কেরির সফর এবং বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়ার স্বীকৃতি

মাত্র ৯ ঘণ্টার ঝড়ো সফর কিন্তু মূল্যায়ন করতে গেলে এই সফর নিয়ে বিস্তর বিশ্লেষণের অবকাশ রয়েছে। বিদেশি ভিভিআইপি মেহমানদের আগমনকে কেন্দ্র করে আমাদের মধ্যে সাধারণত যে দৃষ্টিভঙ্গি কাজ করে তা হচ্ছে আমাদের প্রত্যাশা এবং প্রাপ্তির দিকটি মিলিয়ে দেখা। বলে রাখা ভাল যে, জন কেরির সদ্য সমাপ্ত সফরকে নিয়ে যদি কেউ এমনটা করতে চান তাহলে ভুল করবেন। কেরির এই সফরের মূল উদ্দেশ্য ছিল তাদের দীর্ঘদিনের চাওয়া সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে তাদের দেখানো পথে পথ চলুক বাংলাদেশ। বিষয়টি নিয়ে ইতোপূর্বে একাধিকবার সেদেশের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারা বাংলাদেশ সফর করতে এসে তাদের অভিপ্রায়ের কথা বাংলাদেশ সরকারকে অবহিত করলেও বাংলাদেশ সরকার এককথায় সন্ত্রাসবাদের উত্থান, বিকাশ এবং বিস্তার নিয়ে মার্কিন সরকারের সঙ্গে তাদের মতপার্থক্যের কথা স্পষ্ট করেই জানিয়ে দিয়েছে। এখানে যে মতপার্থক্যের কথা বলা হচ্ছে তা হলো, মার্কিনীদের মতে বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া জঙ্গি এবং সন্ত্রাসী হামলার নেপথ্যে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর যোগসূত্র রয়েছে এবং সেই সুবাদে তারা আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যে অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে পরোক্ষভাবে সে ধরনের অভিযান বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে এদেশেও পরিচালনার পরিকল্পনা। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার শুরু থেকেই এ ব্যাপারে সচেতন রয়েছে বলেই যে বিষয়টি এককথায় স্পষ্ট করে দিয়েছে তা হচ্ছে, এদেশে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদী সংগঠনগুলোর কোন প্রকার প্রভাব নেই, যা কিছু হয়েছে তা সবই হয়েছে এদেশের হোমগ্রোন জঙ্গিদের দ্বারা। সুতরাং যুক্তরাষ্ট্রের ভাষায় বৈশ্বিক সন্ত্রাসের প্রকৃতি এবং বাংলাদেশের সন্ত্রাসবাদের প্রকৃতি এক হলেও বাংলাদেশের ভাষায় তা ভিন্ন এবং বাংলাদেশ সরকার এটা বুঝাতে চায় যে অভ্যন্তরীণভাবে বিরোধী রাজনৈতিক কিছু দলের পৃষ্ঠপোষকতায় এ ধরনের কর্মকাণ্ড সংঘটিত হয়ে আসছে। এই মতপার্থক্যের পরিপ্রেক্ষিতেই মূলত এবারের কেরির এই ঝড়ো সফর এবং তার এই ৯ ঘণ্টার সফর বিশ্লেষণে দেখা যাবে যে অন্যান্য বেশ কিছু বিষয় দুপক্ষের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় উঠে আসলেও এই আলোচনার সর্বাগ্রে গুরুত্ব পেয়েছে সন্ত্রাসবাদ এবং এর মোকাবিলা সংক্রান্ত বিষয়টি।
কেরির সফর পরবর্তী দিন ৩০ আগস্ট বাংলাদেশের বেশিরভাগ দৈনিক পত্রিকার শিরোনাম ছিল সন্ত্রাসবাদ এবং জঙ্গিবাদ দমনে দুই দেশের একসঙ্গে কাজ করার বিষয়ে মতৈক্য প্রতিষ্ঠার বিষয়টি। কেরির সফর শেষ হলেও দুই দেশের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত এই একত্রে কাজ করার প্রক্রিয়া কি রকম হতে পারে সে ব্যাপারে কোন ধারণা পাওয়া যায়নি। তবে যতটুকু জানা যায় বাংলাদেশ এক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে তথ্য এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা নেয়ার ব্যাপারে বেশি আগ্রহী। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তার সাক্ষাতে তিনি বাংলাদেশকে সন্ত্রাসবাদবিরোধী লড়াইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সহায়তার প্রস্তাব কেরির সফর এবং বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়ার স্বীকৃতিদিলে প্রধানমন্ত্রীও তথ্য এবং প্রযুক্তি খাতে যুক্তরাষ্ট্রের অভিজ্ঞতার আলোকে এ ধরনের সহায়তা গ্রহণের বিষয়ে তার আগ্রহ প্রকাশ করেন। এখানে বাংলাদেশের সন্ত্রাসবাদ ইস্যু নিয়ে দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্যের যে বিষয়টি বলা হয়েছে তারও একটা নিষ্পত্তি এই সফরের মধ্য দিয়ে হয়েছে বলে মনে করা যায়। সরকারি আলোচনা পর্ব শেষ করে তিনি ধানমণ্ডির এডওয়ার্ড এম কেনেডি (ইএমকে) সেন্টারে তরুণ, গণমাধ্যম এবং নাগরিক সমাজের সঙ্গে