দশ টাকা কেজির চাল পাচ্ছে হতদরিদ্র ৫০ লাখ পরিবার

আগামী ৭ সেপ্টেম্বর থেকে ‘খাদ্যবান্ধব কর্মসূচী’র আওতায় দেশের ৫০ লাখ হতদরিদ্র পরিবারকে ১০ টাকা দরে মাসে ৩০ কেজি চাল দেবে সরকার। সচিবালয়ে রবিবার খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ কমিটির সভায় এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। আগামী ৭ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কুড়িগ্রাম জেলার চিলমারী উপজেলায় এ কর্মসূচীর উদ্বোধন করবেন। এ কর্মসূচীর মাধ্যমে আওয়ামী লীগের ১০ টাকা কেজি দরে চাল খাওয়ানোর প্রতিশ্রুতি পূরণ হতে যাচ্ছে। দেশের অন্তত ৫০ লাখ হতদরিদ্র পরিবার এ সুবিধা পেতে যাচ্ছে।

বৈঠক শেষে খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম বলেন, হতদরিদ্রদের মধ্যে প্রতি পরিবারকে মাসে ৩০ কেজি করে চাল দেয়া হবে ১০ টাকা মূল্যে বা সুলভ মূল্যে। সারাদেশে ৫০ লাখ পরিবারকে ৩০ কেজি করে চাল দেয়া হবে। বছরে ৫ মাস এ খাদ্য সহায়তা দেয়া হবে জানিয়ে কামরুল ইসলাম বলেন, চলতি সেপ্টেম্বর, অক্টোবর, নবেম্বর এবং পরবর্তীতে মার্চ ও এপ্রিল মাসে চাল দেয়া হবে। যে পাঁচ মাস মানুষের কষ্ট হয়, চালের দাম একটু বাড়তির দিকে থাকে, গরিব মানুষের একটু কষ্ট হয়, সেই পাঁচ মাস ৩০ কেজি করে চাল দেয়া হবে।

এ কর্মসূচীর মাধ্যমে বছরে সাড়ে ৭ লাখ টন চাল বিতরণ হবে জানিয়ে খাদ্যমন্ত্রী বলেন, এ প্রোগ্রামের নামকরণ করা হয়েছেÑ ‘খাদ্যবান্ধব কর্মসূচী’। একটা সেøাগান ঠিক করা হয়েছে। তা হলোÑ ‘শেখ হাসিনার বাংলাদেশ/ক্ষুধা হবে নিরুদ্দেশ।’ এ সেøাগান ধারণ করে আমরা এ কর্মসূচী ৭ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু করতে যাচ্ছি।

‘খাদ্যবান্ধব কর্মসূচী’র উপকারভোগীদের কিভাবে নির্ধারণ করা হবেÑ জানতে চাইলে কামরুল ইসলাম বলেন, ‘নীতিমালা অনুযায়ী প্রত্যেক উপজেলায় ইউএনও’র নেতৃত্ব কমিটি আছে। কমিটিতে উপজেলা চেয়ারম্যান, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রয়েছেন। তারাই কমিটি ঠিক করে দেবেন। প্রতি ৫০০ পরিবারের কাছে চাল বিতরণের জন্য একজন ডিলার হবেন। নীতিমালা অনুযায়ী কমিটি কার্ড বণ্টন করবে এবং ডিলার নিয়োগ করবে। খাদ্যমন্ত্রী বলেন, আমরা সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দেব যে পরিবারের দায়িত্বে নারী আছেন, নারীপ্রধান পরিবার, যে পরিবারে প্রধান বিধবা নারী বা প্রতিবন্ধী নারী।

