শহরে সবুজ আঙিনা

ধানমন্ডি ১ নম্বর রোডের একটি চায়ের দোকান। সেখানে কয়েক বন্ধু আড্ডা দিচ্ছেন। পরিচিত একটা ফুলের নাম নিয়ে তাঁরা বিভ্রান্ত। একজন বলছেন, ‘ওই ফুলের নাম মাধবীলতা’। আরেকজন বলছেন, ‘না, লোকে মাধবীলতা নামে চিনলেও ওর আসল নাম মধুমঞ্জরী’। তাঁদের কথার মধ্যেই চা-দোকানি বললেন, ‘নাম যাই হোক, ঘ্রাণ খুব মিষ্টি। সন্ধ্যায় দোকানে বইসাই গন্ধটা পাই।’
চায়ের দোকানের ঠিক উল্টো দিকে একটি বাড়ির সামনের বেশির অংশই ছেয়ে আছে অ্যালামন্ডা, বাগানবিলাস আর মধুমঞ্জরী লতায়। সীমানাপ্রাচীর জড়িয়ে আছে ‘ওয়াল কার্পেট ট্রি’ নামের সবুজ পাতায়। সেদিকে তাকিয়ে চায়ের দোকানের সামনে তর্ক করছিলেন কয়েকজন বন্ধু।
গত রোববার সকালে বাড়িটিতে গিয়ে দেখা যায়, সারা বাড়িই নানা ফুলে ভরা। অন্য তিন পাশের সীমানাপ্রাচীরেও সেঁটে আছে ওয়াল কার্পেট ট্রি। ভবনের চারপাশের দেয়াল বেয়ে নেমেছে মধুমঞ্জরী, বাগানবিলাস, অ্যালামন্ডা ও সুদৃশ্য বিভিন্ন প্রজাতির পাতাবাহার। বাড়ির পেছনে ১৩০০ বর্গফুটের উঠোন। ঘন সবুজ ঘাসে ঢেকে আছে পুরো জায়গা। চারধারে আছে বাঁশ, শেফালি, কামিনী, গন্ধরাজ, জুঁই, হাসনাহেনা, টগর, ঝাউ, স্পাইডার লিলি, কাঠগোলাপ, শিউলি, ক্যাকটাস, বিভিন্ন প্রজাতির পাতাবাহার ও জবা ফুলগাছ। উঠোনের এক কোনায় ছোট্ট একটা ফোয়ারা। পাশেই দোতলায় ওঠার লোহার সিঁড়ি। ছায়াঘন ওই সব গাছের ঝোপে পাখিরা বাসা বেঁধেছে।
তিনতলা এই বাড়ির উত্তর-পশ্চিম ও দক্ষিণ-পূর্ব কোনার ব্যালকনিতে আছে দুটো খণ্ড বাগান। উত্তর-পশ্চিম ব্যালকনি বাগানের অর্ধেক জুড়ে ঘাসের কার্পেট। দক্ষিণ-পূর্ব ব্যালকনি বাগানে ফুটে আছে নানা ফুল। বসার ব্যবস্থাও আছে। বিকেলে পরিবারের সদস্যরা সেখানে গল্পগুজব করেন।
তিন তলার ছাদে ফলবাগান, আছে ৪০টি ফলগাছ। মৌসুমি সবজির চাষও হয়। এর আয়তন প্রায় তিন হাজার বর্গফুট। সেখানে জাম্বুরা, কাগজি লেবু ও আমড়াগাছের শাখা ফলের ভারে নুয়ে আছে। ফল ধরেছে কামরাঙা, মাল্টা, পেয়ারা ও পেঁপেগাছে। আরও আছে বিদেশি সফেদা, জামরুল, আম, হাইব্রিড লেবুসহ বিভিন্ন জাতের ফলগাছ। ঘৃতকুমারী, নিম, ক্যাকটাস, পুঁইশাক ও ঢ্যাঁড়স। বাগানের সব গাছের বয়স পাঁচ-ছয় বছর। ছাদের কিছু অংশে ফুটেছে কয়েক প্রজাতির লতানো ফুল। হাতলওয়ালা গোলাকার লোহার ড্রামে মাটি ভর্তি করে গাছগুলো লাগানো।
বাড়ির সব অংশের বাগান দেখাশোনা ও পরিচর্যা করেন সুরভী হোসেন। একই সঙ্গে তিনি গৃহিণী এবং ব্যবসায়ী। ছয় বছর ধরে নিয়মিত শ্রম দিয়ে এটি গড়ে তুলেছেন। গ্রামের বাড়ি ফরিদপুর থেকে মাটি, গাছ ও জৈব সার এনে বাগান শুরু করেন। এ কাজে দুজন কর্মচারী তাঁকে সাহায্য করেন।
বাগান সম্পর্কে সুরভী হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘গ্রামের প্রকৃতি ও পরিবেশের আবহটা শহুরে জীবনে আনব
বলে বাগান শুরু করি। ছোটবেলা থেকেই গাছের প্রতি আমার ভীষণ টান। সবুজ ভালোবাসি। ফুল-পাখি আমাকে মুগ্ধ করে। দোতলার বারান্দায় বসে বাগানের দিকে তাকিয়ে থাকি, প্রশান্ত লাগে। বাগান ঘুরে অবসর কাটে। বিশুদ্ধ অক্সিজেন নিই। সবুজের মধ্যে থাকার আনন্দ পাই।’