শেখ হাসিনার অভিযাত্রা

১৯৪৭ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর, শেখ হাসিনার জন্মদিন। বছরটি রাজনৈতিকভাবে ছিল দুর্যোগপূর্ণ। সাম্প্রদায়িক-রক্তাক্ত দাঙার ভেতর দিয়ে ভারত বিভাজন ঘটে। ১৯৮১ সালের ১৭ মে, যেদিন শেখ হাসিনা বাংলাদেশে পদার্পণ করলেন, সেদিনও বাংলাদেশের আবহাওয়া ছিল দুর্যোগপূর্ণ, আকাশ ছিল মেঘলা, গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছিল। তখন সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান ক্ষমতায়; তিনি ছিলেন ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের রক্তাক্ত ঘটনার নেপথ্য নায়ক। লাখ লাখ জনগণ বিমানবন্দরে গিয়েছিল শেখ হাসিনাকে হৃদয়ের সুগভীর ভালোবাসা জানাতে। তিনি তখন কাঁদছিলেন। আকাশের কান্না আর শেখ হাসিনার কান্না এক হয়ে যাচ্ছিল। ইংরেজ কবি বলেছেন ‘প্যাথেটিক ফ্যালাসি’।
১৯৮১ সালের ১৭ মে’র আগে শেখ হাসিনা যতটুকু রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন সেটা শেখ হাসিনার রাজনৈতিক অভিযাত্রার পর্যায় পড়ে না। তার যাত্রা শুরু হয়েছে ১৯৮১ সালের ১৭ মে থেকে, স্বাধীনতার নেতৃত্বদানকারী দল, ঐতিহ্যবাহী আওয়ামী লীগের সভানেত্রীর দায়িত্ব নিয়ে। আওয়ামী লীগকে বঙ্গবন্ধু নিজের মতো করে গড়ে তুলেছিলেন। না হলে বাংলাদেশ স্বাধীন করতে পারতেন না। ১৯৫৭ সালে মন্ত্রিত্ব ছেড়ে দিয়ে দলের সাধারণ সম্পাদকের পদ আঁকড়ে ধরে রেখেছিলেন, না হলে অলি আহাদ সাধারণ সম্পাদক হতেন, তাতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা গোল্লায় যেত। শেখ হাসিনাও আওয়ামী লীগকে নিজের মতো করে পুনর্গঠিত করে গড়ে তুলেছেন। বঙ্গবন্ধবিহীন, জেলখানায় নিহত চার জাতীয় নেতাবিহীন, শেখ ফজলুল হক মনিবিহীন আওয়ামী লীগকে শেখ হাসিনা মেরুদণ্ডশীল করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার করেছেন। ১৫ আগস্টের পরে এবং শাহ আজিজ প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর বাংলাদেশের স্বাধীনতা বলতে আর কিছু ছিল না। স্বাধীনতা যদি একটি মূল্যবোধের নাম হয়ে থাকে তাহলে সেটা জিয়াউর রহমান শেষ করে দিয়েছিলেন। স্বাধীনতার ম্যান্ডেটটা তিনি বিধ্বস্ত করেছিলেন। ৩০ লাখ শহীদের আত্মদানকে ভিত্তি করে যে সংবিধান রচিত হয়েছিল তার পরিবর্তন ঘটিয়েছিলেন। স্বাধীনতার প্রতিপক্ষ শক্তিকে স্পেস দেয়ার জন্য মুক্তিযুদ্ধের বিকল্প চেতনা শুধু উপস্থাপন করেননি, তাকে সাংবিধানিক রূপ দেন। জিন্নাহ যেমন ধার্মিক ছিলেন না, তেমনি জিয়াও ধার্মিক ছিলেন না। জিয়া জিন্নাহরই পদাঙ্ক অনুসারী। উভয়ই ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতাকে রাজনীতির ভিত্তি করেছিলেন। বাংলার মাটিতে জিয়া জিন্নাহর দ্বি-জাতিতত্ত্ব সার্থকভাবে পুনপ্রবর্তন করেন। বাংলাদেশকে তিনি পেছন দিকে ঠেলতে ঠেলতে ১৯৪৭ সালের কেনারে দাঁড় করিয়েছিলেন। এই প্রেক্ষাপটে শেখ হাসিনা বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। এখান থেকেই শেখ হাসিনার অভিযাত্রা।
জিয়াউর রহমান বাঙালি জাতীয়তাবাদ বিসর্জন দিয়েছিলেন। একটা ফরমান জারি করে বালাদেশি জাতীয়তাবাদ নামক কৃত্রিম জাতীয়তাবাদের জন্ম দেন। এটা ছিল জিয়ার কালো চশমার রাজনীতি। শেখ হাসিনা রাজনীতিটা শুরু করেন জিয়ার অপরাজনীতির বিরুদ্ধে। জিয়া ১৯৮১ সালের ৩১ মে সামরিক অভ্যুত্থানে মারা গেলেও রেখে গিয়েছিলেন কালো চশমার রাজনীতি। শেখ হাসিনা আজো কালো চশমার রাজনীতির বিরুদ্ধে লড়াই করছেন। শেখ হাসিনার চারিত্রিক দৃঢ়তা খুঁজতে হবে কালো চশমার রাজনীতির বিপক্ষ রাজনীতির নেত্রী হিসেবে। তাই শেখ হাসিনার চলার পথটা কখনো বিন্দুমাত্র কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। আজো নেই। ১৯৮১ সাল থেকে কঠিন পথে হাঁটছেন, সে পথ মসৃণ হয়নি। তিনি বাংলাদেশে পা দিয়ে পিতার দোহাই দিয়ে সোজা ক্ষমতায় চলে গিয়েছেন, এমন নয়। ২১ বছর কঠিন লড়াই করে ক্ষমতায় যেতে পেরেছিলেন। তার লড়াইটা শুধু ক্ষমতায় যাওয়ার লড়াই ছিল না; যদিও তিনি ক্ষমতায় না এলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা বলতে কিছু থাকত না। সাকা চৌধুরী, নিজামী-মুজাহিদদের গাড়িতে যদি জাতীয় পতাকা শোভা পায় তাহলে স্বাধীনতার আর কী থাকে বলুন?