চলতি বোরো মৌসুমে সরকারের ৭ লাখ টন ধান ও ৬ লাখ টন চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, পরবর্তীতে আমরা আরও আড়াই লাখ টন বাড়িয়েছি। ৮ মেট্রিকটন চাল ও ৭ লাখ মেট্রিকটন ধান সংগ্রহের টার্গেট ছিল আমাদের। আমরা আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে, এবারই প্রথম বাংলাদেশে কৃষকরা সবচেয়ে বেশি ‘বেনিফিটেড’ হয়েছে, প্রণোদনা পেয়েছে। তাদের কাছ থেকে আমরা প্রায় ৭ লাখ টন ধান সংগ্রহ করতে পেরেছি। চাল সংগ্রহ অভিযান চলছে। ইতোমধ্যে ৩ লাখ টন চাল গুদামে চলে এসেছে। আরও চালকল মালিকদের সঙ্গে আমাদের চুক্তিপত্র স্বাক্ষরিত হয়ে গেছে। কাজেই আমরা আমাদের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারব বলে আশা করছি। এ বিষয়গুলো আমরা মিটিংয়ে অবহিত করেছি। খাদ্যমন্ত্রীর সভাপতিত্বে সভায় অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেনসহ কমিটির অন্যান্য সদস্য উপস্থিত ছিলেন।

রাজুমোস্তাফিজ কুড়িগ্রাম থেকে জানান, জোড়গাছ গ্রামের চল্লিশোর্ধ দিনমজুর রমজান আলী ও তৈয়ব আলী জমিতে কাজ করছিলেন। তারা জানান, শুনেছেন আগামী ৭ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চিলমারী শহরে থানাহাট স্কুল মাঠে আসবেন। এখানে তিনি ইউনিয়ন ফেয়ার প্রাইস হতদরিদ্রের জন্য খাদ্যবান্ধব কর্মসূচীর উদ্বোধন করবেন। এতে তাদের মতো দিনমজুররা মাত্র ১০ টাকায় প্রতি কেজি চাল কিনতে পারবেন রেশন কার্ডের মাধ্যমে। এতে খুশি দিনমজুর শ্রেণীর মানুষ। তারা বলেন, বঙ্গবন্ধুর বেটি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্য এটা সম্ভব হয়েছে। নির্বাচনের সময় তিনি যা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তা তিনি এবার রক্ষা করলেন। চিলমারী উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নসহ উপজেলা শহরে প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে এখন সাজ সাজ রব। দিনমজুররা দারুণ খুশি। থানাহাটের মর্জিনা বেগম (৩৬), আয়েশা বেগম (৪২), রহিমা বেওয়া (৪৯) জানান, আমরাতো বিশ^াস করতে পারছি না, এটা কি করে সম্ভবÑ সরকার ১০ টাকায় চাল বিক্রি করবে! তাদের মতে, বর্তমান সরকার গরিব মানুষদের ভাগ্য নিয়ে চিন্তা করে বলেই এটাও সম্ভব হলো। এ কর্মসূচী দীর্ঘদিন চলুকÑ এ প্রত্যাশা ওই সব মানুষের।

কুড়িগ্রাম শহর থেকে প্রায় ৩৩ কিমি দূরে ব্রহ্মপুত্র নদের অববাহিকায় চিলমারী উপজেলা। অষ্টমীর চর, রানীগঞ্জ, নয়ারহাট, থানারহাট, রমনা ও চিলমারীসহ ছয়টি ইউনিয়ন নিয়ে এটি অবস্থিত। এক সময় চিলমারী বন্দর বিখ্যাত ছিল। আব্বাসউদ্দিনের মরমী ভাওয়াইয়া গান ‘ওকি গাড়িয়াল ভাই হাঁকাও গাড়ি তুই চিলমারীর বন্দরে’ আজও মানুষের মুখে মুখে ফেরে। উপজেলায় লোকসংখ্যা ১ লাখ ৩৯ হাজার। নদীবেষ্টিত চিলমারীর মানুষ ভাঙ্গা-গড়ার সঙ্গে নিত্য অভ্যস্ত। নদী ভাঙ্গনে তাদের ভাগ্যের উন্নয়ন আজও হয়নি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দরিদ্রতম এ উপজেলার মানুষের ভাগ্যের উন্নয়নের জন্যই হতদরিদ্রদের খাদ্যবান্ধব ফেয়ার প্রাইস কর্মসূচীর উদ্বোধন করবেন। কুড়িগ্রাম জেলার ৯টি উপজেলায় ১ লাখ ২৫ হাজার ২শ’ ৭৯ জনের মধ্যে চিলমারীতে ৮ হাজার ২১ জন এ সুবিধা পাবেন। এ কর্মসূচীর আওতায় দেশের ৫০ লাখ মানুষ ১০ টাকা মূল্যে ৩০ কেজি চাল ক্রয়ের সুবিধা পাবে প্রতি বছর ৫ মাস করে।

