নারীর কর্মসংস্থানে ভূমিকা রেখেছে উপজেলা পর্যায়ে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম আয় বেড়েছে বেশিরভাগ প্রশিক্ষণার্থীদের

কর্মসংস্থান ও আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে ‘উপজেলা পর্যায়ে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম জোরদারকরণ’ প্রকল্পটি গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দারিদ্র্য দূরীকরণ, আত্ম-কর্মসংস্থানের মাধ্যমে বেকারত্ব নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখছে। নারীর কর্মসংস্থানের মাধ্যমে নারী উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বিভিন্ন ধরনের ‘ট্রেড কোর্স’-এর মাধ্যমে প্রশিক্ষণ নিয়েছে তরুণ ও যুবকরা। প্রশিক্ষণ অঞ্চলে বাল্য বিবাহ ও বহু বিবাহ এবং প্রসবকালীন মৃত্যুর হার আনুপাতিক হারে কমে আসছে। নারীর উন্নয়নের মাধ্যমে সামাজিক অস্থিরতার হার কমানো ও শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা বৃদ্ধি পাচ্ছে। মাথাপিছু আয়ের পরিমাণ বেড়ে চলছে, সমাজে স্বচ্ছলতা ফিরে আসছে যা সরকারের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (এসডিজি) অর্জনে সহায়তা করছে। সম্প্রতি প্রকল্পটির নিবিড় পরিবীক্ষণ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনটি সম্প্রতি প্রকাশ করেছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)।

‘কর্মসংস্থান ও আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে উপজেলা পর্যায়ে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম জোরদারকরণ (সংশোধিত)’ শীর্ষক প্রকল্পটি মোট ১০৫ কোটি ৮২ লাখ টাকা ব্যয়ে সম্পূর্ণ সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে জানুয়ারি ২০১২ থেকে ডিসেম্বর ২০১৭ মেয়াদে ৫৭ জেলার ৪৪২ উপজেলায় বাস্তবায়িত হচ্ছে। প্রকল্পটি থেকে সুফল পাওয়ার পাশাপাশি এর বিভিন্ন দুর্বলতাও তুলে ধরা হয়েছে প্রতিবেদনে। এ ছাড়া প্রকল্পটি হতে সঠিক সুফল পেতে বিভিন্ন সুপারিশও করা হয়েছে।

প্রকল্পটির মাধ্যমে উপজেলা পর্যায়ে তরুণ যুবকদের বিভিন্ন ‘ট্রেড কোর্স’-এর মাধ্যমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এগুলো হলো, ব্লকবাটিক ও প্রিন্টিং, মত্স্য খাদ্য তৈরি, পোল্ট্রি পালন, গাভী পালন, বিউটি পার্লার, মোবাইল ফোন মেরামত, গরু মোটাতাজাকরণ, মত্স্য খাদ্য উত্পাদন, শুঁটকি মাছ উত্পাদন, নার্সারি, দর্জি, নকশীকাঁথা, বাঁশ ও বেতের কাজ, ফুলচাষ, ছাগলপালন, এমব্রয়ডারি/সেলাই কাজ, শাক-সবজি চাষ, মাশরুম চাষ, তাঁত বুনন, মোটরসাইকেল মেরামত, মোমবাতি তৈরি, বেসিক কম্পিউটার কোর্স, গবাদি পশুপালন, রান্না শিক্ষা ও কুটির শিল্প। এ প্রকল্পের প্রধান উদ্দেশ্য হলো—স্থানীয় চাহিদার ভিত্তিতে হাতেকলমে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বেকার যুবদের দক্ষ ও আধা- দক্ষ মানব সম্পদে পরিণত করা। প্রশিক্ষিত যুবদের আত্মকর্মসংস্থানমূলক কার্যক্রমে নিয়োজিত করে দারিদ্র্য ও বেকারত্ব কমানো, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত যুবদের আত্মনির্ভর করে গড়ে তোলা এবং জাতি গঠনমূলক কার্যক্রমে যুবদের অংশগ্রহণকে উত্সাহিত করা।

