হাওরবাসীর হাসি এনেছে হাঁস

হাঁস পালন করে হাসি ফুটেছে কিশোরগঞ্জের হাওরের ২৫ হাজার মানুষের মুখে। এ কর্মযজ্ঞে জড়িয়ে পড়েছেন অসংখ্য উদ্যমী যুবক। হাঁস বিপ্লব সাধনের পেছনে রয়েছেন হাওর উপজেলা নিকলীর কৃষকরা। গোটা হাওর এলাকা ছাড়াও ১৩টি উপজেলায় গড়ে উঠেছে ছোট, বড়, মাঝারি পাঁচ হাজারের বেশি হাঁসের খামার। এসব খামারে উৎপাদিত ডিম ও হাঁস রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা, নরসিংদী, হবিগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ হচ্ছে।

আশির দশকের শুরুতে হাওরাঞ্চলে বিচ্ছিন্নভাবে ছোট-বড় ২০ থেকে ৫০টি হাঁস নিয়ে খামার গড়ে তোলেন কয়েকজন। পরে ১৯৮৮ সালের দিকে নিকলীর নগর গ্রামের ইস্রাফিল, আলী হোসেন ও মনজিলহাটির নবী হোসেন_ এই তিন বন্ধু মিলে প্রথমে নিকলীর হাওরে হাঁসের খামার গড়েন, যা পরে ব্যাপকতা পেয়েছে। গোটা হাওরসহ আশপাশ এলাকায় তিন সহস্রাধিক খামারসহ সারা জেলায় পাঁচ হাজার হাঁসের খামার রয়েছে। বর্তমানে হাওরের প্রতিটি নদীতীরে ঘোরাউত্রা, ধনু, সোয়াইজনী, নরসুন্দা, কালনী, কুশিয়ারা, মেঘনাসহ অসংখ্য শাখা নদীতে একটু পরপর হাঁসের খামারগুলো গড়ে উঠেছে। হাওরাঞ্চলের খামারগুলো মূলত ডিম উৎপাদনের লক্ষ্যেই গড়ে উঠেছে।

সাধারণত ৫০০ থেকে শুরু করে ৩-৪ হাজার পর্যন্ত হাঁস থাকে একেকটি খামারে। প্রতিটি খামারে হাঁসগুলো দেখভাল করার জন্য ৫-৬ জনের লোকের প্রয়োজন হয়। নদীতে খাবারের সংকট দেখা দিলে খামারিরা প্রতিদিন এক হাজার হাঁসের খাবারের জন্য ৩০ খাঁচা শামুক কেনেন। প্রতি খাঁচা শামুক কিনতে হয় ৩০-৩৫ টাকায়। প্রতিদিন ডিম পাওয়া যায় ৯০০-এর মতো। বর্তমান বাজারদর হিসাবে ৯০০ ডিমের দাম প্রায় আট হাজার টাকা। মাসে গড়ে দুই লাখ ৪০ হাজার টাকার ডিম বিক্রি করা যায়। অর্থাৎ পরিচালন খরচ বাদ দিলে প্রতি মাসে প্রায় দুই লাখ টাকা লাভ করার সুযোগ রয়েছে।

খামারি ও ডিম ব্যবসায়ীদের হিসাব মতে, হাওরসহ আশপাশ এলাকার খামারগুলোতে দিনে আট লাখ ডিম উৎপাদন হয়। এখন প্রতিটি ডিম আট টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। মূলত ঢাকার ঠাটারিবাজার ও কারওয়ান বাজারসহ দেশের প্রধান প্রধান বাজারের পাইকাররা এসব ডিম কিনে নিয়ে যান।

সফল যারা :নিকলীর জিল্লু মিয়া বাবার কাছ থেকে ৩০ হাজার টাকা নেন। টাকা নিয়ে ২৫ হাজার টাকায় সিলেটের বানিয়াচং উপজেলা থেকে ৩০০ হাঁস কেনেন। বাকি পাঁচ হাজার টাকা হাতে রাখেন হাঁস লালন-পালনের জন্য। এক মাসের মাথায় ২৫০টি হাঁসই ডিম দিতে শুরু করে। ডিম বিক্রি করে প্রতিদিন ৪০০ টাকা তার হাতে আসতে থাকে। এক বছর পর বাবাকে ৩০ হাজার টাকা ফেরত দেন জিল্লু মিয়া। বছর দুয়েকের মধ্যে লাভের টাকা থেকে আরও এক হাজার হাঁস কেনেন তিনি। দ্রুত বড় হতে থাকে তার খামার। এখন তার খামারে চার হাজার হাঁস রয়েছে। খামারের প্রতিদিনের খরচ পাঁচ হাজার টাকা বাদ দিলেও গড়ে দৈনিক পাঁচ হাজার টাকা লাভ থাকছে তার।

