দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মাসুদের সাফল্য

প্রতিবন্ধীরা সমাজের বোঝা নয়, তারাও হতে পারে জাতির মূল্যবান সম্পদ। প্রবল ইচ্ছা ও কঠোর পরিশ্রম পৌঁছে দিতে পারে সাফল্যের স্বর্ণ শিখরে। কঠোর পরিশ্রম ও প্রবল ইচ্ছাকে প্রাধান্য দিয়ে সকল বাধা অতিক্রম করে সাফল্যের শীর্ষে পৌঁছে দেলদুয়ারের মাসুদ মিয়া (৩২) প্রমাণ করেছেন সুস্থ স্বাভাবিক মানুষের চেয়েও প্রতিবন্ধীরা এগিয়ে যেতে পারে।

 

উপজেলার মঙ্গলহোড় গ্রামে তিন ভাই এক বোনের মধ্যে মাসুদ মিয়া সবার বড়। দুই বছর বয়সে টাইফয়েড জ্বরে তার দু’চোখ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। ছোটবেলা থেকেই প্রবল ইচ্ছা ছিল লেখাপড়া করে অনেক ভালো কিছু করার। ভর্তি হন সমাজ কল্যাণ অধিদপ্তর পরিচালিত টাঙ্গাইল বিবেকানন্দ স্কুলে। ব্রেইল পদ্ধতিতে লেখাপড়া করে ৫ম শ্রেণি পাস করেন। কিন্তু সংসারের অভাব-অনটনে আর লেখাপড়া চালিয়ে যেতে পারেননি। অভাবের সংসারে বাবাকে সাহায্য করতে মনস্থির করেন। সিদ্ধান্ত নেন বাড়ির কাছে প্রাইমারী স্কুলের পাস ঝালমুড়ি চানাচুর বিস্কুট বিক্রির। প্রায় তিন বছর ঝাঁকায় করে ভ্রাম্যমাণ দোকান পরিচালনা করেন। এরপর বাড়ির সামনে একটি মুদির দোকান দিয়ে বাবা-ছেলে মিলে দোকান চালাতেন। এর ফাঁকে একটি গরু বর্গা নিয়ে লালন পালন করেন। এতে কিছু লাভ হলে নিজেই দুটি গরু কিনে মোটাতাজাকরণের কাজ শুরু করেন। ধীরে ধীরে ঘুরতে থাকে ভাগ্যের চাকা। এরপর পাওয়ার টিলার কেনেন এবং অগভীর নলকূপের মাধ্যমে ধান চাষাবাদ শুরু করেন। দু’চোখ অন্ধ হলেও অগভীর নলকূপের শ্যালো ইঞ্জিন তিনি নিজেই চালাতেন এবং বাড়ি বাড়ি গিয়ে পাওয়ার টিলারের বকেয়া টাকা তুলতেন। সংসারে কিছু সচ্ছলতা ফিরে এলে তার ছোট জমজ দুই ভাইয়ের মধ্যে একজনকে বিদেশ পাঠান। অপর ভাই রাসেল বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। বোনকেও বিয়ে দিয়েছেন।

 

এরপর বাবা ও ছোট ভাইদের সঙ্গে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নেন বাড়ির কাছে ১৩ শতাংশ জায়গার ওপর পোল্ট্রি ফার্মের। ২০১০ সাল থেকে তার পোল্ট্রি ফার্মের ব্যবসা শুরু। প্রথমে কিছুটা সমস্যা হলেও এখন ভালো চলছে তার পোল্ট্রি ব্যবসা। গত এক বছরে তিনি প্রায় ৫০ লাখ টাকার ডিম বিক্রি করেছেন। প্রতিদিন মুরগির খাবার বাবদ ৮ হাজার টাকাসহ কর্মচারীর বেতন, বিদ্যুত্ বিল ও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে মাসে প্রায় ৩ লাখ টাকা খরচ হয়। গত এক বছরে মাসুদ মিয়ার প্রায় ১৪ লাখ টাকা লাভ হয়েছে। তার সততায় এলাকাবাসী মুগ্ধ। গ্রামের প্রতিটি বাড়ি, রাস্তা-ঘাট তার চেনা। চোখে না দেখলেও অন্যের সাহায্য ছাড়া একজন সুস্থ স্বাভাবিক মানুষের চেয়েও তিনি বেশি কাজ করেন।