কোয়েল এনেছে মেহেদীর জীবনে আমেরিকান সুখ

শিক্ষিত বেকার যুবক মেহেদী হাসানের ছোটবেলা থেকেই ছিল উচ্চাভিলাষী স্বপ্ন। স্বপ্নের ধারাবাহিকতায় তার বড় হওয়ায় সঙ্গে সঙ্গে স্বপ্নরা বড় হতে থাকে। এইচএসসি পাস করার পর স্বপ্নেরা তাকে তড়িতাহত করে স্বপ্নের দেশ আমেরিকা পাড়ি দেয়ার। প্রবাসী পিতার সঞ্চিত অর্থ জমা দেয় সে দেশে যেতে। কিন্তু দালালের খপ্পরে পড়ে হয়ে যায় স্বপ্নের সর্বনাশ। উড়ে যায় জীবনের সব পরিকল্পনা। জীবনে এসে সঙ্গী হয় হতাশার বিষাদ। ২০১৪ সালের কথা, জীবন চলার শুরুতের বাবার সব অর্থ খুইয়ে যখন এ যুবক দিশাহারা। সে সময় কেবল সময় কাটাতে স্থানীয় এক বাজার থেকে কয়েকটি কোয়েল পাখি এনে পুষতে শুরু করেন মেহেদী। এক সময় কোয়েল ডিম পাড়ে। আনন্দ হয় তার, বাড়ে উৎসাহ। তারপর এই কোয়েল পাখিই তার জীবনে বয়ে এনেছে আমেরিকান সুখ।
উপজেলার সদর ইউনিয়নের হারিন্দা গ্রামের নজরুল ইসলামের একমাত্র ছেলে মেহেদী হাসান। এইচএসসি পাসের পরেই বাল্যকাল থেকে লালিত স্বপ্নের বাস্তবায়ন ঘটাতে জেদ ধরে আমেরিকা যাবার। ২০১৩ সালে এক দালালের কাছে টাকা দিলে উধাও হয়ে যায় দালাল। পারিবারিক ভর্ৎসনায় জীবন যখন দুঃর্বিষহ তখন কেবল সময় কাটাতে স্থানীয় মুড়াপাড়া বাজার থেকে ১০টি কোয়েল পাখি কিনে আনে মেহেদী হাসান। এক সময় পাখিগুলো নিয়মিত ডিম দেয়া শুরু করলে আগ্রহ বাড়ে তার। চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রের সামনে অনুষ্ঠিত পাখি মেলায় গিয়ে জানতে পারে দেশের নামিদামি কয়েকটি হ্যাচারির গল্প। এরপর ফরিপুরের ইকো হ্যাচারিতে কয়েক মাস কাজ করে মেহেদী হয়ে উঠে কোয়েল পাখি পালনে পারদর্শী। পরে গাজীপুরের কালীগঞ্জ এলাকার এক খামারির কাছ থেকে ৯ হাজার টাকায় ৬০০ কোয়েল পাখি কিনে এনে বাড়িতে গড়ে তোলে ছোট্ট একটি খামার। ছয় মাসেই তার ভালো লাভ হয়। এরপর খামারের আকার আরো বড় করার স্বপ্ন দেখে সে। কিনে আনে আরো ১ হাজার পাখি। আর পেছনে তাকাতে হয়নি তার। টানাটানির সংসারে হাল ধরতেই বছরের শেষ মাথায় এসে গড়ে তোলে দুটি বড় খামার। এখন প্রতিদিন তার খামারে ৬ হাজার ডিম সংগৃহীত হচ্ছে। খামারে রয়েছে ৮ হাজারের অধিক কোয়েল পাখি। পাখির ডিমগুলো এক সময় বাইরের বাজারে বিক্রি করলেও পরে গত বছরের নভেম্বরে নিজেই মাসিক ২০ হাজার টাকায় একটি বাড়ি নিয়ে গড়ে তুলেছে হ্যাচারি। বাচ্চা ফোটানোর জন্য ২৭ লাখ টাকায় কিনেছে কেনিয়ার তৈরি ২টি ইনকিউবেটর মেশিন। প্রতিদিন ৮ হাজার বাচ্চা ফুটানো হচ্ছে তার হ্যাচারিতে। পরিবেশ রক্ষায় নিজ বাড়িতে বায়োগ্যাস প্লান্ট নির্মাণ করারও পরিকল্পনা রয়েছে তার। শুধু কোয়েলের বিষ্ঠা দিয়ে তৈরি বায়োগ্যাস দিয়ে মিটানো হবে সংসারের চাহিদা। এ জন্য সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। আমেরিকায় গিয়ে যে পরিমাণ অর্থ উপার্জনের স্বপ্ন