গ্রাম জেগে উঠছে শহরের আদলে

বাংলার গ্রামগুলো চিরচেনা রূপ হারিয়ে যেন ক্রমশ ছোট ছোট নগরী হয়ে উঠছে। সবুজ প্রকৃতির চাদরে ঢাকা, পাখির ডাকে ভোর হওয়া, ভুতুড়ে অন্ধকারে ডুবে থাকা গ্রাম একদিন যে শুধু গ্রন্থের পাতায় বেঁচে থাকবে, গল্পে গল্পে বেঁচে থাকবে সে আন্দাজ এখন খুব সহজেই করা যায়। বিল-ঝিল, হাওর-বাঁওড় এখন খুঁজে পাওয়া কঠিন। অধিকাংশ গ্রামের বুকে শহুরে জীবনযাপনের উজ্জ্বল উপস্থিতি পরিষ্কারভাবে লক্ষণীয়। আবাদী জমির পরিমাণ দিন দিন কমে যাচ্ছে, খড় আর টিনের দো-চালা-চারচালা ঘরের জায়গায় দখল করে নিচ্ছে একতলা-দোতলা এমনকি চারতলা বিল্ডিং। অলিগলি পাকা রাস্তা— আলো জ্বলছে রাতভর। গ্রামঘেঁষা নদীগুলো মরে যাচ্ছে। পানসি নৌকা এখন আর ঘাট জুড়ে যাত্রীদের অপেক্ষায় থাকে না। পারাপারের ঘাটও কমে আসছে। ঘাটের উপর বিশাল বিশাল সেতু তৈরি হচ্ছে। নৌকার প্রয়োজনীয়তা চিরতরে শেষ হয়ে যাচ্ছে। নদীর বুকে বয়ে চলা নৌকার মাঝিদের কণ্ঠে ভাটিয়ালী গানের সুর এখন ভুল করে ভাবার মতো ব্যাপার। নদী মরে যাচ্ছে— নদীর বুকে বসতি গড়ে উঠছে—গড়ে উঠছে হাটবাজার। নদীর বুকে বাণিজ্যের এ এক নতুন রূপ। গ্রাম ঘেঁষে বয়ে চলা নদী— নদীর বুকজুড়ে কতোরকমের নৌকার সারি— সেসব গল্পের অতীত অংশ হয়ে যাচ্ছে। ছবির মতো গ্রামগুলো এখন নতুন করে অন্যরকম ছবি হয়ে উঠছে। জীবনানন্দের সেই গ্রাম-নদী-পাখি—রূপসী বাংলা এখন কী চোখে পড়ে! জসীমউদদীনের কবিতার পাতায় পাতায় বুনে থাকা সেই গ্রাম আর গ্রামীণজীবন কোথায়! ওমর আলী মুগ্ধ হয়ে যে গ্রামে সারাটি জীবন কাটিয়ে দিলেন—সেসব কী আর এখন আছে! খুব দ্রুত গ্রামগুলো হারিয়ে ফেলছে তার চিরচেনা লাবণ্যশরীর।

ঈদে বাড়ি যাবার পথে গাবতলী পার হওয়ার পর থেকেই দু’পাশের গ্রামগুলো দূরে চোখ মেলে দেখার চেষ্টা করছিলাম। সবুজসীমানা ক্রমেই কমে আসছে। সবুজমাঠের বুক জুড়ে গ্রামগুলোর বসতিসীমানা বেড়ে উঠেছে। প্রতিবছরই তো শহর ছেড়ে গ্রামে যাই, ঈদ করতে। দু’চোখ পেতে এসব দেখার চেষ্টা করি। সবুজের মাঠ কী ভীষণভাবে কমে আসছে। বসতি বাড়ছে। বিল্ডিং বাড়ছে। গ্রামের পর গ্রাম যেন শহর-শহরগ্রাম হয়ে উঠছে । সাপের মতো আঁকাবাঁকা হয়ে গ্রামের বুক জুড়ে পিচঢালা পথ চলে গেছে দূর—দূর সীমানায়। দৌলতদিয়া ঘাট পার হয়ে যখন যাচ্ছি রাজবাড়ি পাংশা খোকসা সবই তো একই রকম পরিবর্তনের আদলে রূপ নিয়েছে। এক বছর আগে-পরেই গ্রামগুলো কতো দ্রুত পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে। এক