বঙ্গবন্ধুর প্রদর্শিত পথে প্রাথমিক শিক্ষার অগ্রযাত্রা

স্বাধীনতার মহান স্থপতি হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’ যে নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে কোটি বাঙালির হৃদয়ে। বাঙালির শিক্ষা-সাংস্কৃতিক, আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক উন্নয়নে যিনি ছিলেন নিবেদিত প্রাণ।

জাতির জনক অনুভব করেছিলেন, দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য, উন্নয়নের জন্য, সাধারণ মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ‘শিক্ষা’। বিশেষ করে প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়ন ছাড়া জাতীয় শিক্ষার ভিত মজবুত করা সম্ভব হবে না। এক সময় ধারণা ছিল ‘শিশুরা শুধু খায়, ঘুমায় আর খরচ করে’। টোল, মক্তব, মাদ্রাসা, পাঠশালার শিক্ষা, ব্রিটিশ ভারতের-পাকিস্তানের শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে ১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গবন্ধু প্রাথমিক শিক্ষা জাতীয়করণের ঘোষণা দেন। ৩৭ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয় সরকারিকরণের ঘোষণা, যা ছিল একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত। আর্থ-সামাজিক-সাংস্কৃতিক টানাপড়েনের মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়ন ছিল একটি কঠিন চ্যালেঞ্জ। জাতির পিতার অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করার জন্য তাঁরই সুযোগ্য কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা আর একধাপ এগিয়ে ২৫ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়কে জাতীয়করণ করে প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়নের ক্ষেত্রে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

বঙ্গবন্ধু গঠন করেন শিক্ষা কমিশন, নির্মাণ করেন অবকাঠামো, যোগান দেন আসবাবপত্র, শিক্ষকদের চাকরি জাতীয়করণ করেন। ধীরে ধীরে শুরু হয় প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন যার সুফল ধারাবাহিকভাবে অব্যাহত আছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শতভাগ শিশু ভর্তি, আনন্দঘন পরিবেশে পাঠদান, ১ জানুয়ারি বই বিতরণ, পরিকল্পনা অনুযায়ী উপকরণের ব্যবহার বৃদ্ধি, শিক্ষার্থী উপস্থিতির হার বৃদ্ধি, একীভূত শিক্ষা চালু, ঝরে পড়ার হার কমিয়ে আনা, পঞ্চম শ্রেণির সমাপনী পরীক্ষায় শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ ও উত্তীর্ণের হার বৃদ্ধি, শিক্ষার জন্য উপবৃত্তি প্রদান, বৃত্তির সংখ্যা ও টাকার পরিমাণ বৃদ্ধি, মাল্টিমিডিয়া ব্যবহার করে পাঠদান, মিড-ডে-মিল চালুকরণ, ডিজিটাল এটেনডেন্স, ওয়াশব্লুক তৈরি, বহুতল ভবন নির্মাণ, র‌্যাম্প তৈরি, আসববাবপত্র সরবরাহ, ঝখওচ (¯িøপ) কার্যক্রম চালু, শিক্ষক নিয়োগ, প্রশিক্ষণ প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণি চালুকরণ, সব কার্যক্রমের লক্ষ্য মানসম্মত যোগ্যতাভিত্তিক প্রাথমিক শিক্ষার বাস্তবায়ন- এসব এখন স্বপ্ন নয় বাস্তব। এসবের পুরোপুরি বাস্তবায়ন সম্পন্ন হলে প্রাথমিক শিক্ষা ক্ষেত্রে ঘটবে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন। শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পাঠদানের পাশাপাশি সহশিক্ষা ক্রমিক কার্যাবলি- খেলাধুলা, নাচ-গান, আবৃত্তি, চিত্রাঙ্কন ইত্যাদিতে পারদর্শী করে তোলার চেষ্টা চলছে। ইতোমধ্যে ‘বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপ প্রাথমিক বিদ্যালয় ফুটবল টুর্নামেন্ট’ এবং ‘বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব গোল্ডকাপ প্রাথমিক বিদ্যালয় টুর্নামেন্ট’-এ আমাদের শিক্ষার্থীরা চমৎকার নৈপুণ্য প্রদর্শন করতে সক্ষম হয়েছে। সব প্রাথমিক বিদ্যালয় এই খেলায় অংশ নেয়। চূড়ান্ত পর্যায়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিজয়ীদের মধ্যে পুরস্কারও প্রদান করেন।

পাঠ্যবইয়ের যোগ্যতা অর্জনের পাশাপাশি শিক্ষার্থীর চরিত্র গঠন, নৈতিকতা, আদশর্, উচ্চমূল্যবোধ, সৌভ্রাতৃত্ববোধ, পারস্পরিক সহযোগিতা-সহমর্মিতা, মানবিকতা, জাতীয় শুদ্ধাচার বিষয়ে শিক্ষা দেয়ার উল্লেখযোগ্য কার্যক্রম প্রাথমিক স্তরে চালু আছে। একটি বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী যদি মানুষের মতো মানুষ হয়ে ওঠে, তাহলে ওই এলাকার সার্বিক চিত্র পাল্টে যেতে পারে। শিক্ষার্থীরা মানুষ হলে, বাবা-মায়ের সেবা করবে, এলাকাবাসীর দুঃখকষ্টে ভাগীদার হবে। শিক্ষকদের, বড়দের সম্মান, ছোটদের স্নেহ করবে, ভালোবাসবে এমন শিক্ষার্থীই আমরা গড়ে তুলতে চাই। এক সময়ের প্রবাদ, মায়ের সন্তান যেন থাকে ‘দুধে-ভাতে’, এর সঙ্গে যোগ করে এখন থেকে বলতে চাই মায়ের সন্তান যেন থাকে ‘পড়া লেখা, খেলাধুলা আর সুস্বাস্থ্যের মাঝে’।

দুই.

শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, শিল্প-সাহিত্য, অর্থনৈতিক, গণতান্ত্রিক, সামাজিক রাজনৈতিক উন্নয়নে দেশ যখন এগিয়ে চলছে ঠিক তখনই দেশি বিদেশি চক্রান্ত দেশকে পেছনের দিকে ঠেলে দেয়ার চেষ্টা করেছে। পলাশীর প্রান্তরে নবাব সিরাজউদ্দৌলার নির্মম হত্যা, জাতির জনকের বুকে ঘাতকের বুলেটের আঘাত একই সূত্রে গাঁথা। বাঙালির অগ্রযাত্রা বাধাগ্রস্ত করার ষড়যন্ত্র বারবার হয়েছে।

পাকিস্তানিরা আত্মসমর্পণ করলে ১৬ ডিসেম্বর দেশ হানাদার মুক্ত হয়। বাঙালির বিজয় লাভ হয়। ১৯৭২-এর ১০ জানুয়ারি জাতির জনক দেশের মাটিতে পা রাখেন। বঙ্গবন্ধুর সন্তানরা, বাংলার মানুষরা বঙ্গবন্ধুকে জড়িয়ে ধরে দুঃখ কষ্টের পরিত্রাণ পান। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাকে পুনর্গঠনে মনোযোগী হন। অন্য সব কাজের পাশাপাশি প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নে বঙ্গবন্ধু প্রাথমিক শিক্ষাকে ১৯৭৩ খ্রি. জাতীয়করণ করেন। ধীরে ধীরে বঙ্গবন্ধু স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়তে থাকেন। বিশ্ববাসীর কাছে বাংলাদেশ গৌরবময় দেশে পরিণত হতে থাকে। এরই মধ্যে ১৯৭৪-এ দেশি-বিদেশি চক্রান্তে দেশে কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করা হয়। আবার শুরু হয় দুঃখিনী বাংলা মায়ের দুঃখ গাথা। সারা জীবন যে মহান নেতা বাংলার মানুষকে আশা দিয়ে, ভালোবাসা দিয়ে, সর্বস্ব উজাড় করে দিয়ে গড়তে চেয়েছেন সুখী সমৃদ্ধ সোনার বাংলা, রচনা করতে চেয়েছেন উন্নত বাংলাদেশের সীমা, সেই মহান নেতাকেই আঘাত করা হলো। ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম রাত, কতিপয় বাঙালি নামধারী বিপথগামী ঘাতকের বুলেট কেড়ে নিল হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রাণ। ঘাতকরা পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস ১৪ আগস্টেই জঘন্য কাজটি করতে চেয়েছিল। বিভিন্ন কারণে সময়টা পিছিয়ে ছিল। ১৫ আগস্টে মহান নেতার মহাপ্রয়াণে এতিম হয়েছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা আর পিতৃহারা হয়েছে বাংলাদেশ, বাঙালি জাতি। যে নেতা সারা জীবন দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়েছেন সেই পিতার মৃত্যু বাঙালি সন্তানের কাছে ভয়াবহ শোকের বোঝা। বঙ্গবন্ধু এবং তার স্বজনদের রক্ত স্রোত ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাড়ি থেকে অজস্র ধারায় বয়ে মিলেছে বাংলার মাটিতে। বাঙালির হৃদয়ে বেদনার ক্ষত সৃষ্টি করেছে।

ভালোবাসি বঙ্গবন্ধুকে বিশ্বাস করি এই মহান নেতার আদর্শকে, তাই তাঁকে জানাই গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি। আজ জাতীয় শোক দিবসে সবার প্রতি বিনীত আবেদন জানাই, এ সারা জীবন তাই অন্য সব কাজের সাথে রচি প্রাথমিক শিক্ষার সীমা। আশা দিয়ে, ভাষা দিয়ে, স্নেহ-ভালোবাসা, মায়া-মমতা দিয়ে, পরিকল্পনা দিয়ে জ্ঞান-কর্ম দিয়ে গড়ে তুলি ‘যোগ্যতাভিত্তিক মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা’। তাহলে স্বাধীনতার মহান স্থপতি হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাক্সিক্ষত সুখী সমৃদ্ধ সোনার বাংলা গড়ে তোলা সম্ভব হবে। বিশ্ব সভায় বাংলাদেশ পাবে তার যোগ্য মর্যাদা, আত্মতৃপ্তি লাভ করবেন বাংলার মানুষ এবং বাংলার মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা।
বিমল রায় : শিক্ষা বিভাগের কর্মকর্তা, লেখক।