মহেশখালীতে এলএনজি প্রকল্পের কাজ এগোচ্ছে দ্রুতগতিতে

সমুদ্রপথে সহজ যোগাযোগ এবং ভবিষ্যতে প্রতিবেশী মিয়ানমার হয়ে চীন পর্যন্ত সংযোগ স্থাপনের মধ্য দিয়ে বাণিজ্যিক প্রবৃদ্ধি এবং শিল্পায়নের অপার সম্ভাবনা বিবেচনায় কক্সবাজার জেলার মহেশখালীকে ঘিরে গ্রহণ করা হয়েছে উন্নয়ন মহাপরিকল্পনা। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- এলএনজি (লিকুফাইড ন্যাচারাল গ্যাস) টার্মিনাল ও ১৩২০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুত কেন্দ্র। এ দুই প্রকল্পের বাস্তবায়নকাজ ক্রমেই বেগবান হচ্ছে। মহেশখালী থেকে আনোয়ারা পর্যন্ত ৯১ কিলোমিটার পাইপলাইন স্থাপনের কাজ একেবারেই শেষপর্যায়ে। যে গতিতে কাজ এগোচ্ছে তাতে ২০১৮ সালের প্রথম দিকেই এ পাইপলাইনের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন ৫শ’ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি সরবরাহ করা সম্ভব বলে আশা করছে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ।

পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা যায়, এক লাখ ৩৮ হাজার ঘনমিটার ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন এলএনজি টার্মিনাল থেকে দৈনিক ৫শ’ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হবে। চুক্তি অনুযায়ী টার্মিনাল নির্মাণ ও অন্যান্য খরচ বাবদ এক্সিলারেট এনার্জিকে প্রতি হাজার ঘনফুট গ্যাসের জন্য ৪৯ সেন্ট করে পরিশোধ করবে পেট্রোবাংলা। তবে এর সঙ্গে আরও কিছু খরচ যুক্ত হয়ে ব্যয় দাঁড়াবে ৫৯ সেন্টে। মহেশখালীতে এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণে সিঙ্গাপুরভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ব্যয় করছে ৫০ কোটি মার্কিন ডলার। তবে প্রাক্কলিত ব্যয় হিসেবে এলএনজি আমদানি ও ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল পরিচালন ব্যয় বাবদ বছরে প্রায় ২ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার ও ভ্যাট, ট্যাক্স বাবদ বাংলাদেশী মুদ্রায় প্রায় ৩ হাজার ৮৪৭ কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে।

প্রসঙ্গত, গ্যাস সঙ্কট নিরসনের লক্ষ্যে এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের জোরালো দাবি জানিয়ে আসছিল দেশের শিল্প উদ্যোক্তা ও বিশেষজ্ঞরা। অন্য কোন বিকল্প না থাকায় সরকারও এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করে। ২০০৯ সালেই গ্রহণ করা হয় এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ। কিন্তু নানা জটিলতায় সে উদ্যোগ দীর্ঘসূত্রতার আবর্তে পড়ে যায়। ২০১৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পুনরায় ক্ষমতায় এলে কক্সবাজারের মহেশখালীতে এ টার্মিনাল নির্মাণের বিষয়টি রাখা হয় অগ্রাধিকারভিত্তিক প্রকল্পের তালিকায়। এর পর আর দীর্ঘসূত্রতা নয়, প্রয়োজনীয় সকল চুক্তি স্বাক্ষরের পাশাপাশি চলতে থাকে প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ। এর মধ্যেই আনোয়ারা পর্যন্ত ৯১ কিলোমিটার পাইপলাইন স্থাপনের কাজ প্রায় শেষ।

