ঝিকরগাছার নকশিকাঁথা যাচ্ছে ১৪ দেশে

আশুরা বেগম, হাজেরা বেগম, সেলিনা বেগম সুনিপুণ হাতে বেডশিটে ফোঁড় তুলছেন। আর নিজেদের দুঃখ জয়ের গল্প বলছিলেন। প্রতি ফোঁড়ে ফোঁড়ে যেন গেঁথে যাচ্ছিল সেই দুঃখ-সুখের গল্প। দারিদ্র্য জয়ের এ গল্প একদিনের নয়, বহু বছরেরÑ বহু পুরনো। শুধু আশুরা, হাজেরা কিংবা সেলিনা বেগমের নয়; যশোরের ঝিকরগাছার অন্তত ৫০০ নারীর জীবনে দুঃখ জয়ের এ রকম গল্প রয়েছে। এরা পাঞ্জাবি, ফতুয়া, কামিজ, সোফার কুশন সেট, বেডশিট, বালিশের কভার, শাড়ি, শালচাদরের কারুকার্য ও কাঁথা সেলাই করে ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়েছেন। পরিবারে সচ্ছলতার পাশাপাশি নারীর ক্ষমতায়ন অর্জন করেছেন।
এতো হলো সূচিশিল্পীদের গল্প। তাদের কারুকার্যের গল্পও কম নয়। তাদের শিল্পকর্মের সুখ্যাতি দেশের গ-ি পেরিয়ে এখন ইউরোপের বাজার পর্যন্ত বিস্তৃত। বিখ্যাত নকশিকাঁথা তাদেরই সুনিপুণ শৈল্পিক হাতের ছোঁয়া ও কর্মদক্ষতার স্বাক্ষরবহন করে চলেছে। এমনই তথ্য দিয়ে জেলার ঝিকরগাছার মোবারকপুরের নুরজাহান বেগম জানান, রাজধানীসহ বড় বড় শহরের অভিজাত সৌখিন পরিবারগুলোর চাহিদা মিটিয়ে এ শিল্পকর্ম ১৪টি দেশ যেমনÑ ব্রিটেন, নরওয়ে, সুইডেন, জার্মানি, বেলজিয়াম, ডেনমার্ক, অস্ট্রিয়া, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, জাপান, আরব আমিরাত, কুয়েত, সৌদি আরব ও রাশিয়ায় রফতানি হয়ে থাকে। এ শিল্পপণ্য রফতানির বিপরীতে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের মাধ্যমে আমাদের অর্থনীতির চাকা অনেকাংশে সচল থাকছে। তবে শ্রমিকরা ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন। পুরন্দরপুর গ্রামের হাজেরা, রেশমা ও সেলিনা বেগম জানান, একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অধীনে তাদের কাজ করতে হচ্ছে। তাই তারা অপেক্ষাকৃত কম মজুরি পেয়ে থাকেন। এ পণ্য তারা সরাসরি উৎপাদন করে বিক্রি করতে পারলে আরও উপকৃত হতেন। তাদের দেয়া তথ্য মতে, ঝিকরগাছায় ৯টি ‘সূচিশিল্প কেন্দ্র’ রয়েছে। কাশিপুর, পদ্মপুকুর, মোবারকপুর, পুরন্দরপুর, কাটাখাল, বারবাকপুর, কৃষ্ণনগর ও মিশ্রি দেয়াড়ার কেন্দ্রে কর্মরত রয়েছেন প্রায় ৪৫০ থেকে ৫০০ নারী। মোবারকপুর কেন্দ্রের পরিচালক নুরজাহান বেগম জানান, তিনি ২০০৪ সাল থেকে এ শিল্পের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত। তিনি জানান, সূচিশিল্পীরা শিল্পকর্মের প্রোডাক্টশনের ওপর দেড় শতাংশ হারে পারিশ্রমিক পেয়ে থাকেন। প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে সূচিশিল্পীদের কাপড়, সুতা ও ডিজাইন সরবরাহ করা হয়। শিল্পীরা কেবল কাপড় ফ্রেমবন্দি করে সুই-সুতার মাধ্যমে নকশা ফুটিয়ে তোলেন।
কথা হয় মোবারকপুর গ্রামের মোটর শ্রমিক মামুনের স্ত্রী রতনা বেগমসহ অনেকের সঙ্গে। তারা জানান, একটি নকশি কাঁথার ডিজাইন করতে (সম্পূর্ণ কারুকাজ) তিন থেকে সাড়ে তিন মাস সময় লাগে। ক্ষেত্রবিশেষ বেশিও লাগতে পারে। শাল, চাদর, বেডশিট ও বালিশের কভার (বনফুল) নকশা করতে আড়াই থেকে তিন মাস পর্যন্ত সময় লাগে। এর বিপরীতে তারা মজুরি পান ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা। পাঞ্জাবি ও শাড়ি নকশা করতে প্রকারভেদে সময় লাগে তিন থেকে সাড়ে তিন মাস। তারা পারিশ্রমিক পান মাত্র আড়াই থেকে ৩ হাজার টাকা। কামিজ ও ফতুয়ার নকশা তৈরিতে সময় লাগে ৮ থেকে ১০ দিন। পারিশ্রমিক পান ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা। সোফার কুসন সেট নকশা তৈরিতে সময় লাগে পাঁচ থেকে সাত দিন। পারিশ্রমিক পান ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা। এই পারিশ্রমিক থেকেই তারা সংসারে সচ্ছলতা ফিরিয়ে এনেছেন। মজুরি আরেকটু বাড়লে তারা উপকৃত হতেন। গ্রামবাংলার চির ঐতিহ্যের এ শিল্পের ঐতিহ্য ধরে রাখতে তারা সরকারিভাবে সহযোগিতা কামনা করেছেন।