পরিবেশ রক্ষায় বিশ্বের সেরা কারখানা রেমি হোল্ডিংস

রানা প্লাজা ধসের পর বাংলাদেশের অগ্রগতি স্থবির হয়ে পড়বে—সমালোচকদের এমন ধারণাকে পেছনে ফেলে অদম্য গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের পোশাক খাত। সম্প্রতি দেশের পোশাক খাতে রপ্তানি আয় বৃদ্ধিসহ গড়ে উঠছে বিশ্বমানের সব কারখানা। মান সনদে ইতিমধ্যে আমেরিকার ইউএস গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিল (ইউএসজিবিসি) পরিবেশবান্ধব কারখানার সনদ ‘লিডারশিপ ইন এনার্জি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ডিজাইন (এলইইডি)’-এর সর্বোচ্চ স্বীকৃতি ‘প্লাটিনাম’ পেয়েছে দেশের কয়েকটি কারখানা। এর মধ্যে সম্প্রতি সর্বোচ্চ মান পেয়ে যে কারখানাটি বিশ্বসেরা হয়েছে সেটি হলো ‘রেমি হোল্ডিংস লিমিটেড’।

জানা যায়, জ্বালানির কম ব্যবহার ও পরিবেশগত সর্বোচ্চ মান রক্ষা করে কারখানা গড়ে তুললে পাওয়া যায় যুক্তরাষ্ট্রের সংস্থা ইউএস গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিলের (ইউএসজিবিসি) এলইইডি সনদ। উচ্চমান রক্ষা করে পৃথিবীর যে কয়েকটি কারখানা এলইইডি সনদের মধ্যে সর্বোচ্চ মর্যাদা পায় তা হলো ‘প্লাটিনাম’।

রাজধানী থেকে মাত্র ১৫ কিলোমিটার দূরে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের আদমজীনগরের আদমজী রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলে আড়াই লাখ বর্গফুট এলাকাজুড়ে গড়ে উঠেছে বিশ্বের এক নম্বর তৈরি পোশাক কারখানা ‘রেমি হোল্ডিংস লিমিটেড’।

গত শনিবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বিজ্ঞাপনী প্রতিষ্ঠান বিটপি গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান রেমি হোল্ডিংস লিমিটেডকে তৈরি করা হয়েছে সবুজ পরিবেষ্টিত বিশ্বের আধুনিক সব যন্ত্রপাতি দিয়ে। কারখানার চারপাশে প্রচুর খালি জায়গা। লাগানো হয়েছে বিভিন্ন ধরনের সবুজ গাছপালা। কারখানায় শ্রমিকদের স্বস্তির জন্য রাখা হয়েছে নিয়ন্ত্রিত নির্দিষ্ট তাপমাত্রা। মনোরম পাঁচ তলা ভবনে এক হাজার ৫০০ শ্রমিক ক্লান্তিহীনভাবে কাজ করছে। তারাই প্রতিদিন তৈরি করছে ১৫ হাজার পিস পোশাক।

কারখানা কর্তৃপক্ষ জানায়, রেমি হোল্ডিংস নারায়ণগঞ্জের আদমজী ইপিজেড এবং বেপজার সদস্য। ১৩৩ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০১৪ সালের মাঝামাঝি এই কারখানা নির্মাণের কাজ শুরু হয়। এক হাজার ৫০০ কর্মী কাজ করছে এই কারখানায়। তবে ভবিষ্যতে প্রায় সাড়ে তিন হাজার কর্মী কাজ করতে পারবে বলে জানায় কর্তৃপক্ষ।

প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিরান আলী কালের কণ্ঠকে বলেন, “প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে আমরা ব্যবসা করে আসছি। আমাদের নতুন উদ্যোগ রেমি হোল্ডিংস লিমিটেড বিশ্বের এক নম্বর পরিবেশবান্ধব কারখানা হিসেবে ‘এলইইডি প্লাটিনাম’-এর স্বীকৃতি অর্জন করেছে। এলইইডি রেটিং পয়েন্টে ১১০-এর মধ্যে রেমি হোল্ডিংস সর্বোচ্চ নম্বর ৯৭ পয়েন্ট পেয়ে সেরা হয়েছে।” তিনি বলেন, ‘এই গৌরব শুধু রেমি হোল্ডিংস বা বিটপি গ্রুপের নয়; এই গৌরব এই খাতের সবার এবং পুরো বাংলাদেশের।’

মিরান আলী জানান, স্বল্প কার্বন নিঃসরণে রেমি হোল্ডিংস মাইলফলক স্থাপন করেছে। কারখানায় ব্যবহার করা হয়েছে সৌরবিদ্যুৎ, হাই ভেলোসিটি লো স্পিড ফ্যান, সরাসরি দিনের আলোর ব্যবহারসহ নানা প্রযুক্তি। ইনসিনারেশন বয়লার ব্যবহার করে স্টিম তৈরি করার প্রযুক্তি বাংলাদেশে এটাই প্রথম। থারমাল অয়েল হিটার প্রযুক্তি ব্যবহারে রক্ষা পাচ্ছে প্রচুর জ্বালানি। বৃষ্টির পানি ধরে রেখে সেই পানি ব্যবহার করবে রেমি হোল্ডিংস, এতে পানির অপচয় কমবে। সব মিলিয়ে ৩৭ শতাংশ জ্বালানি সাশ্রয় করছে রেমি হোল্ডিংস লিমিটেড। সামনে পানি রিসাইক্লিং করার প্রযুক্তিও যুক্ত করা হবে এই কারখানায়। শিশুদের জন্য ডে-কেয়ার সেন্টারও আছে এখানে। কারখানার ছাদে, সামনের খোলা অংশে এবং ভবনের ভেতরেও করা হয়েছে বাগান। পর্যাপ্ত অক্সিজেন কর্মীদের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করবে।

কেমন আছে শ্রমিকরা জানতে চাইলে কারখানার ফিনিশিং বিভাগের কর্মী মো. সিদ্দিকুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, কারখানার কর্মপরিবেশ যেমন শ্রমিকদের জন্য পরিবেশবান্ধব, একই সঙ্গে বিভিন্ন সুবিধাদিও অন্যান্য বাইরের কারখানা থেকে একটু বেশি। মালিকপক্ষ কর্মীদের নিয়মিত খোঁজখবর রাখে এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করতে দ্বিধা করে না।

বিজিএমইএ সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশের আগে ভিনটেজ ডেনিম এবং প্লামি ফ্যাশনস লিমিটেড এই প্লাটিনাম সনদ অর্জন ছাড়া প্রায় ১০টি প্রতিষ্ঠান প্লাটিনাম সনদ অর্জন করেছে। এ ছাড়া ৩০টির বেশি কারখানা এলইইডি সনদ পেয়েছে। আর ১০০টিরও বেশি কারখানা গ্রিন বিল্ডিংয়ের জন্য আবেদন করেছে।