আলাপচারিতায় খোলাখুলিভাবে অনেক কিছু নিয়ে তার নিজের এবং যুক্তরাষ্ট্রের মনোভাব তুলে ধরেন। মূলত গোটা সফরের একটা সংক্ষিপ্ত ধারণা পাওয়া যায় ওই আলাপচারিতা থেকে। তিনি সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ দমনে বাংলাদেশের পাশে থাকার প্রত্যয়ের পাশাপাশি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ সমুন্নত রাখার তাগিদ দেন। জন কেরি বলেন, ‘এখন পর্যন্ত সহিংস জঙ্গিবাদ দমনে আমাদের কাছে সবচেয়ে কার্যকর ও বিশ্বাসযোগ্য পন্থা হচ্ছে গণতন্ত্র। সন্ত্রাসীদের পরাভূত করতে হলে আমাদের অবশ্যই গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে সমুন্নত রাখতে হবে, যা সন্ত্রাসীরা ঘৃণাভরে অবজ্ঞা করে।’ নাগরিক সমাজের বিকাশের ওপর গুরুত্ব দিয়ে জন কেরি বলেন, ‘আমরা জানি, একটি সমাজের নিরাপত্তাবোধের সঙ্গে সত্যিকারের সমৃদ্ধির বিষয়টি যুক্ত। লোকজন যখন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে নিজেদের বঞ্চিত ভাবতে শুরু করেন, তখন উগ্রপন্থিরা জায়গা করে নেয়। তখন সহিংসতার মুখে অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা অর্জন দুরূহ হয়ে পড়ে।’ সরকারের সঙ্গে আলোচনার প্রসঙ্গ টেনে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সব বিষয় বিশেষ করে সবার অংশগ্রহণে কাজ করার গুরুত্ব, জঙ্গিদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেয়ার সময় গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া সুরক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত করা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
কেরির এবারের সফরের মূল গন্তব্য ছিল ভারত। জেনেভা থেকে তিনি ভারতে যাওয়ার পথে তার যাত্রাবিরতিতে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসবাদবিরোধী লড়াইয়ের বিষয়টি ঝালিয়ে নেয়া ছাড়া আসলে যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে অন্য কোনো বিষয় নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে তেমন একটা আগ্রহ পরিলক্ষিত হয়নি। ওবামা সরকারের সন্ত্রাসবাদবিরোধী পরিকল্পনাকে তার মেয়াদের শেষপ্রান্তে এসে একটা যৌক্তিক পরিণতর দিকে নিয়ে যাওয়াটাই মূলত তার বাংলাদেশ সফরের মূল লক্ষ্য বলে আমার ব্যক্তিগত অভিমত। যদি তেমনটা না হতো তাহলে যৌক্তিকভাবেই অন্যান্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যেমন জিএসপি সুবিধা পুনর্বহাল, বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতার বিষয়গুলোও উঠে আসত। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে আমরা লক্ষ্য করলাম তার তরফ থেকে এ রকম কোনো বিষয় আলোচনার আগ্রহ দেখানো হয়নি। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের উল্লেখ করার মতো একটি সাফল্য হচ্ছে কেরির বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর পরিদর্শন, যার মধ্য দিয়ে কেরি একজন ব্যক্তি মুজিব, তার পরিবার, সংগ্রাম এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে তার ভূমিকাসহ বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পরবর্তী বাংলাদেশের ষড়যন্ত্রের রাজনীতি সম্পর্কে একটা ধারণা পেয়েছেন, যা তার ব্যক্তিগত উপলব্ধিবোধকে আরও শাণিত করে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক স্বার্থকে আরো সামনের দিকে নিয়ে যাবার ব্যাপারে ইতিবাচকভাবে কাজ করতে পারে। দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বাণিজ্য এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উপস্থিতির মূল উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশের তরফ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে জিএসপি সুবিধা ফিরে পাওয়ার ব্যাপারে কেরিকে বুঝানো এবং সন্ত্রাসবাদবিরোধী সমন্বিত কার্যক্রমে পারস্পরিক স্বার্থের দিকটি আরও যতœসহকারে দেখা। