হাতিরঝিল অ্যাম্ফিথিয়েটারের কাজ শেষ পর্যায়ে

দূর থেকে দেখে মনে হবে, পানির ওপরে ভাসছে বিশাল এক মঞ্চ। তার আয়তন ৩৯০ বর্গমিটার। মঞ্চের অনুষ্ঠান উপভোগের সঙ্গে গ্যালারি থেকে দর্শকদের চোখে পড়বে ঝিলের বুক চিরে গানের তালে তালে নেচে ওঠা বর্ণিল ফোয়ারা। ফোয়ারার ওপাশে কৃত্রিম দ্বীপের অভয়ারণ্যে সবুজ বৃক্ষরাজি আর বিচিত্র ফুল-পাখি। সব মিলিয়ে হাতিরঝিলের এই মুক্তমঞ্চ হয়ে উঠবে মানব প্রাণের সঙ্গে জলের নিবিড় যোগাযোগের সমার্থক। আশা করা হচ্ছে, এটিকে ঘিরেই গড়ে উঠবে রাজধানীর সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিনোদন ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র।
হাতিরঝিলের গুলশান অংশে এই মুক্তমঞ্চের (অ্যাম্ফিথিয়েটার) কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এর মধ্যেই মঞ্চটির ৮৫ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। বাকি কাজ শেষে আগামী খ্রিষ্টীয় নববর্ষের প্রথম দিনে এর উদ্বোধনের পরিকল্পনা রয়েছে।
মুক্তমঞ্চটি নির্মিত হচ্ছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) হাতিরঝিল সমন্বিত উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায়। নির্মাণকাজের তদারক করছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কোর অব ইঞ্জিনিয়ার্স ১৭ ইসিবি।
গতকাল সোমবার সরেজমিনে দেখা যায়, পানির ওপর কংক্রিটের মূল মঞ্চ তৈরির কাজ শেষ। সামনে অর্ধবৃত্তাকারে তিনটি ইস্পাতের তৈরি দর্শকসারির কাজও শেষ পর্যায়ে, তবে এখনো আসনবিন্যাস শুরু হয়নি। আলাদা গাড়ি পার্কিংয়ের ভবন, সেখান থেকে সরাসরি মূল মঞ্চে আসার জন্য উড়াল পুল এবং মঞ্চের বাইরে অপেক্ষমাণ দর্শকদের বসার জন্য উন্মুক্ত জায়গা তৈরির কাজও শেষ পর্যায়ে।
হাতিরঝিল সমন্বিত উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক মেজর কাজী শাকিল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, প্রতিটি সারিতে ৫০০ করে মোট দেড় হাজার দর্শকের বসার ব্যবস্থা রয়েছে। আসনগুলো তৈরি হবে চীন থেকে আমদানি করা বিকল্প কাঠ ডব্লিউপিসি (উডেন প্যানেল কম্পোজিট) দিয়ে। এগুলো আগুন ও তাপ প্রতিরোধী। মঞ্চ এলাকায় বাচ্চাদের জন্য আলাদা কর্নার, একটি রেস্তোরাঁ ও শৌচাগারের ব্যবস্থা থাকবে।
শাকিল হোসেন বলেন, মুক্তমঞ্চ নির্মাণে ব্যয় হবে ১২ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। এ ছাড়া ফোয়ারাটি নির্মাণের জন্য প্রায় ১৯ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। ২০১৪ সালের গোড়ার দিকে এটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। তবে ওই বছরেই ঘূর্ণিঝড় মহাসেনের কারণে পানির উচ্চতা বেড়ে যায়। এতে তৈরি হওয়া নতুন কিছু সমস্যায় মঞ্চের নকশায় খানিকটা পরিবর্তন আনতে হয়। ফলে চলতি বছরের অক্টোবরে মঞ্চের কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তা সম্ভব হবে না। আগামী বছরের ১ জানুয়ারি মঞ্চটির সঙ্গে এই ফোয়ারাও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্বোধনের পরিকল্পনা রয়েছে।
মুক্তমঞ্চের অন্যতম নকশাকার স্থপতি ইকবাল হাবিব প্রথম আলোকে বলেন, এই উন্মুক্ত মঞ্চ নকশা করার ক্ষেত্রে পানির সঙ্গে প্রাণ-প্রতিবেশের প্রত্যক্ষ সম্পর্ককে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পানিকে উপজীব্য করে বাংলাদেশে এ ধরনের স্থাপনা এটাই প্রথম। এ জন্যই গুলশানের কাছে হাতিরঝিলের সবচেয়ে সম্প্রসারিত এই অংশ বেছে নেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলেন, গোটা হাতিরঝিল প্রকল্পটি নকশা করার ক্ষেত্রে পরিকল্পনা ছিল, এখানকার আয় থেকেই যেন এর পরিচালনার সব খরচ মেটানো যায়। সে ক্ষেত্রে এই উন্মুক্ত মঞ্চ হবে আয়ের অন্যতম উৎস। মঞ্চের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা দেওয়া হবে। যারা বিভিন্ন জাতীয় দিবস ও উৎসবের দিনগুলোতে নানা অনুষ্ঠান আয়োজনের পাশাপাশি লেজার শোর ব্যবস্থা করবে। যার মধ্য দিয়ে ফুটে উঠবে বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রাম, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও লোকাচারের গৌরবময় ইতিহাস।