বাংলাদেশ এক অসামান্য উন্নয়নের গল্প

শুধু সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদবিরোধী কর্মকা-েই নয়, জলবায়ু পরিবর্তন, স্বাস্থ্য, জ্বালানিসহ অন্য অনেক ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করার আগ্রহ দেখিয়েছেন কেরি। কেরির এ আগ্রহের পেছনে অবশ্যই কাজ করেছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে পরিচালিত বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির দৃশ্যমান বাস্তবতা। নানামুখী প্রতিকূলতার ভেতর দিয়েও বাংলাদেশ উন্নয়নের সোপান বেয়ে তরতর করে এগিয়ে যাচ্ছে। বৈরী প্রকৃতির ভেতরেও খাদ্যশস্য উৎপাদনে এবং খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনে বাংলাদেশ এখন একটি দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী দেশ। দুর্যোগসহিষ্ণু শস্যের জাত উদ্ভাবনেও বাংলাদেশের সাফল্য কম নয়। এছাড়া জাতিসংঘের বিভিন্ন শান্তিরক্ষাকারী মিশনে বাংলাদেশ অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে।
ড. রাশিদ আসকারী
‘বাংলাদেশের আছে এক অসামান্য উন্নয়নের গল্প। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে আনন্দিত।’ ঢাকায় সংক্ষিপ্ত সফর শেষে ফেরার পর এক টুইট বার্তায় মতামত দিয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি। কেরির সফরটি সময়ের বিচারে সংক্ষিপ্ত মাত্র দশ ঘণ্টার। কিন্তু তাৎপর্যের বিচারে অনেক বহৎ। বিশেষ করে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা জানাতে যাওয়া, তার স্মৃতি জাদুঘর পরিদর্শন শেষে ভিজিটরস বুকে আবেগঘন বাণীপ্রদান, সর্বোপরি বাংলাদেশকে সুদৃঢ়ভাবে নেতৃত্বদানকারী বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বের ভূয়সী প্রশংসা সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশের আভ্যন্তর রাজনীতিতে এবং বাংলাদেশ-মার্কিন সম্পর্কে এক নতুন মাত্রিকতা যুক্ত করেছে। কেরি পরিদর্শক বইয়ে অকপটে স্বীকার করেছেন: ‘সহিংস ও কাপুরুষোচিতভাবে বাংলাদেশের জনগণের মাঝ থেকে এমন প্রতিভাবান ও সাহসী নেতৃত্বকে (বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান) সরিয়ে দেয়া কী যে মর্মান্তিক ঘটনা। তারপরও বাংলাদেশ এখন বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়নে এগিয়ে যাচ্ছে, তারই কন্যার নেতৃত্বে। যুক্তরাষ্ট্র তার সেই স্বপ্ন পূরণে বন্ধু ও সমর্থক হতে পেরে গর্ববোধ করে। আমরা এখন এ সম্পর্ককে আরো এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই এবং শান্তি ও সমৃদ্ধির লক্ষ্যে আমরা যৌথভাবে কাজ করছি।’
জন কেরির এই উপলব্ধিজাত স্বীকারোক্তি নিছকই তার আবেগঘন ব্যক্তিক উপলব্ধি নয়। এটি তিনি প্রকাশ করেছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমানে কর্মরত একজন দায়িত্বশীল পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবেই। আর ঠিক সেখানেই কৌতূহলী মনে বিস্ময় জাগে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানের কথিত অখ-তা রক্ষার নামে স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঠেকাতে যে যুক্তরাষ্ট্র সপ্তম নৌবহর বঙ্গোপসাগর অভিমুখে পাঠিয়েছিল; প্রেসিডেন্ট নিক্সন ও তার নিরাপত্তা উপদেষ্ট হেনরি কিসিঞ্জার যেখানে বাংলাদেশকে সহায়তা করা থেকে ভারতকে বিরত রাখার জন্য চীন-ওয়াশিংটন যৌথ চাপ প্রয়োগ করেছিল; স্বাধীনতা উত্তরকালেও যে যুক্তরাষ্ট্র পিএল-৪৮০-এর অধীনে বাংলাদেশকে খাদ্য সাহায্য বন্ধ করে দিয়েছিল; বাংলাদেশকে তলাবিহীন ঝুড়ি হিসেবে আখ্যা দিয়েছিল; আজ সেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের খোদ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সেই নিক্সন-কিসিঞ্জারের আজকের প্রতিনিধিরা বঙ্গবন্ধুর জয়গানে মুখর হয়ে উঠেছেন। তারা সুকন্যার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে উঠছেন। যুক্তরাষ্ট্রের এই ভাবান্তরের পেছনে যে তাদের পররাষ্ট্রনৈতিক ঔদার্য কাজ করছে তেমনটি ভাববারও কোনো কারণ নেই। বস্তুত ২০১৪-এর ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার রাজনৈতিক অর্থনৈতিক মৈত্রী সংঘ সংস্থাগুলো নানাভাবেই শেখ হাসিনার সরকারকে নিরুৎসাহিত করে আসছিল। তার ওপর বহুমাত্রিক চাপ প্রয়োগ করে বশ্যতা স্বীকারের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু কোনো কিছুতেই তা সম্ভবপর হয়ে ওঠেনি। শেখ হাসিনা তার ব্যক্তিত্ব, চারিত্রিক দৃঢ়তা, গতিশীলতা, দূরদর্শিতা ও প্রজ্ঞা দিয়ে একদিকে যেমন মোকাবেলা করে চলেছেন অন্তস্থ-বহিস্থ প্রতিকূল চাপ, অন্যদিকে তেমনি আপন নেতৃত্বকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছেন এক অসামান্য উচ্চতায়। বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন-কাঙ্ক্ষিত সাফল্যের সোপান বেয়ে। আর