দাও দাও সূর্য এনে দাও

উদার আকাশ আর বিস্তীর্ণ প্রান্তরে দাঁড়িয়ে বাংলার মানুষ আলোকিত জীবনকে যেন খুঁজে পেতে যাচ্ছে। শ্মশান হয়ে যাওয়া একদা সোনায় মোড়ানো বাংলাকে ফিরে পাওয়ার জন্য ষাট দশক থেকে বাঙালী রক্ত ঝরিয়েছে। সোনার বাংলা গড়ে তোলার যে স্বপ্ন স্বাধীনতার পর দেখেছে, পঁচাত্তরের পনেরোই আগস্ট সে স্বপ্ন কোথা থেকে যেন কিভাবে মিলিয়ে গেছে, তা নয়। সোনার বাংলা যাতে হতে না পারে, তার জন্য দেশী-বিদেশী নানামহল নানাভাবে তৎপরতা চালিয়েছে। সেসব ইতিহাস আর সময়ের দলিলে লিপিবদ্ধ রয়েছে। অনাহারে, অর্ধাহারে দিনাতিপাত করা বাঙালী জীবন আর এখন নেই। মাঠে মাঠে ফসল ফলে, সোনালি ধানের হাসির ছটা কৃষকের মুখে আনে স্বস্তি, শান্তি। শ্রমজীবী মানুষের জন্য দেশ ছাড়িয়ে বিদেশে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র যত বিস্তৃত হচ্ছে, ততই মানবসম্পদ যথাযথ ব্যবহারের পথ সুগম হচ্ছে। আলস্য ‘জাতি’ এ কথা বাঙালীর ঘুচে গেছে সেই একাত্তর সালে। যখন অস্ত্র হাতে পাকিস্তানী হানাদার ও তার সহযোগী রাজাকার, আলবদর ও আল শামসের বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধ করে স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনতে পেরেছিল। বাঙালী এখন পরিশ্রমী জাতি হিসেবে নিজের অবস্থান তৈরি করতে পেরেছে। এটা সম্ভব হয়েছে, কাজের সুযোগ তৈরি হওয়ায়। বেকারত্বের যে অভিশাপ বাঙালীকে বয়ে বেড়াতে হয়েছে দীর্ঘদিন, তা থেকে মুক্তির পথগুলো একে একে সামনে এসে দাঁড়াচ্ছে। স্বদেশ ছাড়িয়ে বাঙালী এখন বিদেশ বিভূঁইয়ে নিজেদের কর্মদক্ষতা, কর্মকুশলতা, যোগ্যতা, সততা, পেশাদারিত্বের পরিচয় দিতে পারছে, এটা কম কথা নয়। গেঁয়ো বা ভেতো বাঙালী বলে এ যুগে আর কিছু নেই। শব্দগুলো বিলুপ্ত প্রায়। বাংলার গ্রামের মানুষরা অন্ধ কুসংস্কার, অশিক্ষা, কুশিক্ষার ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে আলো আর আলোকিত জগতের সন্ধান পেয়েছে। বিদ্যুতের আলো গ্রামের অন্ধকার মুছে দিতে পেরেছে শুধু নয়, নানা কলকারখানাও গড়ে উঠেছে। মানুষ তথা নারী-পুরুষ নির্বিশেষে হয়ে উঠছে কর্মক্ষম। নারী নেতৃত্বও বিকশিত হচ্ছে। ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়ে তারা দক্ষতা প্রদর্শন করতে পারছে শুধু নয়, নারীর ক্ষমতায়নকে যেমন প্রতিষ্ঠিত করছে, তেমনি গ্রামীণ নারীর জীবনে আলোর মশাল জ্বেলে দিয়েছে। অবগুণ্ঠন থেকে বেরিয়ে এসব নারী এখন নিজেরা রোজগার যেমন করছে, তেমনি সাবলম্বী হয়ে উঠছে। গ্রামীণ অবকাঠামো আধুনিকায়ন হওয়ার কারণে যোগাযোগ পরোক্ষভাবে ক্রমশ উন্নত হচ্ছে, দুর্গম অঞ্চল বলে এযুগে আর কিছু নেই। পার্বত্যাঞ্চলের অধিবাসীদের জীবনে যে আলোক রশ্মি প্রজ্বলিত হচ্ছে তার নেপথ্যে বহু পরিকল্পনা