সোনালি আঁশ পাট :বাংলাদেশের প্রাণ

পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের স্বৈরশাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে বাঙালি জাতীয়তাবাদী নেতারা স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধিকারের কথা বলতে গিয়ে অব্যাহতভাবে পাটের প্রসঙ্গ তুলেছেন। পাকিস্তানের রফতানি পণ্যের মধ্যে প্রধান ছিল পাট এবং পাট উৎপন্ন হতো শুধু পূর্ববাংলায়; পশ্চিম পাকিস্তানে নয়। কিন্তু পাট রফতানি থেকে যা আয় হতো তার ১২ আনা ব্যয় করা হতো পশ্চিম পাকিস্তানের উন্নয়নের জন্য, পূর্ব পাকিস্তান পেত চার আনা মাত্র। শুধু তাই নয়, বাংলার পাটচাষিরা ছিলেন সবচেয়ে অবহেলার শিকার। তাই ১৯৫৪ সালের ঐতিহাসিক নির্বাচনের আগে যুক্তফ্রন্ট যে ২১ দফা অঙ্গীকার করে তার তৃতীয় দফাতেই বলা হয়েছিল :

‘পাট ব্যবসায়কে জাতীয়করণ করার উদ্দেশ্যে তাকে পূর্ববঙ্গ সরকারের প্রত্যক্ষ পরিচালনাধীনে আনয়ন করিয়া পাটচাষিদের পাটের ন্যায্যমূল্য দেওয়ার ব্যবস্থা করা হইবে এবং লীগ মন্ত্রিসভার আমলের পাট কেলেঙ্কারি তদন্ত করিয়া সংশ্লিষ্ট সকলের শাস্তির ব্যবস্থা ও তাহাদের অসদুপায়ে অর্জিত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হইবে।’

বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে হক-ভাসানী-সোহরাওয়ার্দীর যুক্তফ্রন্ট শেরেবাংলা ফজলুল হকের নেতৃত্বে পূর্ব পাকিস্তানে সরকার গঠনের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পৃথিবীর বৃহত্তম পাটকল আদমজী জুট মিলে বাঙালি এবং উর্দুভাষী শ্রমিকদের মধ্যে দাঙ্গা বাধানো হয়। কেন্দ্রীয় সরকারের প্রত্যক্ষ প্ররোচণায় সেই দাঙ্গা হয় এবং তাতে কয়েকশ’ শ্রমিক নিহত হন। নবগঠিত সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনলেও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় যুক্তফ্রন্ট সরকার ব্যর্থ- কেন্দ্রীয় সরকার এ অজুহাতে নতুন সরকারকে বরখাস্ত করে। প্রদেশে গভর্নরের শাসন জারি করা হয়। পাট ও পাটশিল্প নিয়ে শাসকশ্রেণির আত্মঘাতী ষড়যন্ত্রের শুরু। সেটা পূর্ববাংলার জাতীয়তাবাদী নেতাদের কাছে অজ্ঞাত ছিল না। সে জন্যই স্বাধিকার আন্দোলনে পাট বিরাট ভূমিকা পালন করে।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ ও পাটশিল্প আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের শিকার হয়। সব ভারী শিল্পের মতো পাটশিল্পও জাতীয়করণ করা হয়। সরকার যাদের পাটকলগুলোতে প্রশাসক নিযুক্ত করে তাদের বড় বড় মিল-কারখানা চালানোর অভিজ্ঞতা ছিল না। প্রশাসনিক দুর্বলতার সঙ্গে যোগ হয় দুর্নীতি। ফলে পাটচাষিরা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হতে থাকেন এবং পাটকলগুলো লোকসান দিতে থাকে। যে পাট ও পাটকল ছিল বাঙালির গর্ব তা ধীরে ধীরে বিপর্যয়ের দিকে যেতে থাকে। পাট ও পাটজাত দ্রব্য থেকে আমাদের রফতানি আয় কমে যায়।