তাই আজ জন কেরিরা ছুটে আসেন ধানম-ি ৩২ নম্বরে। শ্রদ্ধাবনত চিত্তে দাঁড়িয়ে থাকেন-বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতির সামনে। এই প্রথম কোনো মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি জাদুঘর পরিদর্শন করেন। এটি বাংলাদেশের জন্য আরেক বিজয়। শুধু তাই নয়, জন কেরি শেখ হাসিনার সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করে যাওয়ার মার্কিন অভিপ্রায় আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যক্ত করেন। এ কথা অনস্বীকার্য যে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে পরিচালিত সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদবিরোধী আন্দোলনে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। গুলশান ক্যাফে এবং শোলাকিয়া আত্মঘাতী হামলার পর সমজাতীয় আর কোনো জঙ্গিবাদী নাশকতা লক্ষ্য করা যায়নি। বরং জঙ্গিদেরই দেখা গেছে উল্টো মারা খেতে। এরই মধ্যে বেশ কয়েকটি কাউন্টার টেররিজম অপারেশন কাঙ্ক্ষিত সাফল্য লাভ করেছে। জঙ্গিবাদ প্রতিরোধে সবচেয়ে বেশি কাজ করছে শেখ হাসিনা আহূত সামাজিক প্রতিরোধ কর্মসূচি। জঙ্গিবিরোধী ব্যাপকভিত্তিক সামাজিক প্রাতিষ্ঠানিক কর্মসূচির পর একটি প্রবল জঙ্গিবিরোধী সামাজিক মানস গড়ে উঠেছে। ঘৃণার মাত্রা এতই প্রবল যে, নিহত জঙ্গিদের লাশ গ্রহণেও আপত্তি জানাচ্ছে কোনো কোনো গার্ডিয়ান। বিপথগামীদের অনেকেই স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার ব্যাকুলতা প্রকাশ করছে।
শুধু সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদবিরোধী কর্মকা-েই নয়, জলবায়ু পরিবর্তন, স্বাস্থ্য, জ্বালানিসহ অন্য অনেক ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করার আগ্রহ দেখিয়েছেন কেরি। কেরির এ আগ্রহের পেছনে অবশ্যই কাজ করেছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে পরিচালিত বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির দৃশ্যমান বাস্তবতা। নানামুখী প্রতিকূলতার ভেতর দিয়েও বাংলাদেশ উন্নয়নের সোপান বেয়ে তরতর করে এগিয়ে যাচ্ছে। বৈরী প্রকৃতির ভেতরেও খাদ্যশস্য উৎপাদনে এবং খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনে বাংলাদেশ এখন একটি দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী দেশ। দুর্যোগসহিষ্ণু শস্যের জাত উদ্ভাবনেও বাংলাদেশের সাফল্য কম নয়। এছাড়াও জাতিসংঘের বিভিন্ন শান্তিরক্ষাকারী মিশনে বাংলাদেশ অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে।
ক্রয় ক্ষমতার সমতা (purchasing power parity) ppp-এর বিচারে বর্তমান বাংলাদেশের বাজারভিত্তিক অর্থনীতি বিশ্বের বত্রিশতম (৩২) অর্থনীতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে এবং উদীয়মান নেকস্ট ইলেভেন মার্কেটের সারণিতে স্থান লাভ করেছে। আইএমএফের এক তথ্য অনুযায়ী ২০১৬ সালে বাংলাদেশের অর্থনীতি ৭.১% গ্রোথ রেটসহ বিশ্বের দ্বিতীয় দ্রুততম বর্ধিষ্ণু অর্থনীতি হিসেবে পরিচিত হয়েছে। রপ্তানি আয়, রেমিট্যান্স এবং অভ্যন্তরীণ কৃষিখাতে প্রশংসনীয় অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। দীর্ঘকালের কৃষিনির্ভর অর্থনীতি ক্রমে ক্রমে শিল্পনির্ভরতার দিকে ধাবিত হচ্ছে এবং তৈরি পোশাক, জাহাজ নির্মাণ, ফার্মাসিউটিক্যাল, মৎস্য, পাট এবং চামড়াজাত দ্রব্যে রপ্তানিকেন্দ্রিক শিল্পায়ন হচ্ছে। এভাবে বাংলাদেশ-এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের এক উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে ইতোমধ্যেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। শুধু তাই নয়, সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (MOG) সামাজিক সূচকে বাংলাদেশ প্রতিবেশী অনেক দেশকেই ছাড়িয়ে গেছে। এই অব্যাহত অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা বাংলাদেশের আপামর জনতার শ্রমে ও ঘামে সম্পাদিত হলেও এর পেছনে যে গতিশীল নেতৃত্বের ভূমিকা রয়েছে_ তা অত্যন্ত সফলভাবে দিয়ে যাচ্ছেন শেখ হাসিনা। অধিকন্তু, ভারতের মূল ভূখ- এবং এর সপ্ত-ভগি্ন রাজ্যগুলোর (seven sister states) মাঝে অবস্থিত হওয়ায় এবং ভৌগোলিকভাবে বঙ্গোপসাগর সংলগ্ন হওয়ায় বাংলাদেশের যে ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তাকেও অত্যন্ত সফলভাবে, সম্পূর্ণ বাংলাদেশ বান্ধবভাবে ব্যবহার করার যে যোগ্যতা শেখ হাসিনা ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছেন_ বস্তুত তারই প্রসূন জন কেরির এই সাম্প্রতিক উপলব্ধি। বাংলাদেশকে নিয়ে তার অসামান্য উন্নয়নের গল্পের পশ্চাতভূমি এটাই।

ড. রাশিদ আসকারী: রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং উপাচার্য, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

Views: 20