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে সন্ত্রাসবাদ বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে বিস্তারিত আলোচনা এবং সিদ্ধান্তে আসা গেলেও কেরির তরফ থেকে বাংলাদেশকে জিএসপি সুবিধা ফিরিয়ে দেয়া সংক্রান্ত কোনো আশ্বাস পাওয়া যায়নি, যা আমাদের জন্য একটা ধাক্কা বলা যেতে পারে। সেই সঙ্গে ওই আলোচনায় কেরির বঙ্গবন্ধু জাদুঘর পরিদর্শনের আলোকে যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় নেয়া বঙ্গবন্ধুর অন্যতম আত্মস্বীকৃত খুনী রাশেদ চৌধুরীকে ফেরত দেয়ার ব্যাপারে অনুরোধ করা হলে তিনি বিষয়টি নিয়ে খোঁজ খবর নিয়ে বাংলাদেশকে জানাবেন বলে আশ্বস্ত করেন। তবে এখানে মুশকিলের বিষয় হচ্ছে কেরি এবং ওবামা প্রশাসন এই ব্যাপারে যতই আন্তরিক থাকুক না কেন বিষয়টি একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া এবং ওবামা প্রশাসনের হাতে বাকি ৫ মাসের মধ্যে এ ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্তে আসা এককথায় অসম্ভব। কারণ মূলত দুটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রাশেদ চৌধুরীকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। প্রথমত, দুই দেশের মধ্যে অপরাধী প্রত্যর্পণ চুক্তি স্বাক্ষর এবং দ্বিতীয়ত, আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে এটা প্রমাণ করা যে যুক্তরাষ্ট্র একজন খুনিকে সেদেশে আশ্রয় দিয়েছে যে খুনি প্রকৃত তথ্য গোপন করে সেদেশে আশ্রয় নিয়েছে। সঙ্গত কারণেই প্রথমটি সম্ভব নয়, কারণ আগামী জানুয়ারি মাসে সেদেশে নতুন প্রেসিডেন্ট দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন এবং তখন আলোচনার পুরো প্রক্রিয়াটি নতুন করে শুরু করা যেতে পারে। আর দ্বিতীয় বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের গভীরভাবে ভেবে দেখা প্রয়োজন।
একটি বিষয় আমাদের জন্য ইতিবাচক, আর তা হলো নব্বই পরবর্তী সময় থেকে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক অনেক দিক দিয়েই অতীতের সময়গুলোর চাইতে অনেক উন্নত হয়েছে। ১৯৭৪ সালে তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার বাংলাদেশ সফর করে এই দেশকে আখ্যা দিয়েছিলেন তলাবিহীন ঝুড়ি হিসেবে। আর আজ স্বাধীনতার ৪৫তম বর্ষে এসে সেদেশেরই আরেকজন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি এসে অকৃপণচিত্তে স্বীকার করলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর হত্যা মানে এদেশের এক অনন্য সাধারণ নেতার জীবনাবসান। জাতির জনককে হত্যা করা হলেও তার কন্যার সুযোগ্য নেতৃত্বে দৃঢ়ভাবে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের পথে এগিয়ে চলছে বাংলাদেশ এবং উন্নয়নের এই অভিযাত্রায় বাংলাদেশের সঙ্গী হতে পেরে যুক্তরাষ্ট্র গর্বিত।’ আমরা লক্ষ করলে দেখতে পাব যে, বিল ক্লিনটনের শাসনামল থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের এই নতুন সম্পর্কের সূচনা হয়। ২০০০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্লিনটন বাংলাদেশ সফর করে এই সম্পর্কের ভিত্তি রচনা করেন। এর পর থেকে নিয়মিতই প্রতিটি সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশ সফর করেছেন। মেডেলিন অলব্রাইট, কলিন পাওয়েল, কন্ডলিসা রাইস, হিলারি ক্লিনটন এবং সর্বশেষ জন কেরির এই সফরের মধ্য দিয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে নিয়ে যে কৌশলগত সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত করতে চায় তাকে টিকেয়ে রাখতে হলে সঙ্গত কারণেই বাংলাদেশকে এই কৌশলে অন্তর্র্ভুক্ত করতে হবে, কেননা ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ৪ হাজার কিলোমিটারের বেশি স্থলসীমা বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম দ্বিপাক্ষিক স্থল সীমা, যা একদিকে যেমন অর্থনৈতিকভাবে দুই দেশের স্বার্থের জন্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করে অন্যদিকে আঞ্চলিক সন্ত্রাসবাদের ঝুঁকিও বাড়ায়। সুতরাং ভারতের জাতীয় স্বার্থের বাস্তবতায় বাংলাদেশের অপরিহার্যতা বিশ্লেষণে যুক্তরাষ্ট্রের কাছেও ধীরে ধীরে বাংলাদেশকে অপরিহার্য করে তুলছে। তবে এখানে সবচেয়ে শঙ্কার বিষয়টি হচ্ছে আমাদের কূটনৈতিক সক্ষমতার অভাব। এই বাস্তবতাগুলো বিশ্লেষণ করলে আমরা বুঝতে পারি যে, আমাদের সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কূটনৈতিক