জিল্লু মিয়া জানান, তারা একসময় খুব গরিব ছিলেন। অন্যের জমি বর্গা করতেন। হাঁসের খামার করে দিন বদলেছেন। জিল্লু মিয়া এখন দশ একর বোরো ধানের জমিসহ ২৫ লাখ টাকার মালিক। জানালেন, তিনি নিজে বেশি পড়াশোনা করতে পারেননি। নিজের দুই মেয়েকে পড়াশোনা করাচ্ছেন।

এ অবস্থা শুধু জিল্লু মিয়ার নয়, হাঁস পালন করে এরই মধ্যে নিজের অবস্থা ও অর্থনৈতিক অবস্থা সুদৃঢ় করেছেন ইটনা উপজেলার দীঘিরপাড়ের আবু সালেক, বড়হাটি গ্রামের আবু সাত্তার, অষ্টগ্রাম উপজেলার দেওঘর ইউনিয়নের সাদিয়া নগর গ্রামের নয়ন মিয়া, শাজাহান খাঁ ও নিকলী মহরকোনা গ্রামের হোসেন মিয়া।

বিশেষজ্ঞদের অভিমত :হাওর নিয়ে যারা কাজ করছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম সার্ক কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের কর্মকর্তা ড. নিয়াজ পাশা বলেন, ‘হাওরের মানুষ কার্যত ৬ মাস বেকার থাকেন। তাদের স্বাবলম্বী করে তোলার সহজ উপায় হাঁস পালন। এ ব্যাপারে বড় ধরনের সরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন। এরই মধ্যে গোটা হাওরে কয়েক হাজার হাঁসের খামারে প্রায় ১০-১২ হাজার মানুষ কাজ করছেন। হাওরে হাঁস পালনের বিকল্প নেই বলে মনে করি আমি।’

কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আবদুল মান্নান বলেন, ‘হাওরের সার্বিক হাঁস পালনের প্রয়োজনীয়তা এবং এই কৃষি শিল্পকে সারা হাওরে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য একটি হাঁস গবেষণা কেন্দ্র নির্মাণ সময়ের দাবি।’ ভৈরব উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা একই মন্তব্য করে বলেন, ‘সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা ও উদ্যোগ ব্যাপক হলে এ শিল্প অর্থনীতির চাকাকে আরও সচল করবে।

কিশোরগঞ্জ জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ আলী সমকালকে জানান, হাওরে হাঁস বিপ্লব সাধিত হয়েছে মূলত হাওর ও নদী থেকে প্রাকৃতিকভাবে খাবার সংগ্রহের কারণে। ওইসব খামারের হাঁস ৭০ ভাগ খাবারই প্রকৃতি থেকে পেয়ে থাকে। কর্মকর্তারা সীমিতভাবে বিভিন্ন ভ্যাকসিন দিয়ে থাকেন। যদিও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। এ জেলায় হাঁসের সংখ্যা রয়েছে ২১ লাখ ৪৮ হাজার। মোট ডিম উৎপাদন হচ্ছে প্রায় ৪৯ কোটি ৬৭ লাখ। চাহিদা রয়েছে ৩১ কোটি ৪৯ লাখ ডিমের। প্রায় ১৮ কোটি ডিম এ জেলায় উদ্বৃত্ত রয়েছে। জেলার প্রায় ২৫ হাজার মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে হাঁস শিল্পে শ্রম দিয়ে জীবন ও জীবিকা নির্বাহ করছেন।

জেলা প্রশাসক মো. আজিমুদ্দিন বিশ্বাস বলেন, ‘এ জেলায় যোগ দেওয়ার পর হাওরের উপজেলাগুলোতে গিয়ে হাঁসের বিচরণ এবং হাঁসের খামার দেখে অভিভূত হয়েছি। কারণ হাঁস তাদের খাবার জলাশয় থেকেই সংগ্রহ করে প্রয়োজন মতো খেতে পারে। তাতে খাদ্য খরচ নেই। তাই প্রতিদিন এই শিল্পে বেকার যুবকরা সম্পৃক্ত হয়ে তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন করছে, স্বাবলম্বী হচ্ছে।