মাছে সুদিনের অপেক্ষা

জল আছে যেখানে, মাছ আছে সেখানে।’ মাছে-ভাতে বাঙালির- সেই চিরাচরিত সময়ে এমন তথ্যই প্রচলিত ছিল। এখন সময় পাল্টেছে। পরিবেশ-প্রকৃতি এবং জলাশয়ের আকৃতিতে পরিবর্তন এসেছে। ফলে বদলেছে স্লোগানও। নতুন করে বলা হচ্ছে ‘জল আছে যেখানে, মাছ চাষ সেখানে।’ অর্থাৎ সময়ের পরিবর্তনে মাছে-ভাতে বাঙালির স্বীকৃতি দিতে প্রকৃতি যে কার্পণ্যতা দেখাচ্ছে, তা পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছে সেই মানুষই। তবে প্রেক্ষাপট বদল হওয়ায় মাছ পেতে এখন শ্রম দিতে হচ্ছে। অশিক্ষিত জেলেদের প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে, খাটানো হচ্ছে পুঁজি। মাছ চাষে ব্যবহার হচ্ছে উন্নত প্রযুক্তি। উদ্ভাবিত হচ্ছে মাছের নতুন নতুন জাত। সারা দেশে মুক্ত এবং বদ্ধ সব জলাশয়েই এখন বাণিজ্যিক ভিত্তিতে হচ্ছে মাছের চাষ। এভাবে আধুনিক মাছ চাষ নির্ভরতা সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। যার ওপর ভর করে ইতিমধ্যে বাংলাদেশ মাছ উৎপাদনে বিশ্বে চতুর্থ অবস্থানে পৌঁছে গেছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ অর্থনৈতিক শুমারির তথ্য বলছে, ১৯৯০ সালে দেশে মোট চাষকৃত মাছ উৎপাদন হয়েছিল ১ লাখ ৯৩ হাজার টন। ২০০০ সালে তা বেড়ে ৬ লাখ ৫৭ হাজার টন এবং ২০১৪ সালে ২০ লাখ টনে দাঁড়িয়েছে। এরপরও জনগোষ্ঠীর বিশাল চাহিদা পূরণে এখনও সেই স্বয়ংসম্পূর্ণ অবস্থানটি ধরতে পারেনি বাংলাদেশ। কারণ মানুষের ভোগপ্রবণতা, সার্বিক চাহিদা এবং উৎপাদন সব মিলিয়ে এখনও কিছুটা ঘাটতির মুখেই থাকতে হচ্ছে। অথচ বিস্তীর্ণ সাগর, পদ্মা, মেঘনা, যমুনাসহ অসংখ্য নদ-নদী, হাওর-বাঁওড়, খাল-বিল, পুকুর-দীঘি নিয়ে বৈচিত্র্যময় জলাশয়ে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ। কিন্তু বিশাল এ জলজ সম্পদের সর্বোত্তম ও কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। এ কারণে জলজ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও মৎস্য খাতে জাতীয় অগ্রগতিও হুমকির মুখে পড়েছে।

বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, দেশের জনসংখ্যার ক্রমাগত বৃদ্ধির ফলে অতি আহরণ, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব, অপরিকল্পিত নগরায়ন ও শিল্পায়ন, মনুষ্যসৃষ্ট নানাবিধ কারণে মাছ চাষের উপযোগী জলাশয়ের পরিমাণ সংকুচিত হয়ে আসছে। কৃষিতে ক্ষতিকর কীটনাশকের যথেচ্ছ অপব্যবহার হচ্ছে। কারখানার দূষিত বর্জ্য প্রাকৃতিক ও মুক্ত জলাশয়কে ক্রমাগত দূষিত করছে। বিস্তীর্ণ জলাশয় থাকা সত্ত্বেও মূলত এসব কারণেই দেশ মাছে-ভাতে বাঙালির সেই চিরাচরিত পরিচিতি থেকে ঘাটতির দেশে পরিণত হয়েছে। ফলে দেশের চাহিদা পূরণে প্রতি বছর শত শত কোটি টাকা ব্যয় করে হাজার হাজার টন মাছ আমদানি করতে হচ্ছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ ছায়েদুল হক এ প্রসঙ্গে যুগান্তরকে বলেন, খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন, গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকা ও প্রাণিজ আমিষের চাহিদা পূরণের স্বার্থেই আমাদের মাছে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের প্রয়োজন রয়েছে। সে সুযোগও আমাদের সামনে রয়েছে। কারণ আমাদের আছে অভ্যন্তরীণ বিশাল মৎস্যভাণ্ডার। বঙ্গোপসাগরে মৎস্য আহরণ ও ব্লু ইকোনমিতে যে অর্জন এসেছে সেটিও বিশ্বে একটি বিরল ঘটনা। এখন সময় এসেছে এ সম্পদের সর্বোচ্চ ও সহনশীল ব্যবহারের। সরকার এখন সে কাজটিই করছে। তিনি বলেন, ইতিমধ্যে সমুদ্রসীমায় গবেষণা ও জরিপ কাজ পরিচালনার মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের মাছের মজুদ নির্ণয় এবং মাছ আহরণের সম্ভাব্য ক্ষেত্র নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে একটি অত্যাধুনিক জরিপ ও গবেষণা জাহাজ আনা হয়েছে। এ জরিপ কাজের মাধ্যমে মৎস্য খাতের সার্বিক উন্নয়নে একটি পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা গ্রহণ করা সম্ভব হবে। মৎস্য অধিদফতরের তথ্যানুযায়ী, দেশে দৈনিক মাথাপিছু মাছ গ্রহণের চাহিদা রয়েছে ৬০ গ্রাম। সেখানে পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে মাত্র ৫৫ গ্রাম। জনপ্রতি বাৎসরিক মাছ গ্রহণের হার প্রায় ২০ কেজি। বাস্তবে বেশিরভাগ মানুষই ১২ কেজির কম মাছ গ্রহণ করছে। অপরদিকে সার্বিকভাবে দেশে মাছের চাহিদা রয়েছে ৪০ লাখ টনের। সেখানে উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে মাত্র প্রায় ৩৭ লাখ টন। অর্থাৎ এখনও তিন লাখ টন মাছের ঘাটতি মোকাবেলা করছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) সংগৃহীত তথ্য-উপাত্ত ও গবেষণায় দাবি করা হয়েছে, দেশে বিপন্ন প্রজাতির মাছের সংখ্যা শতাধিক। মৎস্য অধিদফতর থেকেও সম্প্রতি এমন তথ্য দিয়ে বলা হয়, দেশে এখন ৫৪ প্রজাতির মাছ ঝুঁকিপূর্ণ, ২৮ প্রজাতির মাছ বিপন্ন ও ১২ প্রজাতির মাছ মহাবিপন্ন অবস্থায় রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মৎস্য অধিদফতরের মহাপরিচালক সৈয়দ আরিফ আজাদ যুগান্তরকে বলেন, আমরা মাছে-ভাতে বাঙালির সেই হারানো ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারের সব ধরনের চেষ্টায় আছি। যদিও সার্বিক চাহিদা পূরণে কিছু ঘাটতি আমাদের রয়েছে। তা সত্ত্বেও অভাবনীয় প্রবৃদ্ধিও হচ্ছে। গত তিন বছরে মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে গড়ে ৮ দশমিক ০৪ শতাংশ হারে। এদিকে এশিয়ার একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র বলে পরিচিত শুধু চট্টগ্রামের হালদা নদী থেকে গত কয়েক বছরে হারিয়ে গেছে অনেক প্রজাতির মাছ। ৭-৮ বছর আগেও হালদাতে ৮০ প্রজাতির মাছ ছিল। কিন্তু এখন সেসব মাছের হদিস পাওয়া যাচ্ছে না। গবেষণায় দেখা গেছে, শীতল, ফলি, চিতল, রিতা, মধু পাবদা, ভেঁটকি, কোকসা, গজার, গারুয়া ও বাতাসী প্রজাতির মাছগুলো এখন আর হালদায় চোখে পড়ে না। অন্যদিকে জীববৈচিত্র্য নষ্ট হয়ে যাওয়ায় হালদা নদী থেকে মা-মাছের ডিম থেকে পোনা উৎপাদনের পরিমাণও আশঙ্কাজনক হারে কমে এসেছে।