ডিজিটাল মার্কেটিংয়ে অপার সম্ভাবনা

বিশ্বব্যাপী ১৮৫ বিলিয়ন ডলারের ডিজিটাল বিজ্ঞাপনের বাজার; যা প্রতি বছর বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান গার্টনারের মতে, ২০১৪ সালে বিশ্বের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ডিজিটাল প্রচারণার পেছনে তাদের মোট রাজস্বের প্রায় ১০ শতাংশ ব্যয় করেছে, যা ২০১৫ সালে দাঁড়ায় ১১ শতাংশে। ২০১৬ সালে এসে এই হার আরো বেড়েছে। ডিজিটাল মার্কেটিংয়ে প্রচারণার জন্য বাজেট বাড়ানোর কারণে প্রচলিত বিভিন্ন মাধ্যম যেমন টিভি, রেডিও কিংবা সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য বাজেট কমাচ্ছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, এমনটাও জানিয়েছে গার্টনার। ২০১৭ সালে এ বাজেট আরো কমিয়ে আনা হতে পারে বলেও ধারণা করছে প্রতিষ্ঠানটি।

ডিজিটাল মার্কেটিং সংশ্লিষ্টদের মতে, আমাদের দেশে বছরে বিজ্ঞাপনের বাজার প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার; যার অন্তত দুই শতাংশ ব্যয় করা হয় ডিজিটাল মার্কেটিংয়ে। তাদের মতে দেশে ডিজিটাল এজেন্সির সংখ্যা প্রায় ৭০টি, যাতে কয়েকশ’ তরুণ কাজ করছেন। এর বাইরে কয়েক হাজার ফ্রিল্যান্সার দেশ-বিদেশের ডিজিটাল মার্কেটিং পেশার সঙ্গে জড়িত।

কোনো পণ্য বা সেবা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য প্রয়োজন পড়ে এর প্রচারণা বা মার্কেটিংয়ের। মার্কেটিংয়ের জন্য সবচেয়ে প্রচলিত এবং পরিচিত মাধ্যম হলো টিভি বিজ্ঞাপন কিংবা পত্রপত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেওয়া। তবে যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এ ক্ষেত্রেও আসছে পরিবর্তন। বর্তমানে টিভি কিংবা ছাপা পত্রিকার জায়গা দখল করে নিচ্ছে বিভিন্ন অনলাইন সংবাদমাধ্যম, ইউটিউব প্রভৃতি। আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক তো অনলাইন বিপ্লবই ঘটিয়ে ফেলেছে। এসব বিবেচনায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তাদের পণ্য বা সেবার প্রচারণার জন্য দ্বারস্থ হচ্ছেন এসব মাধ্যমের; যা ডিজিটাল মার্কেটিং নামে পরিচিত। বিশ্বে ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের সবচেয়ে বড় অংশ দখল করে রেখেছে ফেসবুক, গুগল এবং ইউটিউব।

বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশেও ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি এগিয়ে আছে ফেসবুক ও গুগল। এর পাশাপাশি ইমেইল মার্কেটিং, অ্যাপ মার্কেটিং এবং কিছু পরিমাণে ভিডিও মার্কেটিংও হচ্ছে। স্মার্টফোন এবং অন্যান্য ডিজিটাল ডিভাইসের সহজলভ্যতার কারণে ডিজিটাল মার্কেটিংয়ে আগ্রহী হচ্ছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। দেশের ডিজিটাল মার্কেটিং ট্রেন্ড সম্পর্কে বিটপি বিজ্ঞাপনী সংস্থার ডিজিটাল কমিউনিকেশন্স পরিচালক নওশের রহমান বলেন, ‘আমাদের দেশের ডিজিটাল মার্কেটিং এখনো বেশ নতুন একটি বিষয়। বলা যেতে পারে গত পাঁচ বছর ধরে ডিজিটাল মাধ্যমগুলো ব্যবহার করে প্রচারণা চালাচ্ছে এখানকার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। তবে আমি মনে করি আগামী দুই বছরের মধ্যে ডিজিটাল মার্কেটিং এখানে বেশ শক্ত একটি অবস্থান তৈরি করবে।’

