সফল নারী উদ্যোক্তা আশা

নারীর পদচারণা এখন সবখানে। নারীরা এখন শুধু রান্নাঘর আর চুল বাঁধা নিয়ে ব্যস্ত থাকে না। গাড়ি থেকে শুরু করে রাষ্ট্রযন্ত্র চালাচ্ছেন নারীরা। কিন্তু কৃষিতে বিপ্লব ঘটাতে ভালো বীজের উদ্যোক্তা হিসেবে নারীর সন্ধান অনেকটা বিরল। আর এ কাজটি করে কৃষিতে অবদান রেখেছেন, আশা জাগিয়েছে কৃষকের। পেয়েছেন সামাজিক মর্যাদা, পেয়েছেন আর্থিক সচ্ছলতাও। তিনি হলেন নাসরিন নাহার আশা। আশা উৎসব সিড ফার্মের নির্বাহী পরিচালক। উৎসব সিড ফার্মের প্রধান কার্যালয় যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার গদখালীতে।
নাসরিন নাহার আশা সমাজবিজ্ঞানে সম্মানসহ স্নাতক পাস করে বিএড করা এই নারী একযুগের ও বেশি সময় ধরে বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থায় চাকরি করেছেন। ২০০৬ সালে তিনি নিজ উদ্যোগে স্বামীর প্রেরণায় উৎসব সিড ফার্ম প্রতিষ্ঠা করেন। শুরু হয় কৃষি আর কৃষকের ভাগ্যোন্নয়নে আশার নিরন্তন পথচলা। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়নে করপোরেশনের (বিএডিসি) দপ্তর গাজীপুর থেকে প্রজনন বীজ সংগ্রহ করে শুরু হয় বীজ উৎপাদন। এ বীজ ব্যবহার করে কৃষকরা বাম্পার ফলন পাওয়ায় বাড়ে তার বীজের কদর। বর্তমান তার ২৫ জন চুক্তিবদ্ধ কৃষক রয়েছে। যার মধ্যে ২০ জন কৃষক ধানবীজ, পাঁচজন কৃষক আলুবীজ ও তিনি নিজে ফুলবীজ উৎপাদন করে থাকেন। উৎপাদিত বীজের মধ্যে ব্রি-২৮, ব্রি-৫০, ব্রি-৬২, ব্রি-৫১/৫২/৫৭ ধানবীজ, ডায়মন্ড, কার্টিনাল, আলুবীজ ও গ্লাডিওলাস এবং রজনীগন্ধা ফুলের বীজ উল্লেখযোগ্য। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ১২ টন বিভিন্ন জাতের ধানবীজ বিক্রি করেছে আশার উৎসব সিড ফার্ম। যার মধ্যে ব্রি-৫০ (বাংলামতি) আট টন ও ব্রি-২৮সহ অন্যান্য ধান আট টন। উপজেলার গদখালী এলাকার মেঠোপাড়ার গ্রামের আজিজুর রহমান, হাড়িয়া গ্রামের আবুল হোসেন ও নারাঙ্গালী গ্রামের আব্দুর রশিদ জানান, উৎসব সিড ফার্মের ব্রি-২৮ ধানের বীজে তারা ২৮ থেকে ৩০ মণ ধান ফলিয়েছেন প্রতি বিঘায়।
নাসরিন নাহার আশা শুধু নিজে বীজের উদ্যোক্তা হিসেবে নেই। কৃষিতে রীতিমতো বিপ্লব ঘটাতে কৃষিকে নারী অংশীদারিত্বের জন্য গড়ে তুলেছেন উৎসব অ্যাগ্রো মহিলা সমবায় সমিতি। সমিতিতে সদস্য আছেন ২০০ জন নারী। প্রতিমাসে শেষ শুক্রবার সমিতির সদস্যদের সঙ্গে বীজ সংরক্ষণ ও চাষাবাদ সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। তাছাড়া নারী স্বাস্থ্য ও বাল্য বিবাহেরও আলোচনা করা হয় নিয়মিত। আশা জানান, তার সমিতির সব সদস্যের বাড়িতে দেশি হাঁস-মুরগি থাকা বাধ্যতামূলক। কৃষিতে বিশেষ অবদানের জন্য এই নারী উদ্যোক্তাকে ২০১২ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক পুরস্কৃৃত করে। একই সালে ইন্টারন্যাশনাল রাইস রিসার্চ ইন্সটিটিউট (ইরি) তাকে নেপাল সফর করান। সে সময়ে তাকে নিয়ে বেসরকারি একটি টেলিভিশন, বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বিবিসি বাংলার অনুষ্ঠানে বিশেষ অনুষ্ঠান প্রচার করেন। ২০১৩ সালে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সিডিসিএস কৃষি উদ্যোক্তা হিসেবে অ্যাওয়ার্ড প্রদান করে। সর্বশেষ গত সেপ্টেম্বর মাসে ভারতের তিনটি রাজ্যে ১১ দিনের প্রশিক্ষণ ও পরিদর্শন করেন। ডিএআই ও বিএফএসের উদ্যোগে।
নাসরিন নাহার আশা ব্যক্তিগত দুই পুত্রসন্তানের জননী। স্বামী যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার পানিসারা গ্রামের আব্দুর রহিম। তিনিও কৃষি নিয়ে কাজ করেন ও উদ্যোক্তা। আব্দুর রহিম বাংলাদেশ ফ্লাওয়ার সোসাইটি (বিএফএস) এবং গদখালী ফুলচাষি ও ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সভাপতি। নাসরিন নাহার আশার স্বপ্ন ভবিষ্যতে তার ফার্মটি যেন জাতীয়পর্যায় ভালো বীজ উৎপাদন করে দেশের কৃষিতে বিশেষ অবদান রাখতে পারে। দেশের সব নারী হোক স্বাবলম্বী। অধিকার প্রতিষ্ঠায় নারীরা আরও সোচ্ছার হোক। সরকারের দৃষ্টি হোক আরও সুদৃঢ় নারী অধিকারে।