মেগা প্রকল্পে পাল্টে যাবে চট্টগ্রামের চেহারা

দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম নগরী চট্টগ্রাম। অর্থনীতির লাইফলাইনের বড় বড় স্থাপনা এখানে গড়ে উঠেছে। গুরুত্ব বিবেচনায় চট্টগ্রাম পেয়েছে বাণিজ্যিক রাজধানীর খ্যাতি। সামগ্রিক উন্নয়নসহ নাগরিক সেবা বৃদ্ধির বড় বড় প্রকল্প নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক)। নগরীর সুন্দর আগামীর জন্য চসিক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনের নেয়া পদক্ষেপ এরই মধ্যে প্রশংসা পেয়েছে। মেয়র বলেছেন, হাজার হাজার কোটি টাকার মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে চট্টগ্রাম নগরীর চিত্র বদলে যাবে। উন্নয়ন ও নাগরিক সেবা বাড়িয়ে নগরীকে পাল্টে দেয়ার স্বপ্ন দেখছেন তিনি। এসব বিষয়ে তিনি আলোকিত বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ব্যুরো প্রধানের (ভারপ্রাপ্ত) সঙ্গে খোলামেলা কথা বলেছেন।
সাক্ষাৎকার গ্রহণে সাইফুদ্দিন তুহিন।
আলোকিত বাংলাদেশ : নগরীর বড় সমস্যা জলাবদ্ধতা। দীর্ঘদিনের এ সমস্যা নিরসনে চসিক কী উদ্যোগ নিয়েছে?
আ জ ম নাছির উদ্দীন : জলাবদ্ধতা নিরসনে চসিক চার হাজার ৩০০ কোটি টাকার মেগা প্রকল্প হাতে নিতে যাচ্ছে। বাস্তবায়ন হতে লাগবে ৭ বছর। এ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে পাল্টে যাবে নগরীর চেহারা। জলাবদ্ধতা সংকট আর থাকবে না। তবে জলাবদ্ধতার জন্য কিছু ভৌগোলিক কারণ দায়ী। বিশেষ করে চট্টগ্রাম শহর পাহাড়ঘেরা। পুরনো খালগুলো দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার করা হয়নি। গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে দিন দিন। সব মিলে নগরীতে প্রাকৃতিকভাবেই জলাবদ্ধতার প্রকোপ দেখা দিচ্ছে। আমি দায়িত্ব নেয়ার পর নগরীকে দীর্ঘদিনের এ নাগরিক দুর্ভোগ লাঘবে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। হাত দিয়েছি মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে। এ বিষয়ে করণীয় নির্ধারণে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করছি। পানিসম্পদমন্ত্রীকেও অনুরোধ করেছি। সংকট নিরসনে এরই মধ্যে একটি ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট প্রফর্মা (ডিপিপি) তৈরি করেছি। এ প্রকল্পের আওতায় ভরাট খালগুলো খনন করে আগের অবস্থানে ফিরিয়ে আনা হবে। এ পর্যায়ে ২৬টি খাল খনন করতে হবে। নগরীর চারপাশে ১২০ ফুট চওড়া বেড়িবাঁধ হবে। ভেঙে পড়া ড্রেনেজ ব্যবস্থা পুরোপুরি সচল করা হবে। নির্মাণ করা হবে সøুইস গেট। বেড়িবাঁধ হলে নদী থেকে নগরীতে জোয়ারের পানি অবাধে প্রবেশ ঠেকানো যাবে। পাশাপাশি বেড়িবাঁধের ওপর দিয়ে লোকজনের চলাচলের ব্যবস্থা হবে। এতে নগরীর ওপর কমে আসবে চাপ।
আলোকিত বাংলাদেশ : চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ বাস্তবায়ন করছে ক্যাপিটাল ড্রেজিং। এ প্রকল্পের আওতায় কর্ণফুলী নদী ড্রেজিং করা হচ্ছে। কিন্তু প্রকল্পের কাজ থমকে যাওয়ায় ব্যাহত হচ্ছে নদী খনন। এ ব্যাপারে চসিক বন্দরকে প্রকল্প বাস্তবায়ন দ্রুত করতে তাগাদা দিচ্ছে কিনা?
আ জ ম নাছির উদ্দীন : ক্যাপিটাল ড্রেজিং শেষ হলে কর্ণফুলীর গভীরতা বাড়বে। এতে নগরীতে জলাবদ্ধতার প্রকোপ কমতে ভূমিকা রাখতে পারে। প্রকল্পটি দ্রুত বাস্তবায়ন হলে ভালো। কিন্তু এটি বাস্তবায়ন করছে চট্টগ্রাম বন্দর। এখানে চসিকের বেশি কিছু করার সুযোগ নেই। তবে চসিকের পক্ষ থেকে ক্যাপিটাল ড্রেজিং বাস্তবায়নের জন্য বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে তাগাদা দেয়া হয়েছে।
আলোকিত বাংলাদেশ : নগরীকে বিলবোর্ডের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দিতে আপনার ভূমিকা নাগরিক সমাজে প্রশংসা কুড়িয়েছে। বিলবোর্ড উচ্ছেদের মতো নতুন কোনো আলোচিত উদ্যোগ কবে শুরু হবে?
