তারুণ্যের বাতিঘর শেখ হাসিনা

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ৭০তম জন্মদিন গেল কাল। তিনি শুধু আমার নেত্রীই নন, তিনি আমার ব্যক্তিগত অভিভাবক। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন আমার বাবা কমান্ড্যান্ট মানিক চৌধুরীর অভিভাবক এবং আমার রাজনৈতিক আদর্শ। বঙ্গবন্ধু এবং বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার কাছে আমার পরিবারের ঋণ অসীম।
আমার বাবা কমান্ড্যান্ট মানিক চৌধুরীকে ‘সবুজ বিপ্লব’ বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখায় ১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার নিজ হাতে ‘বঙ্গবন্ধু কৃষি পদক’ তুলে দিয়েছিলেন। তারপর মুক্তিযুদ্ধে সাহসিক বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা ২০১৫ সালে বাবাকে মরণত্তোর ‘স্বাধীনতা পুরস্কারে’ ভূষিত করেন। এ সংবাদ শুনে গণভাবনে মাকে নিয়ে নেত্রীর কাছে যাই কৃতজ্ঞতা জানাতে। তখন যে আন্তরিক ভালোবাসা ও সম্মান তিনি আমার মাকে দিলেন; তা দেখে আমি ভাবছিলাম, বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষেই শুধু সম্ভব মানুষকে এত ভালোবাসা আর শ্রদ্ধা জানানো। তিনি মহান নেতা বলেই অতীত ইতিহাসকে লালন করেন। জাতির শেকড় খুঁজে ফেরেন। আর ইতিহাস গড়া ব্যক্তিদের সম্মান ও মূল্যায়ন করতে পারেন। এ অনন্য গুণ বঙ্গবন্ধুরও ছিল। সেদিন গণভবনে মায়ের প্রতি নেত্রীর এমন আন্তরিক ব্যবহারে আমার মা যে কত সন্তুষ্টি পেয়েছিলেন, তা ভাবলে এখনও চোখে জল এসে যায়। নেত্রী শেখ হাসিনা শুধু আমার নেতা নন। মায়ের মতো নিরাপদ আশ্রয় ও ভরসার স্থল। চেতনার বাতিঘর।
আজ থেকে ৩৫ বছর আগে ১৯৮১ সালের ১৭ মে সেবাব্রতে উৎসর্গীকৃত জীবন বোধ নিয়ে শেখ হাসিনা দেশে ফিরে এসেছিলেন দুঃখী বাঙালির পাশে। কর্মের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনা থেকে তিনি হয়ে উঠলেন দেশরতœ জননেত্রী শেখ হাসিনা। কর্মচাঞ্চল্যে মুখরিত শেখ হাসিনার পথচলা কখনোই নিরাপদ ছিল না। বঙ্গবন্ধুর আদর্শের ‘বাতিঘর’কে জিইয়ে রাখতে কন্যা শেখ হাসিনাকে বিপদে পড়তে হয়েছে বারংবার। তারপরও থেমে যাননি তিনি। যে নেত্রী মানুষের অধিকার আদায়ের মূলমন্ত্র নিয়ে দেশে ফিরলেন; দুঃখজনক হলেও সত্য, তাকেই সবচেয়ে বেশি অধিকারবঞ্চিত হতে হয়েছে। মা-বাবাসহ পরিবারের সব সদস্যের মর্মান্তিক হত্যাকা-ের পর নিজ পিত্রালয় ধানম-ি ৩২ নম্বর বাড়িতে প্রবেশ করতে পারেননি। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর সবচেয়ে সুবিধাভোগী ব্যক্তিত্ব জিয়াউর রহমান, তিনি সবার আগে বঙ্গবন্ধুর বিচারের পথ রুদ্ধ করেন ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ প্রণয়নের মাধ্যমে। পরিবারের অসংখ্য স্বজন হারিয়েও শেখ হাসিনা ও শেখ রেহেনা বঙ্গবন্ধুর কন্যা হয়েও বিচার চাইতে পারেননি। ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করায় একজন সাধারণ নাগরিকের মতো থানায় গিয়ে একটি জিডি করার আইনি অধিকার প্রয়োগ করতে পারেননি।
