ডলারের বিপরীতে টাকা শক্তিশালী

প্রতিনিয়ত বাড়ছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। গত সপ্তাহে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩১ দশমিক ১৬ বিলিয়ন ডলারে। ১০ বছর আগে দেশের রিজার্ভের পরিমাণ ছিল মাত্র তিন দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলার। সে হিসেবে গত এক দশকে রিজার্ভ বেড়েছে আট দশমিক ৯৫ গুণ। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী হওয়ায় মুদ্রা বিনিময় হারে তার প্রভাব পড়েছে।

আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী একটি দেশের কাছে অন্তত তিন মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর সমপরিমাণ বিদেশি মুদ্রা মজুদ থাকতে হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, গত ছয় বছর বিদেশি মুদ্রার মজুদ নিয়ে সরকারকে কখনো দুশ্চিন্তায় পড়তে হয়নি। বরং সবসময়ই তা বেশি ছিল। বাংলাদেশের আমদানির বর্তমান গতিধারা অনুযায়ী যে পরিমাণ রিজার্ভ আছে তা দিয়ে অন্তত সাত মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০০৬ সালের জুনে রিজার্ভ ছিল মাত্র তিন দশমিক ৪৮ বিলিয়ন (৩৪৮ কোটি ৪০ লাখ) ডলার। প্রতিবছর রিজার্ভের পরিমাণ বেড়ে সর্বপ্রথম হাজার কোটির ঘর অতিক্রম করে ২০১০ সালে। ওই বছরের জুনে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়ায় এক হাজার ৭৫ কোটি ডলারে। পরের দুই বছরে রিজার্ভ বৃদ্ধির হার খুব বেশি ছিল না। পর পর তিন বছর হাজার কোটি থাকার পর ২০১৩ সালে দেড় হাজার কোটি ডলার ছাড়ায় রিজার্ভ। পরের বছরই অর্থাত্ ২০১৪ সালে রিজার্ভ রেকর্ড গড়ে দুই হাজার কোটি ডলার অতিক্রম করে। গত জুনে রিজার্ভ অতিক্রম করে তিন হাজার কোটি ডলারের মাইলফলক। সর্বশেষ ৩১ আগস্টে রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে তিন হাজার ১১৬ কোটি ডলারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক শুভঙ্কর সাহা এ বিষয়ে বলেন, রপ্তানি ও রেমিট্যান্স থেকে বৈদেশিক মুদ্রার আয় বাড়ছে। সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ আসার পরিমাণও ঊর্ধ্বমুখী। এ ছাড়া জ্বালানি তেল, খাদ্যপণ্য ইত্যাদির মূল্য আন্তর্জাতিক বাজারে কম থাকায় সার্বিকভাবে আমদানি ব্যয় কম হওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রতিনিয়ত বাড়ছে। বিপুল পরিমাণ রিজার্ভ বাংলাদেশের জন্য স্বস্তিদায়ক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসেবে দেখা গেছে ২০১২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে এক ডলার কিনতে লাগত ৮১ টাকা ৫৫ পয়সা। আর চলতি বছরে সেপ্টেম্বরে এক ডলার কিনতে লাগে ৭৮ টাকা ৪০ পয়সা। গত চার বছরে ডলারের বিপরীতে টাকা চার দশমিক শূন্য এক শতাংশ শক্তিশালী হয়েছে। এতে রপ্তানিকারকরা ডলারের বিপরীতে চার দশমিক শূন্য এক শতাংশ কম টাকা পেয়েছেন। এ কারণে উদ্যোক্তারা বলছেন, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী হওয়ায় মুদ্রা বিনিময় হারে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। আর বিনিময় হারের এ ক্ষতিতে রপ্তানিকারকরা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বৈদেশিক বাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, টাকা শক্তিশালী হওয়ায় রপ্তানিকারকদের এ ক্ষতি অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। কারণ টাকা শক্তিশালী হলে রপ্তানিকারকরা ডলারের বিপরীতে আগের তুলনায় কম টাকা পাবেন। ফলে তারা রপ্তানি কমিয়ে দিতে বাধ্য হবেন, এটাই স্বাভাবিক।

রিজার্ভ বৃদ্ধি প্রসঙ্গে অর্থনীতিবিদদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশে বিনিয়োগ কমে যাওয়ায় রিজার্ভ অনেক বেড়ে গেছে। কারণ বিনিয়োগ কমে যাওয়ায় মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি কমে গেছে। এতে আমদানি ব্যয় কমে রিজার্ভ বেড়ে গেছে। তাই শুধু উচ্চ রিজার্ভ দেখে তুষ্টিতে ভুগলে চলবে না, বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। এতে রিজার্ভ কমলেও অর্থনীতির জন্য ভালো হবে।