আ জ ম নাছির উদ্দীন : বিলবোর্ড উচ্ছেদ করে নগরীর সৌন্দর্য বৃদ্ধি করা হয়েছে। এ ব্যাপারে কখনও কোনোভাবে ছাড় দেয়া হবে না। ভবিষ্যতেও বিলবোর্ড স্থাপনের অনুমতি দেয়া হবে না। বিলবোর্ড আবার স্থাপন হবেÑ এ ধরনের প্রচারণা যারা চালাচ্ছে, তারা অপপ্রচার করছে। বিলবোর্ড উচ্ছেদের ‘ম্যাসিভ উচ্ছেদ’ অভিযান পরিচালনা শুরু হবে সেপ্টেম্বরে। এ অভিযানের সময় নগরীর সড়ক মোড় থেকে অবৈধ স্থাপনাগুলো উচ্ছেদ করা হবে। নগরীতে জেঁকে বসা হকারদের জন্য সময় নির্ধারণ করে দেয়া হবে। নির্ধারিত সময়ে তারা বসতে পারবেন। আবার ওই সময়ের পর পসরা থেকে উঠে যেতে হবে। তাদের পুনর্বাসনের বিশেষ কোনো পরিকল্পনা নেই।
আলোকিত বাংলাদেশ : বড় বড় প্রকল্পে সময়মতো অর্থ বরাদ্দ পাওয়া গেলে প্রকল্প কাজ দ্রুত এগিয়ে যায়। চসিক প্রকল্পের বিপরীতে অর্থ বরাদ্দ সময়মতো পাচ্ছে কিনা?
আ জ ম নাছির উদ্দীন : চট্টগ্রাম দেশের গুরুত্বপূর্ণ একটি নগরী। দেশের লাইফলাইনও এখানে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চট্টগ্রামের উন্নয়নের বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখেন। চসিক নগরীর উন্নয়নে বহু প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে, যেখানে বহু অর্থের প্রয়োজন। যেহেতু প্রধানমন্ত্রী চট্টগ্রামের উন্নয়নের ব্যাপারে আন্তরিক, তাই প্রকল্প কাজগুলো এগিয়ে নিতে অর্থের জোগানও মিলছে। প্রধানমন্ত্রী চান চট্টগ্রাম বিশ্বমানের নগরী হিসেবে গড়ে উঠুক। উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন সময়মতো কর আদায়। আগে বিপুল অঙ্কের কর বকেয়া পড়েছিল। কিছু লোক পকেট ভারি করে কর আদায়ে বাধাগ্রস্ত করে। আমি দায়িত্ব নেয়ার পর কর আদায়ের ওপর জোর দিয়েছি। কর আদায়ে সাফল্যের ওপর উন্নয়ন কাজ এগিয়ে নেয়া অনেকাংশে নির্ভর করে।
আলোকিত বাংলাদেশ : শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার প্রসারে চসিক কী পদক্ষেপ নিয়েছে?
আ জ ম নাছির উদ্দীন : নগরীতে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছে চসিক। শিক্ষা খাতে বছরে ব্যয় করা হয় ৪০ কোটি টাকা। স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় হয় ১৩ কোটি টাকা। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনায় প্রতি বছর বড় অঙ্কের অর্থ ভর্তুকিও দেয় চসিক। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় শূন্য পদ পূরণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, যাতে শিক্ষার্থীরা ভালো মানের শিক্ষা পায়। পাশাপাশি নগরীর স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নে ব্যাপক উদ্যোগ হাতে নেয়া হয়েছে। নগরীর ৮০ শতাংশ মানুষ এখন স্বাস্থ্যসেবা পায়। ভবিষ্যতে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সেবার পরিধি শতভাগ উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
আলোকিত বাংলাদেশ : বহুল আলোচিত মেগা সিটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ কোন পর্যায়ে? এ ব্যাপারে কী কী পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে?
আ জ ম নাছির উদ্দীন : মেগা সিটি বাস্তবায়ন একটি সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। এটা একটা মোটিভেশন। মানুষকে একটা লক্ষ্য নির্ধারণ করে দেয়া। নগরীর লোকসংখ্যা ১ কোটি কিংবা এর বেশি হলে মেগা সিটির প্রশ্ন দেখা দেয়। গ্রিন ও ক্লিন সিটির ওপর এখন বেশি জোর দিচ্ছি। মেগা সিটি বাস্তবায়নে নগরবাসীর সচেতনতাও জরুরি। একটি গ্রিন ও ক্লিন সিটির মাধ্যমেই মেগা সিটির স্বপ্ন পূর্ণতা পেতে পারে। বাকলিয়ায় ৪০ একর জায়গার ওপর হবে আইসিটি পার্ক। নভোথিয়েটার করারও পরিকল্পনা আছে, যাতে নগরবাসী বিনোদন সুবিধা পায়।