শত বাধা পেরিয়ে ১৯৮১ সালের ১৭ মে এক নতুন অধ্যায়ের শুরু হলো। চেতনার শক্তিতে বাস্তবে অর্জিত স্বাধীনতা ফলপ্রসূ করার জন্য শেখ হাসিনার আদর্শিক রাজনীতি। গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় অসাম্প্রদায়িক চেতনার মানসে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হয়ে উঠল বাঙালি জাতি। বাঙালির আশা-আকাক্সক্ষার ভরসার প্রতীক শেখ হাসিনা। তার বিপরীতে যারা গণতন্ত্রকে বিশ্বাস করে না, মানুষের অধিকারে বিশ্বাস করে না, অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ চায় না, সেই অপশক্তির কোপানলে পড়েন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। তার ওপর হামলা করা হয় ১৯ বার। সর্বশেষ ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় শেখ হাসিনাকে হত্যা করার পৈশাচিকতা রাজনীতির একটি কলঙ্কিত অধ্যায়।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় একটি ‘সুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ’ গড়ার লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধুকন্যা এগিয়ে যাচ্ছেন। আর এ এগিয়ে যাওয়ার পথে সব চ্যালেঞ্জ গ্রহণে বাংলার আপামর জনসাধারণ তাকে শক্তি জুগিয়ে চলেছে। ৭০ বছর বয়সেও জননেত্রী শেখ হাসিনা প্রতিটি মুহূর্ত বাংলাদেশের মানুষের উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছেন।
বাংলাদেশ আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। ৫০ লাখ মানুষের কাছে ১০ টাকা দরে চাল তুলে দিচ্ছেন শেখ হাসিনা। একসময়ের মঙ্গাপীড়িত এলাকা কুড়িগ্রামের বাসিন্দা জুলেখার হাসিমাখা মুখের বয়ান, ‘শেখের বেটি ১০ টেকা দরে আমাদের চাউল দিতেছে।’ ১৬ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিক ও ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্রের মধ্য দিয়ে ৩২ পদের ওষুধ পাঠানো হচ্ছে প্রত্যন্ত অঞ্চলের জনগণের দোরগোড়ায়। মাতৃমৃত্যু হার, শিশুমৃত্যু হার কমানোর পাশাপাশি, গৃহহীন মানুষ সরকারিভাবে ঘর পাচ্ছে। সরকারের কর্মকা-ের বহুমুখী উন্নয়নে, বাংলাদেশের জনগণের মাথাপিছু আয় বেড়ে ১ হাজার ৪৬৬ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। ৭৮ শতাংশ মানুষকে বিদ্যুতের আওতায় নিয়ে এসেছে সরকার। স্কুল-কলেজ, রাস্তাঘাট, পদ্মা সেতুর মতো বৃহৎ সেতু নির্মাণ করে এক আস্থাশীল, আশাবাদী নেতৃত্ব দিয়ে চলেছেন শেখ হাসিনা।
ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নের মাধ্যমে তিনি হয়ে হয়ে উঠেছেন তারুণ্যের বাতিঘর। ছয় কোটি তরুণ এখন ইন্টারনেট ব্যবহার করে নিজেদের আরও দক্ষ করে গড়ে তোলার সুযোগ পাচ্ছে। কর্মহীন তরুণরা প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে নিজেরাই কর্মসংস্থান গড়ছে। সর্বজনীন শিক্ষা ব্যবস্থায় বিনা পয়সায় শতভাগ শিক্ষার্থীর হাতে নতুন বই তুলে দেয়া হয়েছে। এ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। এখন সারা দেশে ১০০ শতাংশ শিশু প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যায়।
জননেত্রীর সেবা থেকে কেউ বাদ পড়ে না। সব্যসাচী অসুস্থ কবি সৈয়দ শামসুল হককে দেখতে যেমন তিনি হাসপাতালে ছুটে যান। ঠিক তেমনিভাবে দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়েও পায়রা নদীর কূলঘেঁষা চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্র শীর্ষেন্দুর ডাকযোগে প্রেরিত পত্রের উত্তর দিতে তিনি ভুলেননি। তিনি আশ্বাস দিয়ে শীর্ষেন্দুকে লেখেন, ‘পায়রা নদীর উপরে সেতু নির্মিত হবে।’ এভাবেই ব্যক্তি শেখ হাসিনা, রাজনীতিক শেখ হাসিনা, রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনা সর্বোপরি বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা এগিয়ে চলেছেন। শুধু আওয়ামী লীগের নেত্রী হয়ে নন, সারা দেশের, সারা বিশ্বের নেত্রী হিসেবে। জন্মদিনের শুভেচ্ছা, প্রিয় নেত্রী।

সমাজ কর্মী এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য