খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি : গরিবের জন্য

সরকার জনবান্ধব হলে উপকার হয় দেশ ও দেশের আপামর মানুষের। আর সেই জনবান্ধব সরকারের প্রধান যদি হন জাতির জনকের কন্যা শেখ হাসিনা তাহলে তো কথাই নেই। এক অবিশ্বাস্য ঘটনা ঘটল সম্প্রতি। বঙ্গবন্ধু দীর্ঘ আন্দোলন, সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে জাতিকে স্বাধীন রাষ্ট্র উপহার দিলেও তার ঘোষিত ‘জাতির অর্থনৈতিক মুক্তি’র প্রক্রিয়া শুরুর আগেই ঘাতকচক্র সপরিবারে তাকে হত্যা করে। কিন্তু বর্তমানে তারই সুযোগ্য কন্যা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ‘জাতির অর্থনৈতিক মুক্তি’র জন্য নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। এ জাতি যেটি কখনও স্বপ্নেও ভাবেনি, কল্পনাও করেনি। সেই অবিশ্বাস্য কাজটি করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেই মহতী কর্মসূচি হলো, ‘হতদরিদ্রের জন্য খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি।’ এটি তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অংশবিশেষ। আর তা বাস্তবায়নে ১০ টাকা কেজিতে চাল দিচ্ছেন তিনি। প্রতি মাসে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের হতদরিদ্র ৫০ লাখ পরিবারকে ৩০ কেজি হারে চাল দেয়ার এক মহতী কর্মসূচি চালু করেছে সরকার। বাংলাদেশের মতো জনবহুল ও সমস্যা সংকুল দেশে সীমিত সম্পদ থেকে এ ধরনের জনহিতকর কর্মসূচি কল্পনাতীত এমন মন্তব্য বিদেশি গণমাধ্যমের। কিন্তু বাস্তবে জনগণের নেত্রী শেখ হাসিনা তা করে দেখিয়েছেন বিশ্ববাসীকে। ভবিষ্যতে আরও বিপুলসংখ্যক হতদরিদ্র মানুষকে এ কর্মসূচির আওতায় আনার কথাও বলেছেন তিনি।পল্লী রেশন ডিলারদের মাধমে নির্ধারিত কার্ডধারীদের মাধ্যে উল্লেখিত মূল্যে মাসে ৩০ কেজি চাল বিক্রি করা হবে। দেশের মানুষ যখন পবিত্র কোরবানির ঈদ উপলক্ষে ব্যস্ততার মধ্যে দিন অতিবাহিত করছিলেন ঠিক তখন প্রধানমন্ত্রী গেলেন কুড়িগ্রামে। গত ৭ সেপ্টেম্বর সকালে তিনি উত্তরবঙ্গের প্রত্যন্ত অঞ্চলে যান এই কর্মসূচি উদ্বোধন করতে। কর্মসূচিটি হচ্ছে ‘হতদরিদ্রদের জন্য খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি।’ হতদরিদ্রদের জন্য খাদ্যবান্ধব কর্মসূচিটি উদ্বোধন করতে গিয়ে তিনি গেলেন কুড়িগ্রাম। এতেই বোঝা যায় কর্মসূচিটির গুরুত্ব এবং কুড়িগ্রামের গুরুত্ব। কুড়িগ্রাম বাংলাদেশের প্রত্যন্ত একটি অঞ্চল। কয়েকদিন আগের বন্যায় কুড়িগ্রাম মারাত্মভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাই তিনি খাদ্য কর্মসূচিটি ওই জায়গা থেকেই উদ্বোধন করলেন। কর্মসূচিটির উদ্বোধন উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, দেশের একটি মানুষকেও উপোস থাকতে দেয়া হবে না। তিনি কুড়িগ্রাম অঞ্চলের ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের বাসস্থানের ব্যবস্থা করে দেবেন বলেও ঘোষণা দেন। ততোধিক গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি অঙ্গীকার প্রধানমন্ত্রীর কুড়িগ্রামে একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা হবে। যে কর্মসূচিটি কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার থানাহাট ইউনিয়নে উদ্বোধন করা হলো তাতে দেখা যাচ্ছে শুধু ওই জেলার ৯টি উপজেলার এক লাখ ২৫ হাজার ২৭৯টি পরিবার উপকৃত হবে।অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে ক্ষমতাসীনরা দরিদ্রের নামে বিদেশ থেকে খয়ারাতি সাহায্য আনলেও বাস্তবে তা গরিব, হতদরিদ্ররা কখনও পায়নি। সেখানে শেখ হাসিনার সরকার হতদরিদ্রদের জন্য খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি দেশের ৫০ লাখ পরিবারকে উপকৃত করবে। প্রতি পরিবারে চারজন করে সদস্য ধরে নিলে এই কর্মসূচির আওতায় আসবে বাংলাদেশের দুই কোটি অতি দরিদ্র। সরকার কর্তৃক প্রকাশিত তথ্যে জানা যাচ্ছে, এ কর্মসূচির অধীন দরিদ্ররা ১০ টাকা কেজি দরে চাল পাবেন। প্রতি মাসে চালের পরিমাণ হবে ৩০ কেজি। বছরের বারো মাস এ চাল দেয়া হবে না। যে পাঁচ মাস কাজ-কাম কম থাকে সেই সেপ্টেম্বর, অক্টোবর, নভেম্বর এবং মার্চ ও এপ্রিলে বিশেষ এ খাদ্য কর্মসূচির অধীনে চাল দেয়া হবে। এজন্য ইতোমধ্যেই দরিদ্রদের চিহ্নিত করে কার্ড বিতরণ করা হয়েছে। ঈদের আগেই তালিকা অনুযায়ী দেশের ৫০ লাখ হতদরিদ্রকে ৩০ কেজি হারে চাল দেয়া হয়েছে। প্রতি ৫০০ পরিবারের জন্য একজন ডিলার থাকবে, যার মাধ্যমে চাল বিতরণ করা হবে। বর্তমানে মোটা চাল বাজারে বিক্রি হয় ৩৫-৩৬ টাকা দরে। এই ভিত্তিতে বলা যায় দরিদ্ররা প্রতি কেজিতে ২৫-২৬ টাকা ভর্তুকি পাবেন। এতে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে খাদ্য ভর্তুকি বাবদ সরকারের খরচ হবে ২৮২১ কোটি টাকা। আর চালের পরিমাণ সাড়ে পাঁচ লাখ টন। বলা হয়েছে নারীপ্রধান পরিবার, বিধবা, স্বামী পরিত্যক্তা ও পরিত্যক্তা মহিলা এবং শিশুসহ দরিদ্র পরিবারকেই এ কর্মসূচিতে প্রাধান্য দেয়া হবে।দেশে ৫০ লাখ হতদরিদ্র পরিবার ৫ মাসের জন্য এ কর্মসূচির সুফল পাচ্ছে। এজন্য নেয়া হয়েছে ইউনিয়ন পর্যায়ে ‘হতদরিদ্রদের জন্য খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি।’ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ৭ সেপ্টেম্বর সকাল ১০টায় কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলা সদর থেকে এ কর্মসূচি উদ্বোধন করেন। কোন দাবি, আন্দোলন ছাড়াই দেখা যাচ্ছে সরকার নিজ উদ্যোগে জনবান্ধব, দরিদ্রবান্ধব এ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। পরিবেশবাদীরা কী হতদরিদ্রদের খাওয়ানোর জন্য কোন আন্দোলন দাবি করেছে? মনে পড়ে না। এতদসত্ত্বেও সরকার এ ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এজন্য প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ, ধন্যবাদ তার সরকারকে জানাই। সত্যি সত্যি এ খাদ্য কর্মসূচিটি ছিল সময়ের দাবি। দরিদ্র ও অতি দরিদ্ররা এমনিতেই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় জীবনযাপন করে। এক বেলা, দুই বেলা খেয়ে তারা জীবনযাপন করেন কিন্তু সমস্যা হয় বছরের বিশেষ কয়েকটা মাসে যখন কাজ থাকে না। আবার সমস্যা হয় প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘটলে। ঝড়-বৃষ্টি, খরা, বন্যা ইত্যাদি প্রাকৃতিক কারণে সমাজের কিনারে থাকা মানুষ দারুণ কষ্টে পড়ে যান। এটা নিত্যদিনের ঘটনা। উত্তরবঙ্গে এ সমস্যা ভীষণ প্রকট ছিল কয়েক বছর আগেও। কুড়িগ্রামসহ ওই অঞ্চলে ‘মঙ্গা’ লেগেই থাকত। মানুষ নিয়মিত দু’বেলা দু’মুঠো ভাত পেতেন না। এ সময় তাদের কাজ থাকত না, হাতে টাকা-পয়সা থাকত না, কাজেই ‘টাকা নেই তো খাওয়াও নেই।’ ভিক্ষা করেও খাবার মিলত না। সেই অবস্থার পরিসমাপ্তি ঘটেছে। মঙ্গা কবলিত অঞ্চলে বিশেষ চাষাবাদের ব্যবস্থা করা হয়েছে। কৃষকদের কাজ ও চাষের সুযোগ করে দেয়ার জন্য শেখ হাসিনার সরকার বেশ কিছু কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। এসব কর্মসূচি বাস্তবায়নের ফলে এখন আর উত্তরবঙ্গে ‘মঙ্গা’য় মানুষ ভোগেন না। মঙ্গা এক সময় জাদুঘরে ঠাঁই পাবে। তদুপরি সর্বত্র উন্নয়ন কর্মকা-, রাস্তাঘাটের উন্নতি, গ্যাস, বিদ্যুতের উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ, সর্বোপরি বঙ্গবন্ধু সেতু নির্মাণের কারণে উত্তরবঙ্গ পূর্বাবস্থায় নেই।কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক খান মো. নুরুল আমিনের উদ্ধৃতি দিয়ে পত্রিকায় লেখা হয়, দেশের ৫০ লাখ হতদরিদ্র পরিবারকে নির্বাচন করে কার্ড বিতরণের কাজ চলছে। স্থানীয় জনপ্রতিধিদের মাধ্যমে হতদরিদ্রদের নির্বাচন করা হয়েছে। দেয়া হচ্ছে সুদৃশ্য কার্ড। ধান লাগানো ও ধান কাটার মধ্যবর্তী সময়ে যখন দিনমজুরদের হাতে কাজ থাকে না, তখনই এ কর্মসূচির সুফল পাবে হতদরিদ্র পরিবারগুলো। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর, অক্টোবর ও নভেম্বর এবং আগামী বছরের মার্চ ও এপ্রিলে নির্ধারিত ডিলারদের কাছ থেকে ১০ টাকা কেজি দরে সবর্ে্বাচ্চ ৩০ কেজি চাল কিনতে পারবেন কার্ডধারীরা। কুড়িগ্রাম জেলায় ১ লাখ ২৫ হাজার ২৭৯টি পরিবার খাদ্যবান্ধব কার্ডের মাধ্যমে সরকারের সৃজনশীল এ কর্মসূচির সুফল পাবেন। এরই মধ্যে চিলমারী উপজেলার ৮ হাজার ২১ দরিদ্র পরিবারকে এই কার্ড দেয়া হয়েছে। এছাড়া সদরে ১৭ হাজার ৭২২টি, নাগেশ্বরীতে ২৪ হাজার ২০টি, ভুরুঙ্গামারীতে ১৩ হাজার ৯৮৫টি, ফুলবাড়ীতে ৯ হাজার ২৯৮টি, রাজারহাটে ১০ হাজার ৬০২টি, উলিপুরে ২৪ হাজার ২০৮টি, রৌমারীতে ১২ হাজার ৬৮৫টি ও রাজীবপুর উপজেলায় ৪ হাজার ৭৩৮টি কার্ড বিতরণ করা হয়েছে। চাল বিক্রির জন্য জেলায় ২৪৭ জন সম্ভাব্য ডিলারের মধ্যে ১২৬ জনকে ইতোমধ্যে নিযুক্ত করা হয়েছে।সাধারণ মানুষ এজন্য ‘প্রধানমন্ত্রীকে সানন্দে, সাদরে বরণ করেছেন। তাদের অভিমত, ‘দারিদ্রবিমোচনের জন্য নেয়া নতুন কোন কর্মসূচি নিলে প্রধানমন্ত্রী কুড়িগ্রামেই তার উদ্বোধন করেন। এর আগে ২০১০ সালে ন্যাশনাল সার্ভিস চালু করেছিলেন এই কুড়িগ্রাম থেকেই। এর আগে প্রধানমন্ত্রী তার সফরকালে কুড়িগ্রামবাসীর অনেক দাবিই পূরণ করেছেন। এর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন, অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপন, দুধকুমার নদীর উপর সেতু নির্মাণ উল্লেখযোগ্য। প্রত্যাশা প্রধানমন্ত্রীর এ মহতী উদ্যোগ যাতে ভ-ুল না হয়, গরিবের মুখের গ্রাস নামমাত্র মূল্যের চাল যেন হরিলুট বা লুটপাট না হয়, ওজনে কম দেয়া না হয় তা কঠোরভাবে মনিটরিং ও তদারকি করা দরকার। এবং মাসের নির্ধারিত সময়ে সঠিক পরিমাণে হতদরিদ্রকে যেন চাল দেয়া হয় তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যথাযথভাবে তদারকি করবে। এটি বলার অবকাশ রাখে না যে, এ কর্মসূচি হচ্ছে দরিদ্রবান্ধব সরকারের বিশেষ উপহার। কাজেই এ কর্মসূচিকে নিঃসন্দেহে বলা যায়, ‘খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি’ গরিবের জন্য শেখ হাসিনার উপহার।'[লেখক : সাংবাদিক]motaherbd@gmail.com