বছরে দেশের ৮০ লাখ মানুষ বেড়াতে যায়

বিশ্ব পর্যটন দিবস আজ। নানা আয়োজনে বিশ্বের অন্য দেশের মতো বাংলাদেশেও দিবসটি পালন করা হচ্ছে। বছরে এদেশের ৮০ লাখ মানুষ বিভিন্ন পর্যটন কেন্দ্রে বেড়াতে যায়। এ খাতে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৮ বিলিয়ন ডলার বা ৬২ হাজার ৪২৫ কোটি টাকা আয় হয়েছে। এখানে পর্যটক যেমন বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে অবকাঠামো সুবিধা। এদেশে পর্যটনের অপার সম্ভাবনা রয়েছে। সবার সহযোগিতা পেলে এ শিল্পের আরও বিকাশ ঘটানো সম্ভব। এতে আয় আরও বাড়বে। জানা গেছে, বিশ্বে পর্যটনের প্রচার, প্রসার ও সার্বিক উন্নয়নের লক্ষ্যে ১৯৭৪ সালের ১ নভেম্বর জাতিসংঘের একটি বিশেষায়িত সংস্থা হিসেবে বিশ্ব পর্যটন সংস্থা আত্মপ্রকাশ করে। ১৯৮০ সাল থেকে ২৭ সেপ্টেম্বর বিশ্ব পর্যটন দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। এবার দিবসটির মূল প্রতিপাদ্য ‘সবার জন্য পর্যটন : সার্বজনীন পর্যটনের অভিগম্যতা’। দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাণী দিয়েছেন। এছাড়া জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুনও বাণী দিয়েছেন।
বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের হিসাবমতে, দেশের ৮০ লাখ মানুষ বছরে ভ্রমণে যায়। ৪ থেকে ৫ বছরে এ সংখ্যা ৮ লাখ থেকে ১০ লাখ করে বেড়েছে। পর্যটনসংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনেক পরিবার এখন সঞ্চয়ের একটা অংশ আলাদা করে রাখেন ভ্রমণের পেছনে ব্যয় করতে। এ কারণেই এ খাত বিকশিত হচ্ছে। হোটেল-মোটেল ও রেস্টুরেন্টের পাশাপাশি পর্যটন ব্যবস্থাপনার জন্য গড়ে উঠছে অনেক প্রতিষ্ঠান।
বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের তথ্যমতে, ২০১৫ সালে বাংলাদেশে বিদেশি পর্যটক এসেছিলেন ৬ লাখ ৪২ হাজার। ২০১৫ সালে এ খাতের ৪০২ দশমিক ৬ বিলিয়ন টাকা আয় হয়; যা জিডিপির প্রায় ২ দশমিক ৪ শতাংশ। ২০১৬ সালে এটা বেঁড়ে দাঁড়াবে ৫ দশমিক ২ শতাংশে।
২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৮ বিলিয়ন ডলার বা ৬২ হাজার ৪২৫ কোটি টাকা আয় হয়েছে। এর একটি বড় অংশই আয় হয়েছে ঈদে। ২০১৫ সালে শুধু দুর্গাপূজার ছুটিতে ভ্রমণে ১ হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য হয়েছে।
বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের ব্যবস্থাপক (বিপণন) পারভেজ আহমেদ চৌধুরী বলেন, মানুষের এখন সামর্থ্য বেড়েছে। ফলে ভ্রমণের ইচ্ছা বেড়েছে। এতে অর্থনীতিও চাঙ্গা হচ্ছে। একেকটা ঈদের ছুটিতে পর্যটন খাতে হাজার কোটি টাকা লেনদেন হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের চেয়ারম্যান সাকের আহমেদ বলেন, দেশের মানুষের ভ্রমণের অভ্যাস ক্রমেই বাড়ছে। দেশের মানুষ যত বেশি বেড়াতে যাবে, ততই অবস্থার উন্নতি হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত পরিকল্পনা নেয়া উচিত। লাখ লাখ মানুষ কক্সবাজার, বান্দরবান, সাজেক, সিলেট, হাওর, মিরসরাইয়ের খইয়াছড়া, বান্দরবানের নাফাকুম, আমিয়াকুম, সিলেটের বিছনাকান্দি কিংবা রাতারগুলের মতো জায়গাগুলোতে বেড়াতে যাচ্ছে। শুধু দেশে নয়, বিদেশেও পাড়ি দিচ্ছেন পর্যটকরা। মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, নেপাল, ভুটান ও মালদ্বীপেও যাচ্ছেন বিপুলসংখ্যক পর্যটক। ঈদে ৫০ থেকে ৬০ হাজার মানুষ ভারতে বেড়াতে যায়। গত রোজার ঈদে পর্যটকদের ভিসা দিতে ঢাকায় আলাদা ভিসা ক্যাম্প চালু করেছিল।