মহেশখালীতে ১৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুত কেন্দ্র নির্মাণের প্রক্রিয়াও এগিয়ে চলেছে। প্রায় শেষ হয়েছে ভূমি অধিগ্রহণের কাজ। যাদের ভূমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে তাদের অনেককে ক্ষতিপূরণের অর্থও পরিশোধ করা হচ্ছে। অধিগ্রহণ কাজ শেষ হলে শুরু হবে বিদ্যুত কেন্দ্র নির্মাণের কাজ। মূলত সমুদ্রপথে যোগাযোগ সুবিধার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েই মহেশখালীতে এলএনজি টার্মিনাল ও কয়লাবিদ্যুত কন্দ্রের প্রকল্প হাতে নেয় সরকার। জাহাজযোগে লিকুফাইড ন্যাচারাল গ্যাস ও কয়লা পরিবহন সহজ হবে বিধায় মহেশখালীকে এ ধরনের শিল্পের জন্য উপযুক্ত স্থান হিসেবে বেছে নেয়া হয়েছে। জাহাজে করে আমদানি করা গ্যাস ২০১৮ সালের প্রথমার্ধে পাইপযোগে সরবরাহ করা সম্ভব হবে বলে আশা করছে মন্ত্রণালয়। ভাসমান এলএনজি টার্মিনালকে ঘিরে পরিলক্ষিত হচ্ছে ব্যাপক আগ্রহ। দীর্ঘদিনের একটি দাবি পূরণ হতে যাচ্ছে বলে সন্তুষ্ট দেশের বিভিন্ন ট্রেডবডি।

বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশ থেকে উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করার ভিশন থেকে বর্তমান সরকার গ্রহণ করেছে চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত এলাকায় বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বেশকিছু মেগা প্রকল্প। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ইতোমধ্যে চার লেনে উন্নীত হয়েছে। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কও চার লেনে উন্নীত করার পরিকল্পনা গৃহীত করা হয়েছে। এছাড়া রয়েছে দোহাজারী থেকে মিয়ানমার সীমান্তে ঘুনধুম পর্যন্ত রেললাইন স্থাপনের প্রকল্প। প্রতিবেশী মিয়ানমার ও চীনের সঙ্গে সড়ক ও রেল যোগাযোগ স্থাপিত হলে কক্সবাজার হয়ে উঠবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সে বিবেচনায় রেখে সড়ক যোগাযোগ উন্নত করার পাশাপাশি কক্সবাজারকেও আধুনিক পর্যটন নগরীতে পরিণত করার মহাপরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। নগর উন্নয়নে গঠন করা হয়েছে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কউক)। গৃহীত মেগা প্রকল্পগুলো ২০২৪ সাল কিংবা এরও আগে শেষ করতে চায় সরকার।

এদিকে, প্রস্তাবিত মাতারবাড়ি বিদ্যুত কেন্দ্র কিছুটা দীর্ঘসূত্রতায় পড়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কাছে অগ্রাধিকার পাওয়া এ প্রকল্পের দরপত্র জমা দেয়ার নির্ধারিত তারিখ ছিল গত ২৪ জুলাই। কিন্তু ১ জুলাই ঢাকার গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গী হামলার ঘটনায় দুই পুলিশ কর্মকর্তা, সাত জাপানী নাগরিকসহ দেশী-বিদেশী মোট ২২ নাগরিকের হত্যাকা-ের ঘটনার পর মাতারবাড়ি বিদ্যুত কেন্দ্র নির্মাণে দরপত্র জমা দেয়ার প্রক্রিয়া এক মাসের জন্য পেছানো হয়। নির্ধারণ করা হয় ২৪ আগস্ট। কিন্তু ২৪ আগস্টও এ প্রকল্পের দরপত্র জমা দেয়ার কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হয়নি। এ কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে। তবে কর্তৃপক্ষ আবারও বলছে, স্থগিত নয়, এ কার্যক্রমের সময় আরও দুই মাসের জন্য পেছানো হয়েছে। অর্থাৎ দর প্রস্তাব জমা দেয়ার সময় আবারও বাড়ানো হয়েছে মাত্র।