দশক আগেও পরিবর্তনের বাতাস এতো জোরে ওঠেনি। কুমারখালী যেয়ে রীতিমতো চমকে উঠতে হয়—কতো পরিবর্তন! কুমারখালী বাসস্ট্যান্ড থেকে কুষ্টিয়া শহরমুখী কয়েক পা এগুলেই বিখ্যাত গীতিকার মাসুদ করিমের বাড়ি। অসাধারণ কতো বিখ্যাত গানের রচয়িতা তিনি। রুনা লায়লা, সাবিনা ইয়াসমীন, আব্দুল জব্বার, সৈয়দ আব্দুল হাদীর মতো বিখ্যাত শিল্পীরা তাঁর গান করেছেন। অথচ তাঁর নামটি কুমারখালীর কোথাও চোখে পড়ে না। রাস্তার পাশেই তো তাঁর বাড়ি। রাস্তাগুলো দিন দিন কতো চাকচিক্য হচ্ছে, অথচ মাসুদ করিমের মতো মানুষের নাম লেখা থাকে না কোথাও। কুমারখালী শহরের কোলঘেঁষে দাঁড়ানো তেবাড়িয়ার কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়’র নাম। কুমারখালী থেকে যে পাকা রাস্তাটি কুষ্টিয়া শহরের দিকে বিশাল দাঁড়াশ সাপের মতো ছুটে গেছে—তার দুপাশ ঘেঁষে বিল-ঝিল হাওর-বাঁওড় —মাঠের পর মাঠ জুড়ে পানি—শাপলা ফুল—এসব তো এক যুগ আগের চোখে দেখলেই দিব্যি চোখে ভেসে ওঠে। এখন এসব যেন অতীতকালের গল্প। কুমারখালী-কুষ্টিয়া হাইওয়ে থেকে একটু দূর-দূর ডানে-বামে যেসব পথ নেমে গেছে—সব পাকা রাস্তা—সেসব রাস্তা থেকেও যে সব শাখা প্রশাখা ছড়িয়ে গেছে তাও পাকা। আর এসব রাস্তার কোল ঘেঁষে দাঁড়ানো ঘরবাড়ি গ্রামীণ চেহারা ছেড়ে শহরের ঘরবাড়ির আদলে গড়ে উঠেছে—উঠছে। বিদ্যুতের আলোও ছড়িয়ে গেছে গ্রামের পর গ্রাম—একেবারে প্রত্যন্ত অঞ্চলেও। নন্দনালপুরের কাঁচা সুরু রাস্তাটি বিস্তৃত হয়ে পাকা হয়ে গ্রামের অলিতে গলিতে ঢুকে গেছে। রাস্তার পাশে সেই সব আমগাছ বাবলা গাছ বাঁশঝাড়ের জঙ্গল এখন আর চোখে পড়ে না। মাটির ঘর কিংবা বাঁশের বেড়ার ঘর এখন একটিও খুঁজে পাওয়া কঠিন। সদরপুর মনোহরপুর গ্রামগুলো তো একসময় পানিতেই ডুকে থাকত। রাস্তাঘাট কাদাপানিতে খেলা করত। সদরপুরের বিখ্যাত বিল কোথায় হারিয়ে গেছে। সেসব গ্রামে শহরের মতো ডুপ্লেক্স বাড়ি এখন মাথা উচু করে দাঁড়িয়ে আছে। চড়াইকোলও তো পানিতেই ডুবে থাকা আর এক গ্রাম। পানি আর মাছের খেলা যেখানে প্রতিনিয়ত ছিল। পানিতে রাস্তাঘাট ডুবে থাকত। রাস্তাগুলোও তো রাস্তা ছিল না—কোনরকমে রাস্তার মতো। সে গ্রাম এখন দিব্যি শহর। শহরকেও যেন হারমানানো শহর—নামও পরিবর্তন হয়ে গেছে—চড়াইকোল এখন আলাউদ্দিননগর। কাদা আর পানিতে মাখা পথঘাটহীন গ্রাম এখন পরিপূর্ণ এক নগরী। যেখানকার ছেলেমেয়েরা স্কুলে যেতে পারত না পথঘাটের