মুক্তিযুদ্ধের অব্যবহিত আগে পাট রফতানি হতো সাড়ে ৫ লাখ টনের মতো। বর্তমানে আড়াই লাখ টন। যেখানে বাড়ানোর প্রয়োজন ছিল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের লক্ষ্যে, সেখানে অর্ধেক কমেছে। তবে কাঁচা পাট রফতানি কমলেও পাটজাত পণ্য রফতানি বেড়েছে। যেমন ১৯৭০ সালে পাটের সুতা রফতানি হতো ১৫ হাজার টন, বর্তমানে হচ্ছে ৬ লাখ টন। দেশের ভেতরেও পাটজাত পণ্যের বিপুল চাহিদা রয়েছে।

পাট, পাটচাষি ও পাটশিল্প নিয়ে আমার ব্যক্তিগত আগ্রহ রয়েছে। পরিবেশের স্বার্থেও পাটের ব্যবহার বাড়ানোর প্রয়োজন বোধ করি। বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশনের যখন চেয়ারম্যান ছিলেন মেজর জেনারেল (অব.) হুমায়ুন খালেদ তখন তার সঙ্গে আমার পাটপণ্য উৎপাদন, পাটপণ্যের বৈচিত্র্যকরণ এবং তা রফতানি কীভাবে বাড়ানো যায় তা নিয়ে প্রায়ই কথাবার্তা হতো। আমি বিজেএমসি অফিসে গিয়েও দেখেছি বিচিত্র পাটপণ্যের নমুনা। খুবই আশাব্যঞ্জক ব্যাপার। যা দরকার তা হলো পাটপণ্যের মান বাড়ানো এবং বৈচিত্র্যকরণের ওপর জোর দেওয়া। সে সক্ষমতাও আমাদের রয়েছে। খুব বেশি যা দরকার তা হলো সুষ্ঠু দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।

স্বাধীনতার পর থেকে দীর্ঘদিন নানা রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অস্থিতিশীলতার কারণে পাটচাষিদের স্বার্থে এবং পাটশিল্পের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বা জাতীয় পাটনীতি গ্রহণ করা হয়নি। এক সরকার পাটশিল্পকে করেছে রাষ্ট্রায়ত্ত, আরেক সরকার ছেড়ে দিয়েছে তা বেসরকারি মালিকানায়। কোনো সরকার পাটকলগুলো লিজ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের পরামর্শে দেশের বৃহত্তম ঐতিহ্যবাহী পাটকল আদমজী বন্ধ করে দিয়েছে। দেশের ক্ষুদ্র বাম দলগুলো ছাড়া বড় বিরোধী দলও আদমজী বন্ধের প্রতিবাদে কোনো আন্দোলন করেনি। পদ্মা সেতুতে অর্থায়ন প্রশ্নে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে সরকারের মনোমালিন্যের আগে সব বড় দলই ক্ষমতাসীন ও ক্ষমতার বাইরের- বিশ্বব্যাংকের কোনো জনবিরোধী পরামর্শের, বলতে গেলে নানা রকম অনৈতিক চাপের বিরোধিতা করেনি। ২০০২ সালে বিএনপি-জামায়াত সরকার আদমজী পাটকল বন্ধ ঘোষণা করে। হাজার হাজার শ্রমিক বেকার হয়ে যান। মৌখিক বক্তৃতা-বিবৃতি দেওয়া ছাড়া কোনো শক্ত প্রতিবাদ হলো না। বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশে পাটকল বন্ধ করার জন্য অর্থ সহায়তা দিয়েছে। সে বিশ্বব্যাংকই ভারতে নয়টি পাটকলের উন্নয়নে অর্থ সহায়তা দিয়েছে। আদমজী বন্ধ হওয়ার পর কত শ্রমিক অনাহারে মারা গেছেন কেউ তার হিসাব রাখেন না।

আদমজী বন্ধ হলেও গত ১০ বছরে দেশে ২৫-৩০টি ছোট পাটকল স্থাপিত হয়েছে। তাতে কয়েক হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয়েছে। তবে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অনেক পাটকলে বেতন-ভাতার অনিয়ম এবং অন্যান্য কারণে শ্রমিকদের বিক্ষোভের খবরও পাওয়া গেছে। অধিকাংশ পাটকল শ্রমিকের দুর্দশার অন্ত নেই।

সরকার যখন কোনো জনবিরোধী সিদ্ধান্ত নেয়, কম-বেশি তার প্রতিবাদ হয়; কিন্তু সরকারের ভালো সিদ্ধান্তের বিরোধিতা শুধু বাংলাদেশেই হতে পারে। কিছুদিন আগে সরকার যখন ভারতে পাট রফতানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে তখন এক শ্রেণির পাট ব্যবসায়ী তার বিরোধিতা করে। পাটশিল্প রক্ষার স্বার্থে, জাতীয় অর্থনীতির স্বার্থে সরকারের এ সিদ্ধান্তকে সবার স্বাগত জানানো উচিত ছিল।

সবচেয়ে বেশি সমস্যা পাটচাষিদের। তাদের দুঃখের শেষ নেই। কিন্তু পাট ব্যবসার সঙ্গে যারা যুক্ত তাদেরও সমস্যা রয়েছে। বাংলাদেশ জুট মিলস অ্যাসোসিয়েশনের এক সূত্র থেকে জানা যায়, পাট কেনার জন্য তাদের ব্যাংক থেকে চড়া সুদে ঋণ নিতে হয়। সুদের হার ২০ শতাংশের মতো। বাংলাদেশের কোনো কোনো শিল্পে কাঁচামাল আমদানির জন্য ২ শতাংশ হারেও ঋণ পাওয়া যায়। ওই ধরনের সুবিধা পাটশিল্পের সঙ্গে যারা জড়িত তাদেরও প্রাপ্য। সেটা তাদের স্বার্থে নয়, জাতির অর্থনীতির স্বার্থে। উৎপাদন বাড়ানোর জন্য কৃষককেও যেমন প্রণোদনা দিতে হবে তেমনি পাটশিল্প ও পাট ব্যবসার সঙ্গে যারা জড়িত তাদেরও প্রণোদনা না দিলে এ খাতের সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব নয়।

জনবহুল বাংলাদেশে গ্রামীণ গরিব নারীদের কর্মসংস্থান করতে পাটের ভূমিকা বিরাট। তারা যদি সহজ শর্তে ঋণ পান ব্যাংক ও অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে, তাহলে তারা পাটজাত পণ্য তৈরি করে স্বাধীনভাবেই জীবিকা নির্বাহ করতে পারবেন। বহুকাল ধরে বাংলাদেশের কুটির শিল্পের অন্যতম প্রধান কাঁচামাল বা উপাদান পাট। গ্রামের নারীদের প্রশিক্ষণ দিলে প্রথাগত কাজের বাইরে পাটের তৈরি পণ্যে আরও বৈচিত্র্য আনা সম্ভব এবং তাতে তারাও উপকৃত হবেন। অর্জিত হবে বৈদেশিক মুদ্রা। এ ক্ষেত্রে সরকারি, বেসরকারি কিছু উদ্যোগ বর্তমানে আছেও, কিন্তু আরও সুপরিকল্পিতভাবে করতে হবে।

