বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক বার্তাই ছিল কেরির সফরে

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরির সফরকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা। তাদের দাবি, স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের পক্ষে এটাই কোনো মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ‘সবচেয়ে ইতিবাচক’ অবস্থান। সেই সঙ্গে এ সফরটি একটি সার্বজনীন রূপ পায়; কারণ তিনি সংক্ষিপ্ত সফরে এসেও এখানে প্রায় ৮ ঘণ্টা ব্যস্ত সময় কাটিয়ে গেছেন। এ সময়েই তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠক করেছেন। এছাড়া সংসদের বিরোধী দলের নেতা, নাগরিক সমাজ, তরুণ সম্প্রদায় এবং শ্রম-সংশ্লিষ্টদের সঙ্গেও মতবিনিময় করেছেন।
এছাড়া জন কেরি রাজধানীর ইএমকে সেন্টারে যে বক্তব্য রাখেন। সেখানে বক্তৃতা শেষে সময় স্বল্পতার কারণে সাংবাদিকদের মাত্র দুটি প্রশ্নের জবাব দেন। সেখানেই তিনি প্রশ্নের জবাবে বলেন, বাংলাদেশ সন্ত্রাসবাদের সমস্যাকে পাশ কাটিয়ে যাচ্ছে না। এ ব্যাপারে বালিতে মুখ গুঁজে নেই বাংলাদেশ। এ বিষয়ে বাংলাদেশ হেরিটেজ ফাউন্ডেশন ন্যাশনাল সিকিউরিটি এণ্ড কাউন্টার টেররিজমের চেয়ারম্যান অলিউর রহমান ভোরের কাগজকে বলেন, উনি (জন কেরি) এসেছেন, ৯ ঘণ্টা থেকেছেন। এটা আমাদের সব চেয়ে বড় পাওয়া। তিনি আরো বলেন, কেরি বঙ্গবন্ধু জাদুঘরে গিয়েছেন, ফুলের তোড়া দিয়ে শ্রæদ্ধা নিবেদন করেছেন। সব ছবি ঘুরে ঘুরে দেখেছেন এরং শোক বইতে স্বাক্ষর করেছেন। এটা এ দেশের ইতিহাসের জন্য এক বড় অর্জন। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির বলেন, তাদের দিক থেকে যে প্রত্যাশা ছিল তা পূরণ হয়েছে এবং আমাদের দিকে থেকে যে প্রত্যাশা ছিল তাও পূরণ হয়েছে। এ জন্য বলা যেতেই পারে কেরির এ সফর সফল হয়েছে। তিনি মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র থেকে যখন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মতো একজন উচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তি সফরে আসেন, সেটাকে আমরা অবশ্যই ইতিবাচক হিসেবে দেখব। কেরির সফরটি আরো যে কারণে গুরুত্ব বহন করে তা প্রথমত, দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের বহুমাত্রিক এবং দীর্ঘকালীন সম্পর্ক রয়েছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র একসঙ্গে কাজ করে আসছে।
এ বিষয়ে নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, আমি মনে করি এ সফরে বাংলাদেশের বড় প্রাপ্তি তারা ’৭১ সালে যে ভুল করেছিল তার দায় স্বীকার করেছে। এছাড়া বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে পুষ্পমাল্য অর্পণের পর শোক বইয়ে জন কেরি যা লিখেছেন, তা অত্যন্ত স্পর্শকাতর। সেই স্পর্শকাতর কথার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের পরে এটিই মার্কিনিদের হয়ে সবচেয়ে আবেদনমূলক অবস্থান।
এ সফরকে বাংলাদেশের জন্য এক বড় অর্জন উল্লেখ করে অলিউর রহমান বলেন, প্রথমত, বিল ও হিলারি ক্লিনটন এলেও তারা বঙ্গবন্ধু ভবনে যাননি। কিন্ত জন কেরিই প্রথম যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি প্রতিনিধি যিনি বঙ্গবন্ধু ভবনে গেলেন। দ্বিতীয়ত, তিনি যে বার্তা দিয়েছেন তাতে ইঙ্গিতে বলে গেলেন ’৭১ এ কিসিঞ্জার ভুল করে ছিলেন। তৃতীয়ত, তিনি এটাও প্রমাণ করে গেলেন যে, ৫ জানুয়ারি নির্বাচন সঠিক ছিল; কারণ একদল যদি নির্বাচনে না আসে সে জন্য শেখ হাসিনাকে দায়ী করা যায় না।
বিশ্লেষকদের কেউ কেউ বঙ্গবন্ধুর খুনিদের ফেরানোর ব্যাপারে মার্কিন অবস্থান আগের চেয়ে নমনীয় বলেও মনে করছেন। তবে জঙ্গিবাদ মোকাবিলায় মার্কিন সহযোগিতার আশ্বাস সতর্কভাবে বিশ্লেষণ করছেন তারা। শেখ হাসিনা-জন কেরি বৈঠকের অন্যতম আলোচ্যসূচি ছিল যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত বঙ্গবন্ধুর খুনি রাশেদ চৌধুরীকে দেশে ফেরত আনার বিষয়টি। এ প্রসঙ্গে কেরিও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে আশ্বস্ত করে বলেছেন, ‘আমি আপনার কষ্ট বুঝি; এ বিষয়টি পর্যালোচনা পর্যায়ে আছে।’ এ বিষয়ে হুমায়ুন কবীর ভোরের কাগজকে বলেন, এ বিষয়ে যে আলোচনা হয়েছে তাতে ওই দেশের আইনানুসারে ফেরত আসতে পারে।
বঙ্গবন্ধুর খুনিদের ফিরিয়ে দেয়ার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র যথেষ্ট উদার, তারা যে কোনো ‘মার্ডারারকে’ রাখতে চায় না উল্লেখ করে অলিউর রহমান বলেন, ‘যারা ওয়াশিংটনে আছেন তাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্ভাসিত হয়ে যে দুজন খুনি যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছে তাদের বাংলাদেশে ফিরিয়ে নিয়ে চেষ্টা করা উচিত। এ বিষয়ে আমাদের আরো শক্তভাবে পদক্ষেপ নেয়া উচিত।’
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে সন্ত্রাস এবং জঙ্গিবাদ দমনের বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে প্রধান ইস্যু। যথারীতি বাংলাদেশ সফরেও এটিকে মুখ্য এজেন্ডা হিসেবেই রাখেন জন কেরি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তার বৈঠকে বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়। প্রসঙ্গক্রমে এসেছে অন্যান্য ইস্যুও। তবে রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, কেরির সফর সফল হবে যদি আমাদের সরকার শুধু কেরির সন্তুষ্টির জন্য নয়, আমাদের দেশের মঙ্গলের জন্য জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস ঠেকাতে সরকারি কাজকর্মে এ ধরনের দৃঢ়তা দেখায়। এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, সন্ত্রাসীরা তো আমাদের নিজের দেশের শৃঙ্খলা নষ্ট করছে, তাই তাদের দেশের শান্তি বজায় রাখতেই সরকারের এ বিষয়ে পদক্ষেপ অব্যাহত রাখতে হবে। তিনি আরো বলেন, এই অঞ্চলে চীনকে ঠেকানোর জন্য ভারত-যুক্তরাষ্ট্র একত্রে কাজ করছে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ বছর জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র সফরে গিয়ে জন কেরিকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। তখন তিনি বলেছিলেন, সুযোগ পেলেই আসবেন। তিনি এলেনও। ফলে এই সফরটি খুবই ইতিবাচক। আর সরকার সার্বিকভাবে এ সফরের সফলতা দাবি করতেই পারে।