কত শ্রম ও কর্মদক্ষতার যোগসূত্র রয়েছে। শান্তি চুক্তির পর পার্বত্য জনপদ হিংস্রতা, হানাহানি মুক্ত হয়ে নিরাপদ অঞ্চলে পরিণত হয়েছে। বাঙালী তথা বাংলাদেশের জন্য এসব ঘটনাই ইতিবাচক। সোনার বাংলা গড়ার জন্য এই পথই বাঙালীর অভিপ্রায়। সবার মৌলিক অধিকারগুলো পূরণ হলেই বাঙালী আবার ফিরে পাবে তার স্বর্ণযুগ। আর সেই যুগ অর্জনের নেতৃত্ব পেয়ে গেছে বাঙালী। কাক্সিক্ষত বাংলার কণ্ঠস্বর আজ পেয়েছে বাঙালী। তার সব কথা, সব গান, সব সুর, সব আকুতি, আশা-আকাক্সক্ষা, চিন্তা-ভাবনা ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হচ্ছে বিশ্ব দরবারে একটি কণ্ঠ। যে কণ্ঠনিসৃত ধ্বনি বাঙালীকে বিশ্ব দরবারে নিয়ে গেছে নতুন আবাহনে। তাই জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দাঁড়িয়ে সোচ্চার কণ্ঠে বলতে পারেন বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতি ‘এক মানবতার জন্য কাজ করার উদ্দেশ্যে আমরা সবাই এখানে সমবেত হয়েছি। মতের ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও আসুন আমরা মানবতার স্বার্থে সবাই অভিন্ন অবস্থানে উপনীত হই। এবং বিশ্ব থেকে সংঘাত দূর করে শান্তির পথে এগিয়ে যাই।’ এই উচ্চারণ তাকেই মানায়। কারণ শিক্ষা জীবনেই তিনি শিক্ষা শান্তি প্রগতির নামে মুজিবের সৈনিকে পরিণত হয়েছিলেন। তাই দেশ শাসনকালেও তিনি শিক্ষা, শান্তি, প্রগতির চর্চাকে অব্যাহত রেখেছেন। এই তিন মূলমন্ত্র ছিল তার ছাত্র রাজনীতির প্রধান শক্তি। আর সেই শক্তিমত্তা তাকে জাতির নেতৃত্ব প্রদানে এক যুগান্তকারী সফলতার দিকে টেনে নিচ্ছে। জাতীয় রাজনীতিতে তিনি ঐক্যকে প্রাধান্য দিয়েছেন। সমমনা ও দেশপ্রেমিক এবং স্বাধীনতা ও মুক্তিকামীদের সঙ্গে ঐক্য গড়ে তোলার মাধ্যমে জাতির চেতনাকে একটি মানদ-ে দাঁড় করাতে সচেষ্ট। একদা যারা তার সমালোচনা করতেন, তাদের একটা বড় অংশই তার নেতৃত্বের প্রশংসায় এখন পঞ্চমুখ শুধু নয়, তার নির্দেশিত পথ বেয়ে দেশ গড়ার কাজ করে যাচ্ছে নিরলসভাবে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে শেখ হাসিনা যে পথ-নির্দেশ প্রদান করেছেন, তাতে জঙ্গীবাদ দমন হওয়ার সম্ভাবনা ব্যাপক। নিজেও সন্ত্রাসী হামলার শিকার হওয়া শেখ হাসিনা বিশ্বনেতাদের স্পষ্ট করেছেন যে, সন্ত্রাসীদের কোন ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নেই। এদের সর্বোতভাবে সমূলে উৎপাটন করার সঙ্কল্পে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। জঙ্গীদের অর্থ ও অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ, পরামর্শদাতা, মদদদাতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া গেলে জঙ্গীবাদ দমন হবে। বাংলাদেশের ভূখ- থেকে আঞ্চলিক সন্ত্রাসীদের কার্যক্রম নির্মূল করার ক্ষেত্রে শেখ হাসিনার সরকার সাফল্য দেখিয়েছে।