প্রতিবেদনে উপকারভোগীদের তথ্য নিয়ে জরিপ করা হয়। এতে উল্লেখ করা হয়েছে, ৫০ শতাংশ প্রশিক্ষক জানিয়েছেন যে, এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ফলে ভোক্তা ও গ্রাহকদের সঙ্গে উত্পাদনকারীদের সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটেছে। এ ছাড়া প্রশিক্ষকদের মধ্য থেকে ২৯ দশমিক ২ শতাংশ বলেছেন বাল্য বিবাহ কমেছে, ২০ দশমিক ৮ শতাংশ বলেছেন গ্রামীণ অর্থনীতিকে উন্নত করেছে, ১৯ দশমিক ৮ শতাংশ বেকারত্বের হার কমছে, ৮ দশমিক ৩ শতাংশ বলেছেন মানুষকে আত্মবিশ্বাসী করে তুলছে, ৭ দশমিক ৩ শতাংশ বলেছেন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি উন্নত হয়েছে, ৫ দশমিক ২ বলেছেন দারিদ্র্য হ্রাস পেয়েছে এবং ৪ দশমিক ২ শতাংশ বলেছেন মানুষের সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি পেয়েছে। যুব উন্নয়ন অধিদফতরের মাধ্যমে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। জরিপ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, যে সকল প্রশিক্ষণার্থী বুটিক ও প্রিন্টিং কাজে আত্মকর্মী হয়েছে তাদের পারিবারিক আয় বৃদ্ধি পেয়েছে ৫০ ভাগ, মত্স্য খাবার তৈরিতে আত্মকর্মীর আয় বৃদ্ধি পেয়েছে ৪৪ দশমিক ১০ শতাংশ। হাঁস-মুরগি ও পোল্ট্রি পালনে আয় বৃদ্ধি পেয়েছে ৩২ শতাংশ, গাভী পালনে ৩৫ শতাংশ, মোবাইল ফোন মেরামতকারীর আয় বৃদ্ধি পেয়েছে ৪২ শতাংশ, গরু মোটাতাজাকরণের আয় বৃদ্ধি পেয়েছে ৩৮ শতাংশ, নার্সারিতে সর্বাধিক আয় বদ্ধি পেয়েছে ৬৪ শতাংশ, পোশাক তৈরি ও অন্যান্য কাজে আয় বৃদ্ধি পেয়েছে যথাক্রমে ৪০ শতাংশ ও ৫২ শতাংশ। প্রকল্পটির কিছু দুর্বলতাও রয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ট্রেড অনুসারে প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণের অভাব রয়েছে। পর্যাপ্ত ভাতা না পাওয়া, প্রশিক্ষণ শেষে আত্মকর্মসংস্থানের জন্য পর্যাপ্ত ঋণ না পাওয়াও দুর্বলতা হিসেবে উল্লেখ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রশিক্ষিত যুবদের ক্ষুদ্র উদ্যোগ পরিচালনা ও স্থানীয় চাহিদার ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল সংগ্রহের বিষয়ে প্রশিক্ষণকালীন সময়ে দিকনির্দেশনার যথেষ্ট অভাব রয়েছে। ফলে তারা ক্ষুদ্র উদ্যোগ গ্রহণের পরও আত্মনির্ভর হতে ব্যর্থ হয়। এ ধরনের উদ্যোক্তাদের সঙ্গে স্থানীয় ব্যাংকগুলোকে আরো সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন। উত্পাদিত পণ্যের বাজারজাতকরণ ব্যবস্থার উন্নয়ন করতে হবে। প্রয়োজনে বহির্বিশ্বে তা বিপণন বা প্রদর্শনীর সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। সুপারিশে উল্লেখ করা হয়েছে, ঋণ প্রদান নীতিমালা শিথিল করা প্রয়োজন। প্রশিক্ষণার্থীদের আত্মকর্মী করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে যুব উন্নয়ন অধিদফতর কর্তৃক যে ঋণ দেওয়া হয় তার নীতিমালা অন্যান্য বাণিজ্যিক ব্যাংকের মতো হওয়ায় প্রশিক্ষণার্থীদের ঋণ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। তাই ঋণ প্রদানের নীতিমালা শিথিল করা প্রয়োজন।