী সুবিধা থাকছে, যা আগের পরিচয়পত্র থেকে পাওয়া যাচ্ছিল না_জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনের জাতীয় পরিচয়পত্র অনুবিভাগের একজন বিশেষজ্ঞ কর্মকর্তা বলেন, এই কার্ডের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এটি নকল করা যাবে না। কেউ করলে সহজেই ধরা পড়ে যাবেন। দ্বিতীয়ত, আগের কার্ডে কেবল তর্জনী ও বৃদ্ধাঙ্গুলের ছাপ ছিল। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, এ দুটি আঙুলের সঙ্গে পরে আর ছাপ মিলছে না। কিন্তু এখন ১০ আঙুলের ছাপ থাকায় একটা না একটা মিলবেই। চোখের মণির ছবি নেয়াও ব্যক্তির পরিচয় সঠিকভাবে দেবে। তৃতীয়ত, চিপ থেকে ব্যক্তি নিজের তথ্য দেখতে পারবেন। তবে তার তথ্য অন্যরা কোনোভাবেই জানতে পারবেন না।

প্রধানমন্ত্রীর উদ্বোধন
রোববার রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে স্মার্টকার্ড বিতরণ কার্যক্রমের উদ্বোধন করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমাদের জাতীয় জীবনে আজ এক নতুন অধ্যয়ের সূচনা হতে যাচ্ছে।’
সকালে অনুষ্ঠানস্থলে উপস্থিত হয়েই প্রধানমন্ত্রী চোখের মণির প্রতিচ্ছবি এবং ১০ আঙুলের ছাপ দেন। পরে পুরনো ভোটার আইডি কার্ডটি ফেরত দেন তিনি।
রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের স্মার্টকার্ডটি প্রধানমন্ত্রী উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিবউদ্দীন আহমদের কাছে হস্তান্তর করেন। এরপর প্রধান নির্বাচন কমিশনার প্রধানমন্ত্রীর হাতে তার স্মার্টকার্ডটি তুলে দেন। কাজী রকিব পরে বঙ্গভবনে গিয়ে রাষ্ট্রপতির স্মার্টকার্ডটিও হস্তান্তর করবেন।
পরে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের সদস্য মাশরাফি বিন মর্তুর্জা, মুশফিকুর রহিম, সাকিব আল হাসান, তামিম ইকবাল, মাহমুদ উল্লাহ রিয়াদ, মুস্তাফিজুর রহমান, সাবি্বর রহমান, তাসকিন আহমেদ, সৌম্য সরকার, নাসির হোসেন, ইমরুল কায়েস ও তাইজুল ইসলাম এ অনুষ্ঠানেই প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে তাদের স্মার্টকার্ড বুঝে নেন। পুরনো ভোটার আইডি তারা প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে ফিরিয়ে দেন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জাতীয় পরিচয়পত্র যাতে কেবল ভোটারের জন্য নয়, বহুবিধ ব্যবহার যেন হয়, সে সুযোগ সৃষ্টির জন্য আমরা উদ্যোগ নিয়েছি। নাগরিক হিসাবে সঠিক সেবাটা ঠিকমতো নেয়ার জন্য এই পরিচয়পত্র।’
স্মার্টকার্ডের মাধ্যমে জঙ্গি, সন্ত্রাসী ও অপরাধীকে দ্রুত শনাক্ত করা এবং গ্রেপ্তার করা সহজ হবে বলেও মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, ‘আমি অনুরোধ করব নির্বাচন কমিশনকে যে ডাটাগুলো নেয়া হচ্ছে তার নিরাপত্তা যেন নিশ্চিত করা হয়। প্রত্যেকটা তথ্যের নিরাপত্তার জন?্য ফায়ারওয়ালসহ যে প্রযুক্তি প্রয়োজন_সেটা থাকতে হবে। যাতে কেউ কোনোভাবে এই তথ্যের অপব্যবহার করতে না পারে।’
শেখ হাসিনা বলেন, বর্তমানে যারা ভোট দিতে পারে অর্থাৎ ১৮ বা তার চেয়ে বেশি বয়সী, তাদেরই পরিচয়পত্র দেয়া হচ্ছে। তবে যাদের বয়স ১৮ বছরের কম, যারা ভোটার হওয়ার যোগ্য হয়নি, তাদেরও জাতীয় পরিচয়পত্র দেয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে এবং বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের খেলোয়াড়দের সঙ্গে ছবি তোলেন প্রধানমন্ত্রী।
