হ্যাচারি বিপ্লব

মাছের পোনা উৎপাদনে বিপ্লব ঘটেছে। গত বছর উৎপাদন হয়েছে মোট ১ হাজার ১৪৭ কোটি মাছের পোনা। ২০০১ সালে উৎপাদনের এ হার ছিল ৫০৮ দশমিক ২১ কোটি। এদিকে রেণু উৎপাদিত হয়েছে ৫৬৯ দশমিক ৯৬ টন। ২০০১ সালে যার পরিমাণ ছিল ২১৮ দশমিক ৩৪ টন। পোনা ও রেণুর বর্তমান উৎপাদন এ যাবৎকালের মধ্যে সর্বোচ্চ। সেইসঙ্গে বাড়ছে হ্যাচারি বা খামারের সংখ্যাও। বাড়ছে কর্মসংস্থানও। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগের ফলে এ সাফল্য এসেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। মৎস্য অধিদফতরের ১৫ বছরের তথ্য পর্যালোচনা করে পাওয়া গেছে এসব তথ্য।

এ প্রসঙ্গে মৎস্য অধিদফতরের মহাপরিচালক ড. সৈয়দ আরিফ আজাদ যুগান্তরকে বলেন, ১৯৭৬-৭৭ সালে দাতা সংস্থাগুলোর সহায়তায় সারা দেশে সব জেলায় প্রথম খামার প্রতিষ্ঠা করা হয়। ওই সময় সিলভার কাপ, বিগ্রেড কাপসহ অন্যান্য মাছের চাষ শুরু হয়। প্রথম দিকে ফ্রি বিভিন্ন মাছের রেণু দেয়া হতো খামারিদের। সেসময়ই সরকারি হ্যাচারি প্রতিষ্ঠা করা হয় এবং নেটওয়ার্ক ডেভেলপ করা হয়। ফলে বিশাল বেসরকারি খাত গড়ে ওঠে। পোনা ও রেণু উৎপাদন বাড়ায় এখন মানের দিকে নজর দেয়া হয়েছে। গুণগত মানসম্পন্ন পোনা উৎপাদনই বর্তমানে বড় চ্যালেঞ্জ। এজন্য ২০১০ সালে মৎস্য হ্যাচারি আইন করা হয়। দক্ষিণ এশিয়ার কোনো দেশে এ আইন নেই। কিন্তু আমরা করেছি মান রক্ষায়। এখন এ আইন বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

সূত্র জানায়, মাছ উৎপাদন বৃদ্ধির প্রধান শর্তই হচ্ছে গুণগত মানসম্পন্ন পোনার সহজলভ্যতা। পরিবেশ ও মনুষ্যসৃষ্ট বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা যেমন অপরিকল্পিত বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধ, শস্য ক্ষেতে কীটনাশকের অপরিমিত ও অবাধ ব্যবহার, পানিদূষণ ইত্যাদি নানা কারণে প্রাকৃতিক উৎসে রেণু ও পোনা উৎপাদন এবং আহরণ ক্রমে কমে যাচ্ছে। এ অবস্থায় হ্যাচারিগুলোতে রেণু উৎপাদনে আন্তঃপ্রজনন সমস্যা নিরসনে ৩২টি সরকারি খামারে অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং প্রাকৃতিক উৎস থেকে পোনা সংগ্রহের পর তা যথাযথভাবে পালন করে গুণগত মানসম্পন্ন ব্র“ড মাছ উৎপাদন করছে। এতে পোনার গুণগতমান নিশ্চিত হচ্ছে। মৎস্য অধিদফতর বলছে, সরকারের মৎস্যবান্ধব কার্যক্রম গ্রহণ, সুচিন্তিত নীতি ও পরিকল্পনা প্রণয়ন, কাক্সিক্ষত প্রণোদনা এবং সেবা কার্যক্রম সম্প্রসারণসহ চাষীদের নিরন্তর পরিশ্রমের ফলে মৎস্য খাতে এ সাফল্য এসেছে।

মৎস্য অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে গত বছর মোট হ্যাচারির সংখ্যা ছিল ৯৯৩টি। এর মধ্যে সরকারি ১৩৬ এবং বেসরকারি ৮৫৭টি। আর পোনা উৎপাদন হয় ১১৪৭ কোটি এবং রেণু উৎপাদন হয় ৫৬৯ দশমিক ৯৬ টন। ২০১৪ সালে মোট হ্যাচারি ছিল ১০২৯টি। এসময় পোনা উৎপাদন ১০৩২ কোটি আর রেণু উৎপাদন হয়েছিল প্রায় ৫০৩ টন। ২০১৩ সালে মোট হ্যাচারি ছিল ১০২১টি। এসব হ্যাচারিতে পোনা উৎপাদন হয় প্রায় ৯০২ কোটি, রেণু উৎপাদন হয় প্রায় ৪৬০ টন। ২০১২ সালে হ্যাচারি ছিল ১০২৭টি, পোনা উৎপাদন হয় প্রায় ৮২৫ কোটি এবং রেণু উৎপাদন হয় প্রায় ৬৩৬ টন। ২০১১ সালে ৯৭০টি হ্যাচারিতে পোনা প্রায় ৮২১ কোটি এবং রেণু উৎপাদন হয় প্রায় ৬২৫ টন। ২০১০ সালে ৯৮২টি হ্যাচারিতে পোনা উৎপাদন হয় প্রায় ৯৮৬ কোটি এবং রেণু প্রায় ৪৬৬ টন। ২০০৯ সালে ৯৯৫টি হ্যাচারিতে পোনা উৎপাদন হয় প্রায় ৯৬২ কোটি এবং রেণু প্রায় ৪৬৩ টন। ২০০৮ সালে ৯৮৬টি হ্যাচারিতে পোনা উৎপাদন হয় প্রায় ৫৫২ কোটি এবং রেণু ৪২৫ টন। ২০০৭ সালে ৯৭৩টি হ্যাচারিতে পোনা উৎপাদন হয় ৬২৫ কোটি এবং রেণু ৪৬৪ টন। ২০০৬ সালে ৮৭৪টি হ্যাচারিতে পোনা উৎপাদন হয় প্রায় ৪৩০ কোটি এবং রেণু প্রায় ৪১৩ টন। ২০০৫ সালে ৮৪৩টি হ্যাচারিতে পোনা উৎপাদন হয় প্রায় ৪৬৪ কোটি এবং রেণু প্রায় ৩২২ টন। দায়িত্বশীলরা বলছেন, সরসারি কর্মসংস্থান হয়েছে প্রতিটি হ্যাচারিতে ২০ থেকে ২৫ জন করে প্রায় ২৫ হাজার মানুষের। সেইসঙ্গে পোনা সরবরাহ, ফড়িয়া, পাইকার, ট্রাকচালক, ভ্যানচালক, পলিথিন সরবরাহকারী, অক্সিজেন সরবরাহকারীসহ ব্যাক লিংকেজ শিল্পে পরোক্ষভাবে জড়িত রয়েছে আরও প্রায় লক্ষাধিক মানুষ।

সূত্র জানায়, মানসম্মত রেণু ও পোনার উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়ায় বাড়ছে সার্বিক মাছের উৎপাদন। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে দেশে মোট মাছের উৎপাদন হয়েছে ৩৬ দশমিক ৮৪ লাখ টন।