সূত্র জানায়, সারা বছরই পর্যটকরা ছুটছেন এক দেশ থেকে আরেক দেশে। ভারতে প্রতি বছর বেড়াতে যান পাঁচ থেকে ছয় লাখ পর্যটক। এর পরের সবচেয়ে বড় গন্তব্য মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ড। প্রতি বছর দেড় লাখ মানুষ মালয়েশিয়ায় আর এক লাখ মানুষ থাইল্যান্ডে যায় বেড়াতে। ৩০ হাজার থেকে ৪০ হাজার পর্যটক যান সিঙ্গাপুরে। এছাড়া ভিসা লাগে না বলে নেপাল, ভুটান, মালদ্বীপ ও শ্রীলঙ্কায় যাচ্ছেন বিপুল সংখ্যক পর্যটক।
বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের চেয়ারম্যান ড. অপরূপ চৌধুরী বলেন, পর্যটনকে সরকারিভাবে শিল্প হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে হলে বিদেশিদের সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে। একজন বিদেশি পর্যটক এলে ১ হাজার ডলার খরচ করেন। এ শিল্প থেকে অনেক আয় করা সম্ভব।
কর্মসূচি : দিবসটি উপলক্ষে নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে নানা সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড, বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন এবং বেসরকারি পর্যটনবিষয়ক স্টেকহোল্ডার বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। সংবাদপত্রগুলো বিশেষ নিবন্ধ এবং টেলিভিশনে নানা অনুষ্ঠান সম্প্রচার করবে। সকাল সাড়ে ৮টায় রাজধানীর মৎস্য ভবনের সামনে র‌্যালি বের হবে। সকাল সাড়ে ১০টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে কেক কাটা হবে; বেলা ১১টায় হবে আলোচনা সভা; বিকালে টিএসসির সামনে লোকসংগীত; বিকাল ৫টায় বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের উদ্যোগে হোটেল অবকাশের ব্যাংকোয়েট হলে আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন স্থানে আলোকসজ্জা, হোটেলগুলোতে বিশেষ রেয়াত, চিত্রাংকন প্রতিযোগিতা, বিতর্ক প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছে।
কক্সবাজারে নানা আয়োজন : কক্সবাজার সংবাদদাতা জানান, বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে নানা অনুষ্ঠান আয়োজনের প্রস্তুতি নিয়েছে কক্সবাজার বিচ ম্যানেজম্যান্ট কমিটি। পর্যটন দিবসে গ্রান্ড র‌্যালি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশু শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে সৈকতের কীটকটে চিত্রাংকন প্রতিযোগিতা ও বিকালে লাবণী পয়েন্টে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। পুরো সৈকতকে সাতটি মূল জোনে ভাগ করে সব জোনে দিনব্যাপী নানা বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান চলবে। এছাড়া পর্যটকদের জন্য কুইজ প্রতিযোগিতাসহ আরও বিভিন্ন আইটেমের আয়োজন রয়েছে বলে জেলা প্রশাসনের সূত্রে জানা গেছে। এদিকে কক্সবাজার সৈকতে ভ্রমণে আসা পর্যটকদের সার্বিক নিরাপত্তায় বিশেষ ব্যবস্থা, শহরের প্রধান সড়কের যানজট নিরসনের বিকল্প উপায়, শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনে বাঁকখালী নদী খনন, শহরে শিশুপার্ক স্থাপন, স্থায়ী শহর রক্ষাবাঁধ নির্মাণসহ নানা প্রকল্প গ্রহণ করা হচ্ছে। এসব বাস্তবায়িত হলে কক্সবাজার হবে পরিকল্পিত পর্যটন নগরী।