কমপক্ষে ২০ বার শেখ হাসিনাকে প্রাণে মেরে ফেলবার ভয়ঙ্কর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তিনি স্বাধীনতার প্রতীক, বাঙালি কালচারের প্রতীক, মুক্তবুদ্ধি, মুক্তিযুদ্ধের আর ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতীক। এসব কিছুই থাকত না তিনি বাংলাদেশে না এলে। কখনো কখনো ভুল পদক্ষেপ নিয়েছেন, আবার সে ভুল থেকে উঠে দাঁড়িয়েছেন। ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে অংশ নিয়ে তিনি বিপাকে পড়েছিলেন। আবার সেই সংসদ থেকে বের হয়ে বিএনপির সঙ্গে জোট করে এরশাদের পতন ঘটালেন। কিন্তু তিনি ১৯৯১ সালের নির্বাচনে জয়ী হতে পারেননি। ছিয়াশির নির্বাচনে অংশ নিয়ে তিনি এই খেসারত দিলেন। ১৯৯১-এর নির্বাচনের পর ড. কামাল হোসেনের বৈরী আচরণ তাকে কঠিন অবস্থার মধ্যে ফেলে দিয়েছিল। তিনি মনের কষ্টে আওয়ামী লীগের সভাপতির পদ থেকে পদত্যাগও করেছিলেন। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা কাঁদতে কাঁদতে ৩২ নম্বরে হাজির হলে তিনি সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে বাধ্য হন। জননেতা আব্দুর রাজ্জাক যখন দলের প্রভাবশালী সাধারণ সম্পাদক হয়ে আলাদা দল করলেন, তারও একটা ধকল তাকে পোহাতে হয়েছে। এরপর কাদের সিদ্দিকী তার লাগাতার বিরোধিতা করতে লাগলেন। তাকেও সামাল দিয়েছেন। সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে সংস্কারপন্থার নামে অত্যন্ত প্রভাশালী ৪ নেতা তার পিবক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। তার ধকলও তিনি সামাল দিয়েছেন। সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতা থেকে নামতে চায়নি, অসাংবিধানিকভাবে ক্ষমতা ধরে রাখতে চেয়েছিল, বিরাজনৈতিক প্রক্রিয়া শুরু করেছিল। সেনাদের প্রশ্রয়ে কিংসপার্টি গঠিত হয়েছিল। এসব নোংরামির বিরুদ্ধে একাই শেখ হাসিনা ঝুঁকি নিয়ে লড়াই করেছেন। ১৯৭০ সালে বঙ্গবন্ধু ইয়াহিয়া খানকে নির্বাচন দিতে বাধ্য করেছিলেন। শেখ হাসিনাও তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে নির্বাচন দিতে বাধ্য করেছিলেন। তখন খালেদা জিয়াকে তারা তেনম গোনায় ধরেননি। খুব সম্ভব তখন পুতুল সন্তান সম্ভাবা ছিলেন, শেখ হাসিনাকে তার কাছে বিদেশে যেতে দেয়া হয়নি। তার আগে শেখ হাসিনা বিদেশ সফরে গিয়েছিলেন, তার দেশে ফেরার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকার। শেখ হাসিনা তা মানেননি, তিনি অটল প্রতিজ্ঞায় শাণিত হয়ে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেছিলেন। কেউ রোধ করতে পারেনি। এই প্রতিজ্ঞার আয়নায় শেখ হাসিনাকে চিনতে হবে।
