পায়রা বন্দর ঘিরে বিশাল কর্মযজ্ঞ

রামনাবাদ নদীর তীরে চালু হয়ে গেছে দেশের তৃতীয় আন্তর্জাতিক সমুদ্র বন্দর পায়রা। কৃষি আয় দিয়ে জীবন ধারণে অভ্যস্ত বাংলাদেশের মধ্য উপকূলের বাসিন্দারা ক’দিন আগেও সমুদ্র বন্দর আর শিল্পায়নের গল্প শুনতেন, স্বপ্ন দেখতেন সিঙ্গাপুরের মতো নগর জীবনের। এখন সাগরকূলের গ্রাম পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার লালুয়া আর টিয়াখালীতে চলছে সেই স্বপ্নের বাস্তবায়ন। যেখানে গত ১৩ আগস্ট চালু হয়েছে দেশের নতুন সমুদ্র বন্দর পায়রা, যার ১৬ একর জমি জুড়ে গড়ে তোলা হয়েছে বিভিন্ন অবকাঠামো।

প্রথম ধাপে নির্মিত হয়েছে জেটি, অত্যাধুনিক কন্টেইনার ইয়ার্ড, শুল্ক ষ্টেশন, নিরাপত্তা ভবন, খাবার পানির শোধনাগার, সৌর বিদ্যুত্ চালিত বাতি আর টানা হয়েছে পল্লী বিদ্যুতের তার। ইতোমধ্যে জেটি ও আন্ধারমানিকসহ আশেপাশে নদীতে নোঙ্গর করেছে ১২টি লাইটারেজ জাহাজ। রামনাবাদ চ্যানেলের বহির্নোঙ্গরে অপেক্ষায় রয়েছে পদ্মা সেতুর জন্য চীন থেকে ৫৩ হাজার টন পাথর নিয়ে বন্দরে প্রথম আগত মাদার ভেসেল ফরচুন।

২০২৩ সালের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ বন্দরের রূপ দিতে ১৬ বিলিয়ন ডলারের মহাপরিকল্পনায় তিন ধাপের উন্নয়ন কর্মসূচির তথ্য জানিয়ে পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ক্যাপ্টেন সাইদুর রহমান ইত্তেফাককে বলেন, ১১২৮ কোটি টাকার বরাদ্দ দিয়ে শুরু হচ্ছে দ্বিতীয় ধাপের বিভিন্ন প্রকল্প। যার মধ্যে রয়েছে জমি অধিগ্রহণ খাতে ৩৮০ কোটি টাকা, বন্দর থেকে মহাসড়কের সঙ্গে চার লেনের ৫.৬ কিলোমিটারের সংযোগ সড়ক নির্মাণ খাতে ২৫৪ কোটি টাকা, বন্দর থেকে বরিশাল পর্যন্ত কাজল ও তেঁতুলিয়া নদী ড্রেজিং খাতে ২৩৪ কোটি টাকার প্রকল্প। কন্টেইনার টার্মিনালসহ আরও মাল্টিপারপাস প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে এ ধাপে। এখানে নির্মাণ করা হবে আধুনিক বাল্ক টার্মিনাল ও মাল্টিপারপাস টার্মিনালসহ পরিশোধনাগার। ফলে এটি পরিণত হবে সিঙ্গাপুরের মতো বন্দরে।

তিনি জানান, গত একমাসে একাধিক বাণিজ্যিক জাহাজ নোঙ্গর করেছে বহির্নোঙ্গরে। সেখান থেকে ১৫টি লাইটারেজ জাহাজের মাধ্যমে পদ্মাসেতু নির্মাণের জন্য বালু আর পাথর নেওয়ার কাজ চলছে। ইতোমধ্যে বন্দর ব্যবহারকারীদের জন্য ভিন্ন সুযোগ ও ছাড়ের ব্যবস্থা করেছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। ২০২৩ সালে বন্দর নির্মাণের কাজ সম্পন্ন হলে তিন বিলিয়ন থেকে চার বিলিয়ন টিইইউসি (টুয়েন্টি ইকুভ্যালেন্ট ইউনিট কনটেইনার) হ্যান্ডলিং করা সম্ভব হবে। যা কি না বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরে দেড় বিলিয়ন থেকে দুই বিলিয়ন।

