পারুলের কৃষি বিপ্লব

বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার রায়হানপুর ইউনিয়নের গুদিঘাটা গ্রামের হানিফ হাওলাদারের স্ত্রী পারুল বেগম কৃষিবান্ধব নারী হিসেবে নীরবে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে চলেছেন।

বসতবাড়ির আঙিনা ও পুকুর পাড় জুড়ে নানা মৌসুমি সবজি আর পুকর ভরা মাছের আবাদ। সে সঙ্গে গবাদিপশু ও হাঁস মুরগি প্রতিপালন করে এখন স্বাবলম্বী। পারুলের বাড়ি দৃশ্যত এক খামার বাড়ি। নিভৃত পল্লীতে সশিক্ষিত পারুল এক সফল কৃষাণী উদ্যোক্তা। যা গায়ের যে কোনো সাধারণ নারীর জন্য দৃষ্টান্ত হতে পারে। জানা গেছে, ১৭ বছর আগে বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার বড় গুদিঘাটা গ্রামের মরহুম সিকান্দার আলীর ছেলে হানিফ হাওলাদারের সঙ্গে পারিবারিকভাবে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয় পারুল বেগম।

বিয়ের পর কয়েক বছর স্বামীর সংসারে অভাব-অনটনের মধ্যে থাকলেও সংসার জীবনে সুখ ছিল তার। এভাবে কাটে বছর পাঁচেক। হঠাৎ শ্বশুর-শাশুড়ির আবদার নাতি-নাতির। পরিবারের স্বজনরা নিশ্চিত হন পারুল আসলে বন্ধ্যা।অপয়া, অলক্ষী আর বন্ধ্যা নারীর অপবাদ সইতে না পেরে স্বামীর সংসার ছেড়ে নীরবে চলে যায় ঢাকায়। সেখানে একজন পরিচিত আত্মীয়ার সহায়তায় চাকরি নেন একটি পোশাক কারখানায়। এভাবে বছরখানেক চাকরি করেন পারুল। এরপর ভাইদের অনুরোধে বাবার বাড়িতে ফিরিয়ে আসেন।

সেখানে পারুলের মা তাকে ২০ শতাংশ জমি রেজিস্ট্রি করে দেয় পারুলকে। নিজের চাকরির কিছু উপার্জন সম্বল নিয়ে ভাইদের সহায়তায় সে জমিতে একটি মাথা গোঁজার ঠাঁই হয়। নিজ হাতে মাটি কেটে পুকুর ও সবজির ক্ষেত তৈরি করেন। কোনো প্রকার সরকারি বা বেসরকারি সহায়তা না নিয়েই তিনি প্রথমে তার উপার্জনের ৩০ হাজার টাকা দিয়ে চিংড়িসহ দেশীয় প্রজাতির মাছের চাষ শুরু করেন। আর পুকুরের পাড়ে রোপণ করেন বিভিন্ন প্রকার সবজি। প্রথমবারে মাছ আর সবজি বিক্রি করে ৬০ হাজার টাকা লাভ হয়। এরপর ঘূর্ণিঝড় সিডরে লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় তার সাজানো স্বপ্ন। লক্ষাধিক টাকার মাছ ভেসে যায় জোয়ারে। অক‚ল পাথারে পড়ে যায় পারুল। দ্বারে দ্বারে ঘুরেও সে সময় কোনো সহায়তা মেলেনি তার। আবারো তার পাশে আসেন আপন ভাইয়েরা। কয়েকদিন পরে স্বামী হানিফ হাওলাদারও তাকে সহায়তা করতে এগিয়ে আসেন।

স্বামী আর ভাইরা তাকে আর্থিক সহায়তা দিয়ে আবারো উৎসাহিত করে মাছ চাষে। সবারই সহায়তায় পুনরায় জীবন গড়তে শুরু করেন পারুল। এরপর আর তাকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। স্বামী হানিফ হাওলাদার এখন তার কাছেই থাকেন। হানিফ কৃষি কাজের পাশাপাশি মেশিন মেকানিকের কাজ করেন। আর পারুল হাঁস, মুরগি ও মাছের খাবার দেয়াসহ সবজি ক্ষেতের সব কাজ একাই করেন। তার বাড়ির চারপাশে চলতি মৌসুমে সিম, বরবটি, কপি, লাউ, করলা, কুমড়াসহ বিভিন্ন প্রজাতির শীতকালীন সবজির আবাদ করেছেন। এ ছাড়াও পুকুরে মাছ চাষের পাশাপাশি পারুল তিনটি গাভী, ১৭টি দেশি হাঁস, ১৮টি রাজহাঁস ও ২৪টি মুরগি পালন করছেন। সবজি ক্ষেতের পরিচর্যা, হাঁস-মুরগি পালন করে সারাক্ষণ কাজের মধ্যে থেকে সন্তানের অভাব ভোলার চেষ্টা করে পারুল। অভাব নামের শব্দটি এখন তাদের জীবনে নেই বললেই চলে। পারুল বেগম জানান, জমির ফসল আমার সন্তানের মতোই। সেভাবেই কৃষি আমি লালন করি। এ ব্যাপারে স্থানীয় রায়হানপুর মাদারতলী কৃষি ব্লুকের উপসহকারী কর্মকর্তা অসীম বিশ্বাস বলেন, পারুল বেগম আত্মপ্রত্যয়ী একজন নারী। নিজ প্রচেষ্টায় তার বসতবাড়িটি একটি আদর্শ কৃষি খামার হিসেবে তিনি গড়ে তুলেছেন। তার প্রেরণায় অনুপ্রাণিত হয়ে মাদারতলী গ্রামের আরো অনেক নারী এখন স্বাবলম্বী হওয়ার চেষ্টা করছে। য় অন্যপক্ষ ডেস্ক