এক্সপোনেন্ট ওয়েবের সিইও আবুল কাশেম বলেন, ‘বাংলাদেশে অনেক তরুণই বর্তমানে ফ্রিল্যান্সার হিসেবে ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের সাথে যুক্ত রয়েছে। তবে তাদের অধিকাংশই মূলত সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন, ব্র্যান্ড ডেভেলপমেন্ট প্রভৃতি কাজ করে থাকে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি চাহিদা রয়েছে সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশনের।’ তিনি জানান, শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশনের ৮৫ বিলিয়ন ডলারের বাজার রয়েছে। বাংলাদেশের তরুণরা এ খাতে বেশ ভালো করছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এখানে রয়েছে বিপুল সম্ভাবনা। কারণ সব প্রতিষ্ঠানই চায় অনলাইনে তার একটা শক্ত অবস্থান বজায় থাকুক। তবে এ কাজগুলো করার জন্য দক্ষতা যত বেশি হবে, আয় তত বেশি হবে। বিশাল এ বাজার ধরতে আমরা এখনো সেভাবে প্রস্তুত হতে পারিনি। আমাদের তরুণদের এ কাজগুলো করার জন্য আরো দক্ষ হতে হবে।’ স্থানীয় বাজারে এখনো সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশনের সেরকম চাহিদা তৈরি হয়নি বলেও তিনি জানান। বাংলাদেশি বিজ্ঞাপনী প্ল্যাটফর্ম ‘গ্রিন অ্যান্ড রেড’ এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ নাজিমুদ্দৌলা এ বিষয়ে বলেন, বাংলাদেশে প্রতি বছর বিজ্ঞাপন খাতে ব্যয় কয়েক হাজার কোটি টাকা। তবে এর খুব কম অংশই ব্যয় করা হচ্ছে ডিজিটাল মার্কেটিংয়ে। বছরখানেক আগে মাত্র এক শতাংশ এ খাতে ব্যয় করা হলেও এখন এর পরিমাণ ২ থেকে ৩ শতাংশে এসে পৌঁছেছে। আগামী বছর দুয়েকের মধ্যে এটা ১০ শতাংশ অতিক্রম করে যেতে পারে।

তিনি আরো বলেন, ‘ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের ক্ষেত্রে আমাদের মূলত বিদেশি মাধ্যমগুলোর উপর নির্ভর করতে হয়, যার কারণে দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ প্রতি বছর বিদেশে চলে যাচ্ছে। সম্ভাবনাময় এ খাতটি নিয়ে এখন কাজ করার অনেক সুযোগ আছে, যার মাধ্যমে দেশের অর্থ বিদেশে যাওয়া থেকে যেমন রক্ষা পাবে, তেমনি বৈদেশিক মুদ্রা আয়েরও সুযোগ থাকবে।’ তিনি আরো জানান, ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের জন্য যে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে চলে যাচ্ছে, তাতে সরকারের তেমন নিয়ন্ত্রণ নেই। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ দেশেই রাখতে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিতে পারে।

নাজিমুদ্দৌলা আরো জানান, চীন কিংবা রাশিয়ায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক নিষিদ্ধ হওয়ার কারণে এসব দেশে নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম গড়ে উঠেছে। আর এ কারণে সেখানে এ খাতের সম্পূর্ণ অর্থই থেকে যাচ্ছে নিজ দেশে। বাংলাদেশের জন্যও এমন কোনো পরিকল্পনা হাতে নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। তিনি বলেন, এ খাতের জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা। দেশীয় বাজারে ডিজিটাল মার্কেটিংয়ে আমরা কয়েক বছর ধরে কাজ করছি। তবে এখানে আমাদের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হলো গুগল। শুরুর দিকে আমাদের যে বাজার ছিল, তা এখন ১০ থেকে ১২ গুণ বেড়েছে বলে তিনি জানান।

সম্ভাবনাময় ডিজিটাল মার্কেটিং খাতে তৈরি হচ্ছে কর্মসংস্থানের সুযোগও। বর্তমানে এ কাজের জন্য গড়ে উঠছে ছোট-বড় এজেন্সি। গেম, অ্যাপ থেকে শুরু করে ভিডিও মার্কেটিংয়ে যুক্ত হচ্ছেন অনেকেই। নাজিমুদ্দৌলা বলেন, ‘যেহেতু এ খাতের প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে এবং প্রতিনিয়তই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের দিকে ঝুঁকে পড়ছে, তাই এ খাতের উন্নয়নে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা।’

সংশ্লিষ্টরা আরো বলছেন, বাংলাদেশে অ্যামাজন, উবারের মতো প্রতিষ্ঠান আসছে না শুধু পেমেন্ট সিস্টেমের জটিলতার কারণে। আর আমাদের তরুণদের মধ্যে এখনো আন্তর্জাতিক মানের দক্ষতা এবং পেশাদারিত্ব তৈরি হয়নি। দক্ষ হলে এখন এ খাত থেকে যা আয় হচ্ছে, তার দশ গুণ বেশি আয় করা সম্ভব হবে।