সক্ষমতা সেভাবে গড়ে ওঠেনি বলেই আমরা ভারত, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে দরকষাকষির মাধ্যমে আমাদের জাতীয় স্বার্থের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য তেমন কোনো কিছু অর্জন করতে পারিনি। তবে এ কথাও অস্বীকার করার তো কোনো উপায় নেই যে, বর্তমান সরকারের পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে ইদানীংকালে পেশাদারিত্বের ছাপ লক্ষণীয়, যার ফলস্বরূপ আমরা দেখতে পেলাম যে সন্ত্রাসবাদ সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার দৃষ্টিভঙ্গিগত মতপার্থক্য নিরসনে স্বয়ং কেরিকে বাংলাদেশে আসতে হলো এবং বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের সকল উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে স্বীকৃতি দিতে হলো।
আমরা দেখতে পাচ্ছি বাংলাদেশ যখন উন্নয়নের ক্ষেত্রে বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য অনেক দিক দিয়েই একটি মডেল হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে এবং তা বারাক ওবামাসহ বিশ্বনেতারা অকপটে স্বীকারও করছেন সেই অবস্থায় দেশের বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো জাতীয় স্বার্থের পরিবর্তে সরকারবিরোধী তাদের চলমান সকল বিরোধিতা নিয়ে এখনো বিদেশিদের দ্বারে নালিশ নিয়ে হাজির হচ্ছেন, যা প্রকারান্তরে সকলের কাছে তাদের এক হাসির খোরাকে পরিণত করছে। কেরির সফরেও এর ব্যত্যয় হয়নি। স্বয়ং খালেদা জিয়া একাধিকবার দেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তিনি কেবলমাত্র সরকারের বিরুদ্ধে নালিশ করার প্রয়োজনে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসে গিয়ে কেরির সঙ্গে দেখা করে বাংলাদেশের পরবর্তী নির্বাচন এবং তাদের ভাষায় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা কামনা করে এসেছেন। যখন আমরা বারবার একথা উচ্চারণ করি যে, আমাদের দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বিদেশি হস্তক্ষেপ কাক্সিক্ষত নয় সেই অবস্থায় তিনি এ ধরনের হস্তক্ষেপ কামনার মধ্য দিয়ে মূলত জনগণের বিরুদ্ধেই নিজের অবস্থানকে আরেকবার প্রমাণিত করলেন। তাছাড়া তার মতো নেতার মার্কিন দূতাবাসে গিয়ে সেদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে আসা কতটুকু সম্মানের সেটাও প্রশ্নের বিষয়।
সবশেষে, কেরির এই সফরের মধ্য দিয়ে আক্ষরিক অর্থে বাংলাদেশের নগদ বা আশু প্রাপ্তির কোনো বিষয় সংশ্লিষ্ট না থাকলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় ক্ষমতাধর ব্যক্তির এই সফর এই বার্তাই দেয় যে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বর্তমান সরকারের একটি বিশেষ গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। কেরি নিজেও এসব ব্যাপারে অনেকটা স্পষ্ট করেই অনেক কিছু বলেছেন। তার এসব বক্তব্য নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। তাছাড়া আগামী অক্টোবর মাসে চীনের প্রেসিডেন্টের বাংলাদেশ সফরের কথা রয়েছে। চীন-ভারতের মধ্যকার ঐতিহাসিক দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক এবং ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার কৌশলগত সুসম্পর্কের আলোকে বাংলাদেশের বিষয়ে ভারত এবং যুক্তরাষ্ট্র উভয়েই অন্য কোনো পক্ষকে বিশেষ সুবিধা দিতে নারাজ। সেদিক দিয়ে কেরি দেশে ফিরে গিয়ে যদি এই বিষয়ে কোনো ইতিবাচক পদক্ষেপের সুপারিশ করেন তবে বাংলাদেশকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে নতুন কোনো সম্পর্কের সূচনাকে উড়িয়ে দেয়া যায় না। আর সেক্ষেত্রে আগামী জানুয়ারি মাসে হোয়াইট হাউসে নতুন প্রেসিডেন্টের আগমন হলেও পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট দ্বিপাক্ষিক এই সম্পর্কে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়ার কোনো আশঙ্কা নেই। সবকিছু মিলিয়ে এ কথাই বলা যায় যে, বাংলাদেশ এগিয়ে চলছে নতুন এক সম্ভাবনার দিকে। জয়তু বাংলাদেশ। বাংলাদেশ দীর্ঘজীবী হোক।
লেখক : শিক্ষক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং দেশ-বিদেশের রাজনীতির বিশ্লেষক