অভাবে—স্কুলের অভাবে, সে গ্রামে এখন স্কুল, কলেজ, শহরের মতো মার্কেট। উন্নয়নের এক বিস্ময় চিত্র। এ গ্রামের ভেতর দিয়েই চলে গেছে কুঠিবাড়ি রাস্তা। এ সব এলাকায় বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে যে সব বিল-ঝিল ছিল, বহুদূর বিস্তৃত শাপলা ফুল ফুটে থাকত এখন তা কল্পনার চোখে দেখা ছাড়া উপায় নেই।

ওসমান পুর, সান্দিয়াড়া, রাজাপুর এসব গ্রামের ক্ষেত্রেও তো একই কথা। কিছুদিন আগেও এসব গ্রামের পথে কাদামাটির গন্ধ ছিল। এখন সে গন্ধ পিচঢালা পথে ঢেকে গেছে। বাড়িগুলো আপন চেহারা হারাচ্ছে। নগরের গন্ধ এসে টোকা মারছে এসব গ্রামে-হাটবাজারে। বাঘা যতীনের কয়া গ্রামেও গ্রামের ছবিটি হারাতে বসেছে। আলো ঝলমল গ্রাম। অলিগলি পাকা। প্রায় সবুজ হারানো গ্রাম। বিশাল বটবৃক্ষগুলো হারিয়ে গেছে। আবাদী জমি বসতবাড়ির দখলে চলে যাচ্ছে। ফসলী জমিন ছোট হয়ে আসছে। রাতের জোনাকী পোকার আলো এখন বিদ্যুতের আলোতে হারিয়ে গেছে। আর ছোট ছোট ঝোপ-ঝাঁড়ও নেই, যেখানে জোনাকীরা জ্বলতো আর নিভতো। এ গ্রামেই তো বিখ্যাত ঔপন্যাসিক আকবর হোসেন জন্মেছিলেন। তিনি তাঁর ‘দু’দিনের খেলাঘর’ উপন্যাসে যে গ্রাম আর গড়াই নদীর বর্ণনা করেছেন, এখন তা উপন্যাসের পাতাতেই মানায়, কল্পনার চোখেই মানায়, একদিনের চরম বাস্তব এখন কল্পনার রঙে দেখতে হয়। সেই দাপুটে গড়াই নদী এখন মৃত্যুযন্ত্রণাকাতর। জীবনযাপনও বদলে যাচ্ছে। সংস্কৃতি হারিয়ে যাচ্ছে। নিজস্ব সংস্কৃতি বাঁচিয়ে রাখার যুদ্ধটাও আছে। গ্রামে গড়ে উঠেছে ‘ব্রাদার্স পিস’ সংগঠন। সেখানে উত্সব হয় ব্যান্ড সঙ্গীতের। আবার নদীর চরে লালনের গানের আসর। সংস্কৃতি ভাঙা—শহুরে সংস্কৃতির থাবা—নিজস্ব সংস্কৃতি ধরে রাখার তীব্র এক চেষ্টা—গ্রামগুলোর বুক জুড়ে ঢেউ খেলছে। বাড়ির ভেতর বাড়ি—একান্নবর্তী পরিবার তো ভেঙে গেছে কবেই। এখন শরীকানায় বাড়িগুলো ভেঙে একই বাড়ির ভেতর অনেক বাড়ি গড়ে উঠছে—শহুরী কায়দায়। ঘরেবন্দী হয়ে পড়ছে মানুষ। বাড়ির ভেতরের মানুষও বাড়ির ভেতরের খোঁজ রাখছে না। বিনোদনও শহরের মতোই টেলিভিশন—ঘরে ঘরে। অর্থনীতিও যেন শহরমুখীই। লালনের ছেউড়িয়া তো গ্রাম। গ্রামের কোনো চেহারা কী সেখানে আছে! লালননগর হয়ে উঠেছে ছেঁউড়িয়া। মীর মশাররফ হোসেনের লাহিনীপাড়া কিছুকাল আগেও ভুতুড়ে গ্রাম ছিল। এখন লাহিনীপাড়াও শহরের আদলে জেগে উঠেছে।