আমরা যারা পরিবেশ নিয়ে কাজ করি, জোরালো দাবি জানিয়ে আসছি পলিথিন ব্যাগ উৎপাদন ও বিপণন নিষিদ্ধ করতে। সরকার ব্যবস্থা নিয়েছে, কিন্তু তা পালিত হচ্ছে না। আর তা নিয়ে বিভিন্ন বাজার এবং রাস্তাঘাটে প্রতিবাদ করেছি। কোনো কাজ হচ্ছে না। ভিন্ন নামে পলিথিনের মতো ক্ষতিকর রাসায়নিক দ্রব্য দিয়ে বাজারের থলে তৈরি এবং ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এতে পরিবেশের সর্বনাশ তো হচ্ছেই, পাটশিল্পের অপূরণীয় ক্ষতিও হচ্ছে। পলিথিনের কারণে আশির দশক থেকে পাটদ্রব্যের চাহিদা কমে আসে, এখন আবার বাড়ছে। পলিথিন পাটের বিকল্প হতে পারে না।

২০১৫ সালের শুরুর দিকেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সবাইকে পাটপণ্য ব্যবহারের আহ্বান জানান। পাটের ব্যাপারে তিনি বিশেষভাবে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। কিন্তু তার আগ্রহকে কাজে বাস্তবায়ন করতে পারছেন না সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তারা। শতাধিক প্রকারের পাটপণ্য বাংলাদেশে তৈরি হয়। তা যেমন দৃষ্টিনন্দন তেমনি পরিবেশবান্ধবও। কিছুদিন আগে বঙ্গবন্ধু কনভেনশন সেন্টারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পাটজাত পণ্যের প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন। আমিও সে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলাম। অপূর্ব সুন্দর আমাদের পাটের তৈরি সব জিনিস। আধুনিক রুচিশীল মানুষের ব্যবহারের উপযোগী। প্রধানমন্ত্রী দেখে খুবই প্রীত হলেন এবং এসব জিনিস দেশের মানুষ যাতে বেশি বেশি ব্যবহার করে এবং বিদেশেও রফতানি হয় সে ব্যাপারে তাগিদ দিলেন। আমরা দেখেছি, বিদেশে এ জাতীয় হাউসহোল্ড প্রডাক্ট, লাইফস্টাইল প্রভৃতির ব্যাপক চাহিদা। তবে পাটজাত দ্রব্যের ফ্যাশন ডিজাইনের জন্য উন্নত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র দরকার।

আধুনিক শিল্প-কারখানার উন্নতি ঘটানোও সময়ের দাবি। কিন্তু কৃষি ক্ষেত্রে আমাদের সম্ভাবনা অপার। সেই সম্ভাবনাকে আমরা হাতছাড়া করতে পারি না। ধান উৎপাদনে আমাদের কৃষক ও কৃষিবিজ্ঞানীরা যে সফলতা দেখিয়েছেন, পাটের ক্ষেত্রেও যদি সে রকম সফলতা দেখানো যায় তাহলে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশ হলো কি-না সেটা বড় ব্যাপার নয়; আমরা আমাদের মতো সুখী, সমৃদ্ধ ও উন্নত দেশ হতে পারব। আমরা পশ্চিম ইউরোপ বা জাপানের মতো শিল্পোন্নত দেশ হতে পারব না, কিন্তু কৃষি-উন্নত দেশ হতে পারব।

প্রত্যেক দেশের একটি চরিত্র বিধাতাই গঠন করে দেন। প্রত্যেক দেশের মাটি ও জলবায়ু বিধাতার সৃষ্টি। সব দেশের মাটির শক্তি সমান নয়। বাংলাদেশের মাটি ও জলবায়ু বিধাতার অপূর্ব দান। গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-তিস্তা বাহিত পলিমাটি অঞ্চল এবং উত্তরবঙ্গের বরেন্দ্রভূমি ও মধুপুর অঞ্চলে পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ পাট জন্মে। পাটের সবকিছুই ব্যবহৃত হয়। পাটগাছের মাটির নিচের অংশ পচে জৈব সার হয়। পাটকাঠি আধুনিক শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সোনালি আঁশ পাটের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থার ব্যাপক পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব। তবে সংশ্লিষ্ট সব বিভাগকে সমন্বয় করে কাজ করতে হবে। তবে সবচেয়ে আগে দরকার একটি যুগোপযোগী পাটনীতি ও আইন।