এবার কালাজ্বরমুক্ত হচ্ছে বাংলাদেশ

পোলিও’র পর এবার কালাজ্বর নির্মূলের সনদ পেতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। ২০১৭ সালের মধ্যেই এই সনদ পাওয়ার আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী জাহিদ মালিক বলেন, ২০১৪ সালে বাংলাদেশ পোলিওমুক্ত হয়েছে। ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে মা ও নবজাতকের ধনুষ্টংকার প্রতিরোধে সাফল্যের জন্য বাংলাদেশকে বিশেষ সম্মাননা দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডবিস্নউএইচও)। আগামী বছরের মধ্যে বাংলাদেশ কালাজ্বর মুক্ত হবে। বাংলাদেশ যদি এই রোগ থেকে মুক্ত হয়, আর ভারতে যদি রোগটি রয়ে যায়, তাহলে কোনো লাভ হবে না। কালাজ্বর নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি একটি আঞ্চলিক সমস্যা। আমরা কালাজ্বর নির্মূলে পার্শ্ববর্তী দেশের সঙ্গে একযোগে কাজ করছি। আশা করছি আমরা সফল হবো।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি)-এর এক গবেষণায়ও ২০১৭ সালের মধ্যে বাংলাদেশ কালাজ্বর মুক্ত হতে যাচ্ছে এমন আশাব্যঞ্জক তথ্য মিলিছে।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্যানুযায়ী, ২০১০ সালে তিন হাজার ৮০৬ জন কালাজ্বরে আক্রান্ত হলেও কেউ মারা যাননি। ২০১১ সালে তিন হাজার ৩৭৬ জন আক্রান্ত হন। তাদের মধ্যে দুজন মারা যান। ২০১২ সালে দুই হাজার ৬০ জন আক্রান্ত হলেও কারো মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি। ২০১৩ সালে এক হাজার ৪২৮ জন আক্রান্ত হন। তাদের মধ্যে দুজনের মৃত্যু হয়। ২০১৪ সালে আক্রান্ত হন এক হাজার ৬৮ জন, মারা যান তিন জন। ২০১৫ সালে ৮৭৩ জন আক্রান্ত হন, তাদের মধ্যে ৪ জন মারা যান।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, দেশের ৪২টি জেলায় কালাজ্বরের প্রকোপ ছিল। বিশেষ করে ময়মনসিংহ, পাবনা, টাঙ্গাইল, গাজীপুর, মানিকগঞ্জ ও জামালপুর অঞ্চলে এই রোগটি বেশি দেখা যায়। ২০০০ সালে সাত হাজার ৬৪০ জন কালাজ্বরে আক্রান্ত হন। তাদের মধ্যে ২৪ জন মারা যান। এ ঘটনার পর একই বছর কালাজ্বর নিয়ন্ত্রণে সরকার ব্যাপক কার্যক্রম হাতে নেয়ায় এর প্রকোপ কমতে শুরু করে। এরপর কালাজ্বর নিয়ন্ত্রণে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মাধ্যমে ২০০৫ সালে বাংলাদেশ, ভারত ও নেপালের মধ্যে ত্রিদেশীয় চুক্তি হয়। ২০১৪ সালে ভুটান ও থাইল্যান্ড এ চুক্তির সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়। এই ৫টি দেশের চুক্তি অনুযায়ী ২০১৭ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশকে কালাজ্বর মুক্ত করার কথা। সে অনুযায়ী চলছে কর্মসূচি।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল খায়ের মো. শামসুদ্দিন জানান, কালাজ্বল নির্মূলে বাংলাদেশের অগ্রগতি ভালো। এরই মধ্যে দেশের ৯৮টি উপজেলা কালাজ্বরমুক্ত হয়েছে। কালাজ্বর নিয়ন্ত্রণে পাঁচ দেশীয় চুক্তি অনুযায়ী, ২০১৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে কালাজ্বর নির্মূল করতে হবে। যে উপজেলায় ইতিপূর্বে কালাজ্বরের রোগী পাওয়া গেছে সে উপজেলায় প্রতি ১০ হাজার লোকের মধ্যে সর্বোচ্চ একজন এ জ্বরের রোগী থাকলেও লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে। নির্ধারিত সময়ের আগেই বাংলাদেশ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। ২০১৬ সালের মে মাসের হিসাব অনুযায়ী নির্মূল কর্মসূচির আওতাধীন উপজেলাগুলোতে প্রতি ১০ হাজার লোকের মধ্যে একজনেরও কম লোক কালাজ্বরে আক্রান্ত হচ্ছেন। পাঁচ দেশীয় চুক্তির নির্ধারিত সময়ের আগেই বাংলাদেশ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে সক্ষম।
তিনি বলেন, এরপরও উদ্বেগ মুক্ত হওয়ার সুযোগ নেই। এখন আমাদের জন্য কঠিন সময়। কারণ এই রোগ ঘুরে ঘুরে আসে। ফলে এর ওপর আমাদের কঠোর নজরদারি চলবে ২০২১ সাল পর্যন্ত।
চিকিৎসকদের মতে, কালাজ্বরে চিকিৎসা করা না হলে এটি আক্রান্ত ব্যক্তিকে নিস্তেজ করে ফেলে এবং প্রায়শই প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে। বেলে মাছির মাধ্যমে এই রোগ সংক্রামিত হয়, যা ভেজা মাটি, গর্ত, মাটির দেয়ালের ফাটল অথবা ইঁদুরের গর্তে বংশবৃদ্ধি করে। তাই বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চল কিংবা গ্রামাঞ্চলের দরিদ্রতর জনগোষ্ঠীর মাঝে এই রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। চিকিৎসা নেয়ার আর্থিক সামর্থ্য না থাকায় এ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি কাজকর্মে অসমর্থ হয়ে পড়ে। ফলে কালাজ্বর অপুষ্টি, ত্রুটিপূর্ণ বাসস্থান ও নিরক্ষতার সঙ্গে যুক্ত হয়ে দারিদ্র্য চক্রকে আরও অবধারিত করে তোলে।