কৃষ্ণাদের বাফুফের সংবর্ধনা

তাসলিমা, সানজিদা, মারিয়া ও নার্গিসের এই ছবিই বুঝিয়ে দিচ্ছে তাদের আনন্দ। কাল রাজধানীর এক হোটেলে অনূর্ধ্ব-১৬ মেয়েদের দলকে দেওয়া বাফুফের সংবর্ধনায় l বাফুফে‘প্রথমবার এসেছি, কিন্তু শেষবার নয়’—টেলিভিশনে ডিটারজেন্ট পাউডারের এই বিজ্ঞাপন হয়তো দেখে থাকবেন। চাকরির প্রথম মাসের বেতন পেয়ে মেয়েটি মাকে নিয়ে আসে পাঁচতারকা হোটেলে। বিজ্ঞাপনে ওই হোটেলের নিরাপত্তাকর্মীকে মেয়েটির পোশাক নিয়ে তাচ্ছিল্য করতে দেখা যায়। দৃশ্যটি নিছকই বিজ্ঞাপনের প্রয়োজনে। কিন্তু মা এনতা মান্দাকে নিয়ে অনূর্ধ্ব-১৬ মহিলা ফুটবলার মারিয়া মান্দা যখন রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে ঢুকছিল, বিজ্ঞাপনের দৃশ্যের মতো তাকে তাচ্ছিল্য করেনি কেউ। বরং ফুল নিয়েই অপেক্ষায় ছিলেন সবাই।
এনতা মান্দা গৃহকর্মীর কাজ করেন। কখনো দিনমজুরিও করতে হয়। নিজের জমিজমা নেই, অন্যের জমিতে ধানের চারা লাগান। কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচির আওতায় গ্রামের রাস্তায় মাটিও কাটেন। ময়মনসিংহ জেলা শহরেই খুব বেশি আসা হয়নি যাঁর, সেই এনতা মান্দা কাল এসেছিলেন রাজধানীতে। আটপৌরে সাদামাটা শাড়ি পরে ঢুকেছিলেন পাঁচতারকা হোটেলে। অভিজাত হোটেলের বিশাল হলরুম, ঝাড়বাতি, মুহুর্মুহু ক্যামেরার ফ্ল্যাশ—মারিয়ার মায়ের জন্য সবকিছুই ছিল অন্য রকম অভিজ্ঞতা!
শুধু মারিয়ার মা-ই নন, কাল সোনারগাঁও হোটেলে এসেছিলেন এএফসি অনূর্ধ্ব-১৬ ফুটবলের ‘সি’ গ্রুপের চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ দলের ২৩ ফুটবলারের বাবা-মায়েরা। বাফুফে তাঁদের মেয়েদের সংবর্ধনা দেবে। এএফসি অনূর্ধ্ব-১৬ এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের চূড়ান্ত পর্বে ওঠা মেয়েদের সৌজন্যেই স্মরণীয় এক সন্ধ্যা উপহার পেলেন বাবা-মায়েরা।
এই অভিভাবকদের অনেকেই কখনো না কখনো রাজধানীতে এসেছেন। কিন্তু পাঁচতারকা হোটেলের ‘রাশ উৎসবের’ মধ্যমণি হওয়া দূরের কথা, হোটেলের দরজাতেও উঁকি দেওয়ার সাহস হয়নি। মেয়েরা সংবর্ধনা পেল, সঙ্গে অর্থও। তিনটি করপোরেট প্রতিষ্ঠান সাইফ গ্লোবাল স্পোর্টস, জেমকন গ্রুপ ও কালডয়েল ডেভেলপমেন্ট লিমিটেড প্রত্যেক ফুটবলারকে দিয়েছে ৫০ হাজার টাকা করে। মোট দেড় লাখ টাকা। সংবর্ধনা অনুষ্ঠান শেষে বাফুফেকে তো ধন্যবাদ দেবেই তারা। প্রাপ্তিযোগ এখানেই শেষ হচ্ছে না। আজ আরেকটি সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে ওয়ালটন দলকে পাঁচ লাখ টাকা দেবে। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডও প্রত্যেক ফুটবলারকে এক লাখ টাকা করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
