সম্ভাবনার সবুজক্ষেত্র, দেশ-বিদেশে অপার সুযোগ

একটা সময় ছিল অভিভাবকরা প্রথমে তার সন্তানকে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করানোর চিন্তা করত না। স্বপ্ন থাকত তাদের সন্তান চিকিৎসক নয় তো প্রকৌশলী হবে। কৃষির উপর তাদের সন্তান উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করবে, এটা তারা ভালভাবে গ্রহণ করত না। কিন্তু সময় এখন অনেক বদলেছে কৃষিকে উচ্চশিক্ষা ও পেশা হিসেবে বেছে নিচ্ছে আধুনিক অনেক তরুণ-তরুণীরা। এ পেশাকে বিশ্বজুড়ে বলা হচ্ছে, সম্ভাবনাময় সবুজ ক্ষেত্র। সত্যি বলতে কি বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যদি কিছু দিয়ে থাকে তাহলে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোই দিয়েছে। ৭ কোটি মানুষের দেশে খাদ্যের অভাব ছিল, ১৬ কোটি মানুষ ভাল মতোই আজ খেয়ে আছে। এ পেশার সঙ্গে জড়িত কৃষিবিদ আর কৃষি বিজ্ঞানীদের কল্যাণেই- দেশ আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। কৃষিকে এগিয়ে নিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে একাধিক কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান। কৃষিতে পড়াশোনা করে সরকারী ও বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে অনেক ভাল চাকরি পাওয়া যায়। রয়েছে দেশের বাইরে কৃষি নিয়ে কাজ করার অপার সুযোগ। সব মিলিয়ে কৃষি খাতে রয়েছে উজ্জ্বল ক্যারিয়ারের হাতছানি।

এ বিষয়ে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. কামাল উদ্দিন আহাম্মদ বলেন, আমাদের দেশ কৃষি প্রধান দেশ। দেশের অধিকাংশ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপড় নির্ভরশীল। তাই কৃষি সেক্টরের উন্নতি ছাড়া আমাদের দেশের মানুষের তথা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। এই উন্নয়নের ধারাকে সমুন্নত রাখতে হলে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হলো কৃষিতে ব্যাপক হারে গবেষণা ও নতুন নতুন প্রযুক্তির উদ্ভাবন করা। তিনি আরও বলেন, দেশ যে এখন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ তা কিন্তু কৃষি গবেষকদেরই সাফল্য। সরকারী-বেসরকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কৃষিবিদদের কাজের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। আবার কৃষিবিদ হয়ে আধুনিক খামারও গড়ে তোলা যেতে পারে। কৃষি পরামর্শক হিসেবেও কাজ করা যায়। ফলে এ কথা বলা যায়, কৃষিবিদের কর্মক্ষেত্র যথেষ্ট উর্বর। কৃষিবিদ হওয়ার পথে প্রথম ধাপ হলো উচ্চ মাধ্যমিকের পর কৃষিতে স্নাতক পর্যায়ে পড়াশোনা করা। অবশ্যই মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে বিজ্ঞানে পড়াশোনা করতে হবে। পরে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে বিভিন্ন অনুষদের ৪ বছর মেয়াদী বিএসসি (অনার্স) কোর্স বেছে নিতে হবে। বর্তমানে চারটি বিশেষায়িত কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, একটি ভেটেরিনারি ও এনিমেল সায়েন্স বিশ্ববিদ্যালয় এবং তিনটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও কৃষি বিষয়ে পড়ার সুযোগ রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হলো শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।

এছাড়া স্বল্প পরিসরে কৃষিবিষয়ক পাঠ্যক্রম চালু রয়েছে চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও এনিমেল সায়েন্স বিশ্ববিদ্যালয়, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়। এছাড়া আইইউবিএটি, এআইইউবি, এক্সিম ব্যাংক কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়সহ প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও কৃষি বিষয়ে ডিগ্রী অর্জন করা যায়। এছাড়া স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি ডিগ্রী নেয়া যায় শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।

কৃষিতে স্নাতক (সম্মান) করে বাংলাদেশ কর্ম কমিশনের (বিসিএস) পরীক্ষায় টেকনিক্যাল ও সাধারণ উভয় ক্যাডারে আবেদনের সুযোগ পাওয়ায় দেশের সব কর্মক্ষেত্রে যোগ দিতে পারবে। কৃষি অনুষদ থেকে পাস করা শিক্ষার্থীরা বিসিএসের মাধ্যমে উপজেলাগুলোতে কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেন। সরকারী-বেসরকারী ও বহুজাতিক বিবিধ প্রতিষ্ঠানে কৃষিবিদদের কাজের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। এনজিও এবং বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো দিন দিন কৃষিক্ষেত্রে তাদের কাজের পরিধি বাড়াচ্ছে। বিশেষ করে বেসরকারী বীজ কোম্পানিগুলোতে কৃষিবিদদের জন্য কর্মসংস্থানের বড় ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট, ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার এগ্রিকালচার, বন গবেষণা ইনস্টিটিউট, মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট, চা গবেষণা ইনস্টিটিউট, পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট, ইক্ষু গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ জুট মিলস কর্পোরেশন, লাইফ স্টক রিসার্চ ইনস্টিটিউট, রেশম উন্নয়ন বোর্ড, মসলা, গম কন্দাল ওপরে আলাদা গবেষণা কেন্দ্র রয়েছে। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন অধিদফতর, কৃষি তথ্য সার্ভিস, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি), বীজ উৎপাদন প্রতিষ্ঠান। এ রকম অসংখ্য প্রতিষ্ঠানে কাজের সুযোগ পাওয়া যায়।