শোষণ ও বঞ্চনার অবসানে ও অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক মুক্তির লক্ষ্যে বাংলার মানুষ দীর্ঘদিন আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন পরম আরাধ্য নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে। সোনার বাংলার স্বপ্নটা তিনি জাতির মধ্যে সঞ্চারিত করতে পেরেছিলেন। নিজ জাতির প্রতি ভালবাসা ছিল অপরিসীম। তাই স্বাধীনতার বীজ ও মন্ত্র তিনি ছড়িয়ে দিয়েছিলেন বাঙালীর অন্তরে। সুখী-সমৃদ্ধ সোনার বাংলাদেশ চেয়েছিলেন তিনি। একটি জাতিসত্তাকে দীর্ঘ নিষ্পেষণ, বঞ্চনা, শোষণ, গ্লানি, মৌলিক অধিকার বঞ্চিত অবস্থা থেকে উত্তরণে পাড়ি দিয়েছেন বহু চড়াই-উতরাই। বন্ধুর পথ ভেঙ্গে মুক্তির সরণিতে নিতে পেরেছিলেন। গণমানুষের নায়ক হিসেবে এমন অবস্থা ও অবস্থান তৈরি করেছিলেন যে, তাঁর অঙ্গুলি হেলনে পুরো জাতি নেমে এসেছিল সংগ্রামের ধারায়। রণাঙ্গনে সশস্ত্র লড়াইয়ে বিজয়ের গৌরবগাথা রচনা করেছিলেন। বাঙালি প্রথম তার নিজস্ব সত্তার প্রকাশ ঘটায়নি শুধু নিজস্ব স্বাধীন ভূখ-, লাল-সবুজের পতাকা এবং আমার সোনার বাংলার মতো জাতীয় সঙ্গীতকে সে আপনার অন্তরে বেঁধেছিল। বন্ধনের মধ্যেও তাঁর স্বতঃস্ফূর্ত জাগরণ ঘটেছিল বলেই বাঙালী শত প্রতিকূলতা ও ঝড়ঝঞ্ঝার মধ্যেও দুর্গম পথ পাড়ি দিয়েছে। বাঙালী তার আপন সত্তার টানে দেশপ্রেমের মহিমায় মুক্তির মন্দির সোপান তলে প্রাণ বলিদানে পিছপা হয়নি। শক্ত বাঁধন টুঁটে রাঙা সূর্যকে এনেছিল ৫৬ হাজার বর্গমাইলের আকাশজুড়ে। চন্দ্রালোকে মিশে গিয়েছিল বাংলার রূপ অনন্তর সবুজ মাঠ পেরিয়ে। বঙ্গবন্ধুর উদাত্ত আহ্বান ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হয়েছিল বিশ্বজুড়েই। বঙ্গবন্ধু চেয়েছিলেন শান্তি ও কল্যাণ। ১৯৭৪ সালে জাতিসংঘে বাংলাভাষায় প্রথম প্রদত্ত ভাষণে বলেছিলেনÑ ‘শান্তির প্রতি যে আমাদের পূর্ণ আনুগত্য, তা এই উপলব্ধি থেকে জন্মেছে যে, একমাত্র শান্তিপূর্ণ পরিবেশেই আমরা ক্ষুধা-দারিদ্র্য, রোগ-শোক, অশিক্ষা ও বেকারত্বের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার জন্য আমাদের সকল সম্পদ ও শক্তি নিয়োগ করতে সক্ষম হব।’ ৪২ বছর পর বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার কণ্ঠে এই জাতিসংঘে এবারও ধ্বনিত হলো ‘শান্তির সংস্কৃতি’ বিস্তারের আহ্বান। বলেছেনÑ ‘শান্তিরক্ষা এবং শান্তি প্রতিষ্ঠায় আমাদের অবদান অব্যাহত থাকবে। ঢাকায় ‘শান্তি প্রতিষ্ঠা কেন্দ্র’ স্থাপনের সিদ্ধান্ত সহিংসতার কবল থেকে বেরিয়ে আসা দেশগুলোর সঙ্গে আমাদের অভিজ্ঞতা বিনিময়ে সুযোগ করে দেবে।’ ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি দেশে ফিরে বঙ্গবন্ধু যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্বারোপ করেছিলেন। বিশ্বশান্তি পরিষদ বঙ্গবন্ধুকে সর্বোচ্চ সম্মান ‘জুলিও কুরি’ পদক দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু রেসকোর্স ময়দানে জনসভায় রবীন্দ্রনাথকে উদ্ধৃত করে বলেছিলেনÑ ‘চারিদিকে নাগিনীরা ফেলিতেছে দীর্ঘ নিঃশ্বাস/ শান্তির ললিত বাণী শোনাইবে ব্যর্থ পরিহাস।’ বঙ্গবন্ধুর উচ্চারণ সঠিক ছিল। পরাজিত শক্তি শান্তি চায়নি। দেশে অশান্তির পরিবেশ তৈরি করে অরাজক পরিস্থিতির বিস্তার ঘটাতে চেয়েছিল, এই শক্তি এখনও সক্রিয়। তারা দেশে জঙ্গী ও সন্ত্রাসবাদের বিস্তার ঘটিয়েছে। শেখ হাসিনা কঠোর হস্তে তা দমনও করেছেন। সারাবিশ্ব আজ জঙ্গীবাদের করাল থাবার মুখে।

জাতিসংঘে শেখ হাসিনা এবার যে ভাষণ দিয়েছেন, তাতে বিশ্ব নেতৃত্বের কণ্ঠস্বরই ফুটে ওঠেছে। আন্তর্জাতিক পরিম-লে দাঁড়িয়ে সারাবিশ্বের মানুষকে শান্তি, প্রগতি ও ঐক্যের পক্ষে এক কাতারে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়ে তিনি প্রমাণ করলেন স্বাদেশিকতা থেকে আন্তর্জাতিকতায় উত্তীর্ণ হয়ে বিশ্ব মানবের নেতৃত্বের কণ্ঠস্বরে পরিণত হয়েছেন। নিজেকে সেই স্তরে উন্নীত করেছেন, যে স্তরে তিনি বিশ্ববাসীর জন্য নতুন দিক-নির্দেশনাও দিয়েছেন। সারাবিশ্ব আজ নানান ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে রোল মডেল হিসেবে অনুসরণ করছে। ষোলো কোটি মানুষের দেশকে তিনি যে স্তরে ক্রমশ উন্নীত করছেন, তাতে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে বাংলাদেশ সোনার বাংলায় রূপান্তরিত হওয়ার সম্ভাবনা উজ্জ্বল করে তুলছেন।

হতদরিদ্র বাংলা ও বাঙালীকে শেখ হাসিনা সচ্ছলতায় উত্তীর্ণ করে সমাজ-প্রগতির ঝা-া উর্ধে তুলে ধরে এক নতুন বিশ্বকে তুলে আনছেন। যে বিশ্ব হবে সাহসী বিশ্ব। ‘বাঙালী আজ যা ভাবে সারা ভারত তা কাল ভাবে’ বলে ব্রিটিশ শাসক যুগে কংগ্রেস নেতা গোখলে যে কথা বলেছিলেন, তাকে অনুসরণ করে বলা যায়Ñ ‘শেখ হাসিনা আজ যা ভাবেন ও বলেন, সারাবিশ্ব কাল তা উপলব্ধি করে।’ সাড়ে সাত কোটি মানুষের নেতা ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। আর আজ ষোলো কোটি মানুষের নেতা তাঁরই কন্যা। পিতার স্বপ্নকে বাস্তবায়নে দ্রুতগতিতে কর্মকুশলতা, দক্ষতা, যোগ্যতায় বিশ্ব নেতৃত্বের পাশে অবস্থান নিয়েছেন। বাঙালী জাতির জন্য এ এক পরম প্রাপ্তি। বঞ্চিত জাতি আজ প্রগতির পথে শাণিত হয়ে উঠছে। শেখ হাসিনা মানুষের মনে আলোর যে বিচ্ছুরণ ঘটিয়ে চলেছেন, তা একদিন সারাবিশ্বকে আলোকিত করবে। আর তাই বাঙালী কবির মতো আবেদন করা যায় শেখ হাসিনার কাছেÑ ‘দাও, দাও, সূর্য এনে দাও।’ সেই সূর্যের আলোয় শুধু বাংলাদেশ নয়, সারাবিশ্ব আলোকিত হোক মানব-প্রগতির উত্থানে।