টাকাগুলো দিয়ে কী করবেন? প্রশ্নটা করতেই সবুজ মিয়ার মুখে হাসি। গোলরক্ষক তাসলিমার বাবা সবুজ মিয়া সবজির ফেরিওয়ালা। ময়মনসিংহের কলসিন্দুর বাজার ও আশপাশের গ্রামে তরকারির ব্যবসা করেন। খামভর্তি টাকাটা মুঠোর মধ্যে ধরে বললেন, ‘টাকাটা মেয়ের জন্য রেখে দেব। ভবিষ্যতে ওর কাজে লাগবে। কিছু টাকা দিয়ে ব্যবসাও বাড়াতে চাই।’ খুশিটা চোখেমুখেই ফুটে উঠছিল, কথাতেও সেটির প্রকাশ, ‘আমি আনন্দে আত্মহারা হয়ে যাচ্ছি। কখনোই ভাবিনি, এভাবে এত বড় হোটেলে আসব।’ তাসলিমার মা মানসিক ভারসাম্যহীন। এ জন্য মাকে আনতে পারেনি তাসলিমা। তবে বাবাকে নিজের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে আনতে পেরেই উচ্ছ্বসিত তাসলিমা, ‘এখানে আসার খবরটা শোনার পর থেকেই বাবা খুব খুশি। বাবার হাতে টাকা তুলে দিতে পেরে, সংসারে সাহায্য করতে পেরে আমারও ভালো লাগছে।’
অধিনায়ক কৃষ্ণার বাবা বাসুদেব সরকার অন্যের জমিতে কৃষিকাজ করেন। আগে বাসুদেব সরকারের দরজির দোকান ছিল। কিন্তু অর্থের অভাবে দোকানটা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছেন। পুরস্কারের এই অর্থটা মেয়ের জন্যই রেখে দিতে চান, ‘ভবিষ্যতে মেয়ের টাকা লাগবে। তাই টাকাটা নষ্ট করব না।’
ময়মনসিংহের ধোবাউড়ার রাস্তায় ইজিবাইক চালান মিডফিল্ডার মার্জিয়ার বাবা আবদুল মোতালেব। ইজিবাইকের চাকা প্রতিদিন বনবন করে ঘুরলেও সংসারের চাকা যেন ঘুরতেই চায় না। মেয়ের আর্থিক পুরস্কারের টাকাটা পেয়েই তাই অনেক পরিকল্পনা করে ফেলেছেন, ‘কখনোই ভাবিনি এতগুলো টাকা একবারে পেয়ে যাব। আমি এই টাকা দিয়ে একটি গরু আর বাছুর কিনতে চাই।’
ফরোয়ার্ড সিরাত জাহান স্বপ্নার বাবা রংপুরের কৃষক মোকছার আলীর নিজের জমি নেই। অন্যের জমিতে কৃষিকাজ করেন। তিন মেয়ের সবার ছোট স্বপ্নাকে নিয়ে স্বপ্নের শেষ নেই মোকছারের, ‘স্বপ্নার বড় দুই বোনের বিয়ে দিয়েছি তাড়াতাড়ি। কিন্তু এই মেয়েকে এখনই বিয়ে দেওয়ার ইচ্ছা নেই। যত দিন পারে খেলবে ও। মেয়ের সুবাদেই তো টাকাগুলো পেয়েছি। এবার কিছু জমি বন্ধক নিয়ে নিজে চাষ করতে চাই।’
মেয়েদের বাবা-মায়েদের তো আবেগাক্রান্ত হওয়াটাই স্বাভাবিক, আবেগ ছুঁয়ে গেল বাফুফের মহিলা কমিটির চেয়ারম্যান মাহফুজা আক্তার কিরণকেও। সবার শেষে মঞ্চে কথা বলতে উঠে কেঁদেই ফেললেন। পরে বললেন, ‘অনেক প্রতিকূলতা পেরিয়ে আমরা এখানে এসেছি। এ জন্যই কথা বলতে গিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিলাম। এই পুরস্কার ওদের অনেক প্রেরণা জোগাবে। পরিবার থেকেও যাতে মেয়েরা সহযোগিতা পায়, এ জন্যই অভিভাবকদের নিয়ে এসেছি। ওনারা দেখুন, তাঁদের মেয়েরা কোথায় আছে, কতটা নিরাপদে আছে।’
এই উৎসাহ, এই আনন্দ–উদ্যাপন ওদের বাবা–মায়ের জন্য বাড়তি প্রেরণার উৎস হয়ে রইল।