এছাড়া আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক বিষয়ক উন্নয়ন সংস্থা (ইউএসএইড), যুক্তরাজ্যের বৈদেশিক বিষয়ক উন্নয়ক সংস্থা (ডিএফআইডি), ডেনমার্কের বৈদেশিক বিষয়ক উন্নয়ন সংস্থা ড্যানিডা, সুইডেন ও কানাডার সিডা, উইনরক ইন্টারন্যাশনাল, প্র্যাকটিক্যাল এ্যাকশন, ওয়ার্ল্ড ফিম, আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ইরি), আন্তর্জাতিক সার গবেষণা ইনস্টিটিউট (্আইএফডিসি) ও অক্সফাম জিবির মতো প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের কৃষি খাতের উন্নয়নে এগিয়ে এসেছে। ব্র্যাক, স্কয়ার, এগ্রোভেট, লালতীর, ন্যাশনাল এগ্রো কেয়ার, প্রশিকা, আশা, এসিআই, কৃষিবিদ গ্রুপ, এ্যাকশন এইড, কেয়ার বাংলাদেশের মতো বেসরকারী প্রতিষ্ঠানেও উচ্চ বেতনে চাকরি পাওয়া সম্ভব।

ভেটেরিনারি থেকে পাস করে বিসিএস পরীক্ষায় ভেটেরিনারিয়ানরা উপজেলাগুলোতে ভেটেরিনারি সার্জন হয়ে যোগদান করে। একই পরীক্ষায় পশুপালন অনুষদের স্নাতকেরা উপজেলাগুলোতে বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, পশু উৎপাদন কর্মকর্তা কিংবা পোল্ট্রি উন্নয়ন কর্মকর্তা হয়ে যোগ দেন। বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা প্রতিষ্ঠানে (বিএলআরআই) বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা হয়ে যোগ দেয়া যায়। এই প্রতিষ্ঠানের অধীনে বিভিন্ন সরকারী ফার্ম ও গবেষণা কেন্দ্র আছে।

বিসিএস পরীক্ষায় মৎস্যবিজ্ঞান অনুষদ থেকে পাস করা শিক্ষার্থীরা বিসিএসের মাধ্যমে টেকনিক্যাল কোটায় উপজেলাগুলোতে মৎস্য কর্মকর্তা এবং মৎস্য সম্প্রসারণ কর্মকর্তা হয়ে যোগ দেন। এ ছাড়া সাধারণ কোটায় অনেকেই যোগ দিচ্ছেন। অনেক ফিসারিজ গ্র্যাজুয়েট ব্যক্তিগত খামার ও হ্যাচারি প্রতিষ্ঠা করে মৎস্য উৎপাদন কয়েক গুণ বাড়িয়েছে।

কৃষি অর্থনীতি গ্র্যাজুয়েটরা দেশে এবং বিদেশে বিভিন্ন সরকারী ও বেসরকারী প্রতিষ্ঠান-ব্যাংক, এগ্রি বিজনেস ফার্ম, বহুজাতিক কোম্পানি ইত্যাদিতে সাফল্যের সঙ্গে শীর্ষ অবস্থানে অধিষ্ঠিত রয়েছে।

শিক্ষা জীবনে ভাল ফল করলে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকতার সুযোগ তো থাকছেই। এছাড়া বাংলাদেশ কর্ম কমিশনের (বিসিএস) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সরকারী কলেজগুলোতে কৃষি বিষয়ে শিক্ষকতা করার যায়। বিভিন্ন সরকারী ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে লেকচারার হয়ে যোগ দেয়ার যায়।

ব্যাংকার : কৃষি ব্যাংকগুলোতে অগ্রাধিকারসহ দেশের সরকারী ও বেসরকারী সব ব্যাংকে চাকরি করছে কৃষিবিদেরা।

কৃষিবিদদের জন্য বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রয়েছে উচ্চশিক্ষার বিশাল সুযোগ। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, জাপান, জার্মান, অস্ট্রেলিয়া, চীন, মালয়েশিয়া ও ভারতে প্রতিবছর বৃত্তি নিয়ে পড়তে যাচ্ছে এদেশের কৃষিবিদরা।