যেভাবে বিতরণ: প্রথম পর্যায়ে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন ও কুড়িগ্রাম; দ্বিতীয় পর্যায়ে খুলনা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, বরিশাল, সিলেট, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, রংপুর ও গাজীপুর সিটি করপোরেশন; তৃতীয় পর্যায়ে ৬৪টি সদর উপজেলা এবং চতুর্থ পর্যায়ে বাকি সব উপজেলায় দেশজুড়ে স্মার্টকার্ড বিতরণ করা হবে।
প্রথমে ঢাকার উত্তরার ১ নাম্বার ওয়ার্ডের ৬৩ হাজারেরও বেশি ভোটারের কাছে পরীক্ষামূলকভাবে স্মার্ডকার্ড বিতরণ শুরু হবে। ৩ অক্টোবর থেকে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত উত্তরা হাইস্কুল ও কলেজে বিতরণকাজ চলবে। আর ঢাকা দক্ষিণে রমনা থানার ১৯ আম্বার ওয়ার্ডের ভোটাররা সিদ্ধেশ্বরী গার্লস হাই স্কুল ও কলেজ, ২০ নাম্বার ওয়ার্ডের ভোটাররা সেগুন বাগিচা হাইস্কুল এবং ২১ নাম্বার ওয়ার্ডের ভোটাররা উদয়ন স্কুল কেন্দ্রে গিয়ে ৩ অক্টোবর থেকে ২৬ অক্টোবর পর্যন্ত স্মার্টকার্ড নিতে পারবেন।
যাদের লেমিনেটেড জাতীয় পরিচয় নেই তারা নির্ধারিত সস্নিপ দিয়ে এনআইডি নাম্বার জেনে বিতরণ কেন্দ্রে গেলেই স্মার্টকার্ড দেয়া হবে। নির্ধারিত সময়ে গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে এবং মাইকিং, ব্যানার, ফেস্টুন দিয়ে প্রচারের মাধ?্যমে বিতরণের দিন তারিখ ও স্থান জানিয়ে দেবে নির্বাচন কমিশন।
ব?্যবহার: আয়কর দাতা শনাক্তকরণ নাম্বার (টিআইএন) প্রাপ্তি, ড্রাইভিং লাইসেন্স নাম্বার প্রাপ্তি ও নবায়ন, পাসপোর্ট প্রাপ্তি ও নবায়ন, চাকরির জন্য আবেদন, স্থাবর সম্পত্তি কেনাবেচা, ব্যাংক হিসাব খোলা ও ঋণ প্রাপ্তি, সরকারি বিভিন্ন ভাতা উত্তোলন, সরকারি ভর্তুকি, সাহায্য, সহায়তা প্রাপ্তি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি, বিমানবন্দরে ই-গেটের মাধ্যমে আগমন ও বহির্গমন সুবিধা, শেয়ার আবেদন ও বিও অ?্যাকাউন্ট খোলা, ট্রেড লাইসেন্স প্রাপ্তি, যানবাহন রেজিস্ট্রেশন, বিয়ে ও তালাক রেজিস্ট্রেশন, গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি সংযোগ গ্রহণ, মোবাইল ও টেলিফোন সংযোগ গ্রহণ, বিভিন্ন ধরনের ই-টিকিটিং, সিকিউরড ওয়েব লগ ইন, ই-ফরম পূরণে নাগরিকের সঠিক ও নির্ভুল তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংযোজনের কাজে ১০ ডিজিটের এই স্মার্টকার্ড ব্যবহার করা যাবে।
ডায়াল ১০৫: জাতীয় পরিচয়পত্রসংক্রান্ত যেকোনো তথ্য জানাতে একটি হেল্প ডেস্ক খুলেছে এআইডি উইং। যেকোনো ফোন থেকে ১০৫ নাম্বারে কল করে নাগরিকদের তথ্য জানাবে জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন বিভাগের কর্মকর্তারা।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্যে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সচিব মো. সিরাজুল ইসলাম জানান, ইতোমধ্যে ঢাকার দুটি থানার জন্য ৫৫ জন অপারেটর নিয়োগ দেয়া হয়েছে। উত্তরায় ৩০ জন এবং রমনার জন্য ২৫ জন অপারেটর স্মার্টকার্ড বিতরণে কাজ করবেন।
সোমবার রাজধানীতে পাইলট কার্যক্রম শুরুর পাশাপাশি কড়িগ্রামেও বিতরণ শুরু হবে। বিলুপ্ত ছিটমহল দাশিয়ারছড়ায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার বিতরণ কাজের উদ্বোধন করবেন।
এনআইডি উইংয়ের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুজ্জামান মো. সালেহ উদ্দীন জানান, এই স্মার্টকার্ড ভবিষ্যতে ট্র্যাভেল ডকুমেন্ট হিসেবেও ব্যবহার করা যাবে।
স্মার্টকার্ডের কারিগরি দিক এবং এর ব?্যবহার নিয়ে দুটি ভিডিওচিত্র দেখানো হয় অনুষ্ঠানে।
অন?্যদের মধে?্য বাংলাদেশে বিশ্ব ব্যাংকের আবাসিক প্রতিনিধি চিমিয়াও ফান এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ অনুষ্ঠানে বক্তব?্য দেন।