মনস্বীদের গ্রাম বলে নয় এখন অধিকাংশ গ্রাম দ্রুত পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে। তবে মননে কতোটুকু জেগে উঠছে গ্রামের মানুষ! উন্নত জীবনযাপন সেখানে নিশ্চিত হয়ে যাচ্ছে, অর্থনৈতিক পরিবর্তন সেখানে ব্যাপকভাবে ঘটে গেছে। স্কুল-কলেজও ব্যাপকভাবে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। কিন্তু সেখানে নিজস্ব সংস্কৃতিচর্চা শহরের মতো দূরে সরে যাচ্ছে। রাতজাগা ‘রূপবান কন্যা’ যাত্রা এখন হয় না। ‘নবাব সিরাজউদদৌলা’ নাটক এখন আর মঞ্চস্থ হয় না। হাছন বা লালনের গানের আসরও বসে না। পড়ালেখাও কোচিংনির্ভর হয়ে পড়ছে। একদিকে উন্নয়নের যে বাতাস বাংলাদেশের সমস্ত গ্রামে প্রবল ঢেউয়ে জেগে উঠেছে, আর একদিকে হারিয়ে যেতে বসেছে গ্রামীণ জীবনের নিজস্ব সংস্কৃতি।

বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি গ্রামে এখন উন্নয়নের উন্মত্ত ছোঁয়া। দ্রুত পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে চিরচেনা গ্রাম। গ্রাম-বাংলার যে ছবি আমাদের চিরকালীন—সময়ের দাবিতে তা যে হারাতে বসেছে তা এখন আর অস্বীকার করার উপায় নেই। সময়ের স্রোতে এটা মেনে নিতে হবে, স্রোতের সঙ্গে এটা মেনেই চলতে হবে এটিই স্বাভাবিক। কিন্তু আমাদের গ্রামীণ যে সংস্কৃতি—নিজস্ব যে সংস্কৃতি সেসব যেন হারিয়ে না যায়। গ্রামীণ-প্রকৃতি যেভাবে লুট হয়ে যাচ্ছে তাতে সবুজশ্যামল বাংলাকে খুঁজে পাওয়া একদিন সত্যিই কঠিন হয়ে পড়বে। একদিন যে গ্রামে পাখির ডাকে ভোরের ঘুম ভাঙতো, এখন সেখানে ঘুম ভাঙে ভারি যানবাহনের বিকট শব্দে। গ্রামের সেই নিঝুম রাত এখন খুব কম গ্রামেই হয়ত বেঁচে আছে। সেসব গ্রামও কদিন থাকে কে জানে। এ কথা ঠিক, গ্রামে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে, হচ্ছে। গ্রামীণ জীবনযাপন, গ্রামীণ অর্থনীতি সব কিছুর ব্যাপক উন্নতি ঘটেছে। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটেছে অবিশ্বাস্যরকম। কিন্তু হারিয়েও যাচ্ছে অনেক —হাছন-লালনের উত্সব, জীবনানন্দের রূপসী বাংলা, জসীম উদদীনের কবিতার গ্রাম—ওমর আলীর চরকমরপুরের রাস্তা। মাটির সূতি দিয়ে পরা গ্রামের যে মানুষ—সেসব মানুষ কী হারিয়ে যাচ্ছে না! আমাদের গ্রামীণ নিজস্ব সংস্কৃতি আর মুগ্ধবতী সবুজ প্রকৃতি আর বহমান নদীর স্রোতের ভেতরেই আমাদের গ্রামগুলো জেগে উঠুক সময়ের দাবিতে।

n লেখক :চেয়ারম্যান, বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ, সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটি