ব্যয়বহুল এলিভেটেড ওয়াকওয়ে নির্মাণের উদ্যোগ ডিএসসিসির

ঢাকার জনসংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। তবে বাড়ছে না হাঁটার পথ। যেগুলো আছে, নানা অব্যবস্থাপনার কারণে তাও চলাচলের অনুপযোগী। তাই নগরীর মানুষের ভোগান্তি কমাতে হংকং শহরের মডেলে ঢাকায় এলিভেটেড ওয়াকওয়ে (উড়াল ফুটপাত) নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। তবে বাংলাদেশের মতো দরিদ্র দেশে এ ধরনের ব্যয়বহুল প্রকল্প অনেকটা বিলাসী বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

জানা গেছে, সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে নগরীর প্রতিটি ব্যস্ত সড়কে এলিভেটেড ওয়াকওয়ে নির্মাণের পরিকল্পনা থাকলেও প্রথমটি নির্মাণ হবে ঢাকার গুলিস্তানে। এরই মধ্যে এ প্রকল্পের নকশা প্রণয়ন করছে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘দেব কনসালট্যান্ট’, যা যাচাই-বাছাইয়ের কাজ চলছে। ১ হাজার ১২০ মিটার দীর্ঘ এ এলিভেটেড ওয়াকওয়েতে থাকবে ১০টি স্কেলেটর ও ১৬টি সিঁড়ি। প্রাথমিকভাবে এটি নির্মাণে ১০০ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হলেও পরে তা আরো বাড়বে বলে ধারণা করছে ডিএসসিসি। আগামী বছরের জানুয়ারিতে প্রকল্পটির কাজ শুরু হওয়ার কথা রয়েছে, যা শেষ হবে ২০১৮ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে।

সচিবালয়ের সামনে থেকে জিরো পয়েন্ট হয়ে বায়তুল মোকাররম-গুলিস্তান-আহাদ পুলিশ বক্স থেকে বঙ্গবন্ধু এভিনিউ-গোলাপ শাহ মাজার পর্যন্ত বিস্তৃত হবে এলিভেটেড ওয়াকওয়ে। এ পাইলট প্রকল্পের সাফল্যের ওপর ভিত্তি করে পরবর্তীতে নিউমার্কেট, সদরঘাট ও মতিঝিলেও এ ধরনের এলিভেটেড ওয়াকওয়ে নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে ডিএসসিসির।

তবে সমন্বিত পরিকল্পনা ছাড়াই এ ধরনের অবকাঠামো কতটুকু সুফল বয়ে আনবে, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ এর আগে অপরিকল্পিতভাবে নির্মাণ করা হয়েছে অনেক ফুটওভার ব্রিজ। ভুল নকশায় নির্মিত এসব ফুটওভার ব্রিজের অধিকাংশই অব্যবহূত থাকছে এখন। এ অবস্থায় এলিভেটেড ওয়াকওয়ের মতো ব্যয়বহুল প্রকল্পকে অনেকটা বিলাসী উদ্যোগ মনে করছেন তারা।

এ বিষয়ে নগর গবেষণা কেন্দ্র ঢাকার চেয়ারম্যান অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, এলিভেটেড ওয়াকওয়ে হলো সবচেয়ে ধনী শহর হংকংয়ের মডেল। আর ঢাকা হচ্ছে সবচেয়ে গরিব শহর। ঢাকার স্ট্রাকচার প্ল্যানেও এ ধরনের পরিকল্পনা নেই। এলিভেটেড ওয়াকওয়ের মতো ব্যয়বহুল প্রকল্প সঠিক পরিকল্পনায় না হলে তার উদ্দেশ্য ব্যর্থ হবে। বাংলাদেশের মতো দেশে এ ধরনের প্রকল্প হাতে নেয়ার সময় এখনই হয়েছে বলে আমি মনে করি না।

রাজধানীর প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ যাতায়াত করে হেঁটে, ফুটপাত দিয়ে। রাজধানীর মোট ট্রিপের (যাতায়াত) প্রায় ১৮ শতাংশ হয় হেঁটে। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) তৈরি ঢাকা স্ট্রাকচার প্ল্যানের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে রাজধানীতে মোট ট্রিপ হয় প্রায় সাড়ে তিন কোটি। এর মধ্যে ১৭ দশমিক ৭ শতাংশ হয় হেঁটে। নিরাপদ রাস্তা পারাপারের জন্য রাজধানীতে ছোট-বড় মিলিয়ে ফুটওভার ব্রিজের সংখ্যা এখন ৯০। এসব স্থাপনা নির্মাণে বিনিয়োগ হয়েছে প্রায় ২০০ কোটি টাকা। কিন্তু ভুল পরিকল্পনার কারণে শেষ পর্যন্ত কোনো কাজেই আসছে না সরকারের এ বিনিয়োগ। পথচারীদের অস্বস্তির কারণে অধিকাংশ ফুটওভার ব্রিজই থেকে যাচ্ছে অব্যবহূত। এর মধ্যে অনেকগুলো আবার পরিণত হয়েছে ছিন্নমূলদের আবাসস্থলে, কিছু আছে হকারদের দখলে। কিন্তু পথচারীদের অস্বস্তি দূর না করেই একের পর এক ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ অব্যাহত আছে এখনো। এভাবে ব্যস্ত সড়কগুলো দখল করে একের পর এক ফুটওভার ব্রিজ, ফ্লাইওভার ও আন্ডার পাস বানানোয় পথচারীদের ভোগান্তি আরো বেড়েছে। তাই বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে এলিভেটেড ওয়াকওয়ের মতো বিলাসী প্রকল্প পথচারীদের ভোগান্তি কতটা কমাবে, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।

তবে এলিভেটেড ওয়াকওয়ের নির্মাণ প্রকল্পকে বিলাসী বলতে নারাজ ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা খান মোহাম্মদ বিলাল। তিনি বলেন, প্রকল্পটি ব্যয়বহুল, তবে বিলাসী নয়। ঢাকার মতো জনবহুল শহরের জন্য এটা দরকারি। পাইলট আকারে প্রথম এলিভেটেড ওয়াকওয়েটি হবে রাজধানীর গুলিস্তানে। সফলভাবে পরিচালিত হলে নগরীর ব্যস্ত পয়েন্টগুলোতেও এটি নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। নগরীবাসীকে নিরাপদে নিরবচ্ছিন্নভাবে চলাচলের সুযোগ করে দিতেই আমাদের এ উদ্যোগ।