পায়রা বন্দরের সয়েলটেস্ট সার্ভেয়ার ক্যাপ্টেন হাবিবুর রহমান জানান, বড় বড় জাহাজ নিরাপদে প্রবেশের জন্য বঙ্গোপসাগরের ফেয়ারওয়ে বয়া থেকে ৩৫ নটিক্যাল মাইল এলাকায় ৩৫ মিটার পর্যন্ত মাটির গভীরতা পরীক্ষা সম্পন্ন করা হয়েছে ক্যাপিটাল ড্রেজিং করার জন্য। ১৮ মিটার গভীর চ্যানেল তৈরির জন্য ইতোমধ্যে বেলজিয়ামের পাঁচ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল বন্দর সংলগ্ন এলাকায় মাটি পরীক্ষার কাজ সম্পন্ন করেছে।

বন্দরের সিকিউরিটি প্রধান লে. কমান্ডার জাহাঙ্গীর আলম জানান, বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা ও সার্বক্ষণিক যোগাযোগের জন্য আধুনিক পোর্ট রেডিও কন্ট্রোল ষ্টেশন নির্মাণ করা হচ্ছে। প্রাচীর নির্মাণসহ অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ চলছে। প্রাথমিকভাবে নিরাপত্তা কর্মীও নিয়োগ করা হয়েছে।

বর্তমানে মংলা ও চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দরে কর্মরত ব্যবসায়ীদের মধ্যে পায়রা বন্দরের সম্ভাবনা নিয়েও আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে। মংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের এডভাইজারি কমিটির সদস্য, ষ্টিভেটর ব্যবসায়ী এইচ এম দুলাল বলেন, দেশে তৃতীয় সমুদ্র বন্দর চালু হওয়ায় তার মতো বন্দর ব্যবসায়ীদের মধ্যে উত্সাহ দেখা দিয়েছে। মংলা ও চট্টগ্রাম বন্দরে কম গভীরতার জাহাজ ঢুকতে পারে না চ্যানেলের নাব্যতা সংকটের কারণে। সেখানে পায়রা বন্দরে প্রবেশের চ্যানেল অনেক গভীর হওয়ায় এই দুই বন্দর ব্যবহারকারী সামুদ্রিক জাহাজগুলো যে সমস্যায় পড়ে তা পায়রায় থাকবে না বলে জাহাজের আগমন-নির্গমন স্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাবে। বন্দরে জাহাজের পণ্য বোঝাই-খালাসের জন্য দক্ষ শ্রমিক-কর্মচারী নিয়োগ, ক্রেন স্থাপন, আধুনিক কন্টেইনার ইয়ার্ড, তদারকির জন্য ট্রাফিক বিভাগ, আগমন-নির্গমনের হারবার বিভাগ, পর্যাপ্ত লাইটারেজ জাহাজ, বিদেশি জাহাজে খাবার পানি সরবরাহ ব্যবস্থা, বন্দর সংলগ্ন এলাকায় ব্যাংকিং ও ব্যবসায়ীদের আবাসন তথা হোটেল-মোটেল ইত্যাদি সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে পায়রা বন্দর নিঃসন্দেহে নির্ধারিত মেয়াদে দেশের প্রধানতম সামুদ্রিক বন্দরে পরিণত হবে।

পটুয়াখালীর জেলা প্রশাসক এ, কে, এম শামিমুল হক ছিদ্দিকী ইত্তেফাককে বলেন, গত মাসে প্রধানমন্ত্রী দেশে তৃতীয় সমুদ্র বন্দর পায়রার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। বর্তমানে এই বন্দরকে ঘিরে চলছে সরকারের বিশাল কর্মযজ্ঞ। সমুদ্র বন্দর ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রকল্পের পাশাপাশি এখানে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, পায়রা বিদ্যুত্ কেন্দ্রসহ চারটি বিদ্যুত্ কেন্দ্র, তেল শোধনাগার, জাহাজ নির্মাণ ও মেরামত শিল্প, নৌ-ঘাটি, কোষ্টগার্ড ঘাঁটি, লিকুইড ন্যাচারাল গ্যাস টার্মিনাল ইত্যাদি সমন্বয়ে একটি এক্সক্লুসিভ জোন গড়ে তোলার কাজ হাতে নিয়েছে সরকার।