১৯৯৬ সাল থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত শেখ হাসিনা বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ছাড়া সুষ্ঠুভাবে দেশ পরিচালনা করেছিলেন। বিচারপতি সাহাবুদ্দিনের ওপর আস্থা রেখে ‘রাষ্ট্রপতি’র পদটিকে অরাজনৈতিক রাখতে চেয়েছিলেন, বিচারপতি তার মর্যাদা ভূলুণ্ঠিত করে বিএনপিকে ক্ষমতায় আনার ষড়যন্ত্রে অংশ নিয়েছিলেন। বিচারপতি সাহাবুদ্দিনকে রাষ্ট্রপতি বানানো শেখ হাসিনার দূরদর্শিতা প্রমাণিত হয়নি, আবেগের পরিচয়ই দিয়েছিলেন। রাজনীতিতে ‘প্লেইন জেন্টেলম্যান ইজ নট অ্যাট অল জেন্টেলম্যান’। পলিটিক্স মানে পলিসি। পলিসিতে ভুল করলে তার খেসারত দিতে হয়। ১৯৮৬-এর নির্বাচনে অংশ নেয়া ছিল ভুল পলিসি। এর খেসারত দিয়েছেন ১৯৯১ সালের নির্বাচনে। বিচারপতি সাহাবুদ্দিনকে রাষ্ট্রপতির পদে বসানো ছিল ভুল পলিসি। এর খেসারত তিনি দিয়েছেন ২০০১ সালের ১ অক্টোবরের নির্বাচনে। অক্টোবর পরবর্তী নিবার্চনে বড় মাপের বিপর্যয় নেমে এসেছিল শেখ হাসিনা ও তার দলের ওপর। একটানা ৭ বছর মরণপণ যুদ্ধ করতে হয়েছে শেখ হাসিনাকে। শেখ হাসিনার মাথা নোয়াবার জন্য অনেক বর্বরোচিত ঘটনা ঘটানো হয়েছে। ২০০১-এর অক্টোবর নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগের ২৬ হাজার নেতাকর্মীকে হত্যা করা হয়েছিল। নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা, সংখ্যালঘুরা, নৌকার ভোটাররা, মুক্তচিন্তার বুদ্ধিজীবীরা। শেখ হাসিনার নেতৃত্বের গুণে আওয়ামী লীগ উঠে দাঁড়িয়েছে ২০০১ পরবর্তী বিপর্যয় থেকে। মহাজোট গঠন করে ২০০৮-এর ডিসেম্বর মাসের নির্বাচনে জয়ী হওয়া শেখ হাসিনার বিরল কৃতিত্ব। সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার যে সময়টা শেখ হাসিনাকে গৃহবন্দি করে রাখলেন, এর চেয়ে বড় বিপর্যয় হিসেবে দেখা দিয়েছিল দলের ৪ জন বড় মাপের, নেতা শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে অনাস্থা দেয়াতে। তখন সেই বিপর্যয়ে দলের গাঁথুনি ঠিক রাখার জন্য বয়োবৃদ্ধ নেতা জিল্লুর রহমান, অগ্নিকন্যা মতিয়া চৌধুরী এবং বেগম সাজেদা চৌধুরী শেখ হাসিনাকে দৃঢ় সমর্থন জানিয়ে যাচ্ছিলেন। তৃণমূল থেকে তখন উচ্চারিত হয়েছিল, ‘১ লাখ নেতাকর্মী প্রস্তুত আছে শেখ হাসিনার জন্য জীবন উৎসর্গ করতে।’ এই প্রতিধ্বনি শোনার পর সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় থাকার দুরভিসন্ধি ত্যাগ করে।
২০০৯ সালে সরকার গঠন করার পর ২০১০ সাল থেকেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সিস্টেম নিয়ে বিএনপি-জামায়াতের সশস্ত্র হামলা শুরু হয়। শুরু হয় শিবিরের চোরাগোপ্তা হামলা। এর মধ্যেই শুরু হয় যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া। সেটাকে কেন্দ্র করে শুরু হয় জামায়াত-শিবিরের বোমাবাজি, অগ্নি সন্ত্রাস। ২০১৪ সালে জাতীয় নির্বাচন প্রতিহত করার জন্য বিএনপি জামায়াত-শিবির-হেফাজত একসঙ্গে মাঠে নামে। শুরু হয় হরতাল, ঘেরাও এবং পেট্রলবোমা দিয়ে মানুষ পেড়ানো। এসব শামাল দিয়েছেন শেখ হাসিনা, এখনো শামাল দিয়ে যাচ্ছেন জঙ্গিদের। এর ভেতর দিয়ে দেশের উন্নয়ন করে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত করেছেন দেশকে। জয়তু শেখ হাসিনা।
মাহমুদুল বাসার : কলাম লেখক।