দেখতো মেহেদী আজ ঘরে বসেই তারচেয়ে বেশি টাকা উপার্জন করতে পারছে সে। তার কাছ থেকে উৎসাহ পেয়ে একই এলাকার অপু, মহিবুর, রাসিম মোল্লা, হৃদয়, নুর আলম, সানু মোল্লা, রিফাত, কবির হোসেন, আইয়ুব খান, আসলাম, সুমন তার খামার থেকে কোয়েল পাখির বাচ্চা সংগ্রহ করে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায়, সোনারগাঁও, আড়াইহাজার উপজেলা ছাড়াও গাজীপুর, নরসিংদী, ময়মনসিংহের ভালুকা, দাউদকান্দি, মুন্সীগঞ্জের বিভিন্ন অঞ্চলে বহু কোয়েল পাখি পালনের খামার গড়ে তোলা হয়েছে। এসব খামারের আয় দিয়ে কয়েকশ’ পরিবারের ভরণ-পোষণ হচ্ছে।
মেহেদী হাসান বলছে, এক সময় আমাদের সংসারে অভাব অনটন ছিল বলেই ছোটবেলা থেকে বড়লোক হওয়ায় স্বপ্ন দেখতাম। একটু বড় হয়ে জেনেছি আমেরিকা গেলেই নাকি লাখ লাখ টাকা কামাই করা যায়। বাবার প্রবাসে উপার্জিত টাকা দালালের হাতে খুইয়ে যখন পরিবারের অবহেলার পাত্র হয়ে গেলাম, জীবনটাই অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল। নিজে কিছু করে দেখানোর তাগিদ থেকেই কোয়েল পোষা শুরু করি। দু’বছরের ব্যবধানে আজ আমি হ্যাচারির মালিক।
মেহেদী আরো বলেন, বেকার যুবকরা চাকরির পেছনে না ঘুরে অল্প কিছু টাকা দিয়ে কোয়েল পাখির খামার করে স্বাবলম্বী হতে পারেন। ১ থেকে দেড় লাখ টাকা ব্যয় করে মাসে ২৫ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা অনায়াসে রোজগার করা যায়। তিনি আরো জানান, একটি বাচ্চা পাখি বিক্রি হয় ১০ থেকে ১৫ টাকায়। ডিম ফোটাতে খরচ হয় ১ টাকা করে। প্রতিদিন প্রতিটি কোয়েল পাখি ডিম দেয় একটি করে। প্রতিটি ডিম বিক্রি হয় ২টাকায়। একটি পাখি ১৮ মাস ডিম দেয়। তার পর সেই পাখি মাংস হিসেবে ৩০ থেকে ৩৫ টাকায় বিক্রি করা হয়। কোয়েলের ডিমে অনেক প্রোটিন রয়েছে। এতে কোলস্টেরলের মাত্রা খুবই কম, যা ছোট ছেলে-মেয়ে বা ডায়েবেটিক রোগীদের জন্য খুব উপকারী। আকারে ছোট্ট, অথচ গুণে ও মানে অনেক বড় পাখি কোয়েল। এ পাখি অর্থের পাশাপাশি আমাকে এনে দিচ্ছে খ্যাতি।
কোয়েল পাখির ডিম ও বিক্রির বড় বাজার রয়েছে রাজধানীর নিমতলীতে। সেখান থেকে দোকানিরা বাড়ি এসেই নিয়ে যায় যোগাযোগ থাকলে। এছাড়া ব্রয়লার, লেয়ার মুরগি কিংবা অন্য সব পাখির পোষার চেয়ে কোয়েল পাখি পোষা অনেক সহজ। প্রয়োজন কেবল ৭ দিনের সহজ প্রশিক্ষণ। যদি জীবাণুমুক্তভাবে এর খামার গড়ে তোলা যায় তাহলে ভাগ্য বদল হতে বাধ্য বলে মেহেদীর দাবি।
এখন মেহেদী কম্পিউটার সাইন্সের উপর একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা চালাচ্ছেন নিয়মিত। প্রতি মাসে সংসারে তুলে দিচ্ছেন ৫০-৬০ হাজার টাকা। যদি শিক্ষিত বেকার যুবক, যুবতীরা তীর্থের কাকের মতো চাকরির আশায় না ঘুরে মেহেদীর মতো ‘নিজেই কিছু করি’ সংকল্প করেন তাহলে দেশের প্রতিটি সংসারে আসবে সচ্ছলতা। দেশ হবে স্বনির্ভর।