এবারের বন্যায় জেলার সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত উপজেলা চিলমারী। প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে সর্বস্তরের মানুষের মাঝে উৎসাহ-উদ্দীপনা বিরাজ করছে। প্রধানমন্ত্রীর আগমনের কথা শুনে আশার সঞ্চার ঘটেছে উপজেলাবাসীর। তার সফর স্মরণীয় করে রাখতে নতুন সাজে সাজছে চিলমারী উপজেলা। চলছে বাসাবাড়ি, বিভিন্ন সরকারী অফিস রং করা, পথ-ঘাট মেরামত, গেট, ব্যানার-ফেস্টুন নির্মাণের কাজ। কারও যেন কোন অবসর নেই। আগামী ৭ সেপ্টেম্বর সকাল ১০টায় চিলমারীর থানাহাট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইউনিয়ন ফেয়ার প্রাইস হতদরিদ্রের জন্য খাদ্যবান্ধব কর্মসূচীর উদ্বোধন করবেন। মাঠে তৈরি হচ্ছে বিশাল মঞ্চ। যার তত্ত্বাবধান করছেন জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সম্পাদক সাবেক এমপি মোঃ জাফর আলী। প্রতিদিন বিভিন্ন সংস্থার উর্ধতন কর্মকর্তারা আসছেন। বিভিন্ন মহড়া দিচ্ছেন। নিñিদ্র নিরাপত্তার জন্য দিন-রাত কাজ করছেন বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তারা। জেলা আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ প্রতিদিন মিছিল-মিটিং করছেন। চাঙ্গা হয়েছে উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ। চিলমারী উপজেলার রমনা এলাকার পশু ডাক্তার মোঃ মোহিত জানান, নদী ভাঙ্গন, খরা আর বন্যাসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ লেগে থাকে এ জেলায়। বছরের অধিকাংশ সময় মানুষের হাতে কাজ থাকে না। মহাজোট সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে এ জেলাকে অন্তর্ভুক্ত করায় সারা জেলার মতো এখানকার মানুষও খুব খুশি। তিনি ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রীকে। তার মতে, মানুষকে ১০ টাকা করে বর্তমান সরকার চাল দেবে এটা এখনও সাধারণ মানুষ কল্পনা করতে পারে না।

জেলা পরিষদের প্রশাসক ও জেলা আওয়ামী লীগের সম্পাদক জাফর আলী জানান, মহাজোট সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী দেশের মানুষকে ১০ টাকা কেজি চাল খাওয়ানোর বাস্তবায়ন করছেন জননেত্রী শেখ হাসিনা। প্রতিবছর মার্চ, এপ্রিল, সেপ্টেম্বর, অক্টোবর ও নবেম্বরÑ এ ৫ মাস প্রথম অবস্থায় ফেয়ার প্রাইসে চাল কিনতে পারবে কুড়িগ্রাম ও গোপালগঞ্জবাসী। পর্যায়ক্রমে দেশের অন্যান্য জেলায় এ কর্মসূচী বাস্তবায়ন হবে।

জেলা প্রশাসক খান মোঃ নুরুল আমিন জানান, প্রধানমন্ত্রীর সফর সুষ্ঠু করতে ইতোমধ্যে নিরাপত্তার চাদরে মুড়িয়ে ফেলা হয়েছে চিলমারীকে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠান সফল করার জন্য প্রস্তুত প্রশাসন ও চিলমারীবাসী।