অপরাজিতা যশোর থাকবে নারী-শিশু নির্যাতন রুখবে

শৈশবে বায়োস্কোপে একটি ছবি দেখেছিলাম। ছবিতে একটি গাছের একপাশে স্বামী এবং অন্য পাশে স্ত্রী। গাছ ধরে স্বামী তার স্ত্রীর দিকে ঝুঁকে এসে স্ত্রীকে লক্ষ্য করে গানের সুরে বলেন, ‘কাজ করি মাঠে, মন থাকে বাড়ি।’স্ত্রী গাছের ওপাশ থেকে একই কায়দায় স্বামীর দিকে ঝুঁকে স্বামীকে লক্ষ্য করে প্রতিউত্তরে গানের সুরে বলেন, ‘কাজ করি বাড়ি, মন থাকে মাঠে।’এরপর স্বামী-স্ত্রী যৌথভাবে গাইতে থাকেন ‘আমরা কথায় কথায় ঝগড়া করি, এক ঘরেতে বসত করি, আমরা দু’জন মিলে গড়ে তুলি সোনার সংসার, ও ভাই সুখের সংসার।’ছবিটি দেখার পর প্রায় অর্ধশতাব্দী পার হয়ে গেছে। দেশ-দুনিয়া এগিয়ে গেছে অনেক দূর। সে দিনের সব কিছুতে পরিবর্তন এসেছে। তখন যা ছিল এখন তার অনেক কিছুই নেই এবং এখন যা আছে তার অনেক কিছুই তখন ছিল না। বদলে যাওয়া ও নতুন কিছু সূচিত হওয়ার আবহে যখন দেখি ‘অপরাজিতা যশোর’-এর কর্মসূচি তখন মনে পড়ে এই সৃজনশীল প্রকল্পটি যেন স্বামী-স্ত্রী কথায় কথায় ঝগড়া করলেও তাদের এক ঘরে বসত করানো ও উভয়ের মিলিত প্রচেষ্টায় সুখের সংসার গড়ে দেয়ার দায়িত্ব নিয়েছে। আর এর পেছনে চালিকাশক্তি হিসেবে নিরলস দায়িত্ব পালন করছেন প্রকল্প পরিচালক যশোরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) সাবিনা ইয়াসমিন। তিনি এই প্রকল্পের উদ্ভাবক।অপরাজিত যশোর হলো প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এটুআই প্রকল্পের সার্ভিস ইনোভেশন ফান্ডের (এসআইএফ) আওতায় যশোর জেলার নির্যাতিত নারী ও শিশু অধিকার রক্ষায় আইনি সহযোগিতা দেয়ার একটি প্রকল্প। প্রকল্পটি চালু হয়েছে গত এপ্রিলে, জানালেন সাবিনা ইয়াসমিন।প্রকল্পটির প্রেক্ষাপট এমন: নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং তাদের ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে ‘জয়িতা অন্বেষণে বাংলাদেশ’ নামে একটি কার্যক্রম চালু আছে। মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের আয়োজনে ও মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে খুলনা বিভাগে এটি বাস্তবায়ন করে বিভাগীয় প্রশাসন। জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল এ কাজে অর্থায়ন করে। নারীর অগ্রযাত্রার সহায়ক বিভিন্ন কর্মকা-ের মধ্যে এটি একটি নবতর ও সৃজনশীল সংযোজন। অর্থনৈতিকভাবে সাফল্য অর্জনকারী নারী, শিক্ষা ও চাকরি ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনকারী নারী, সফল জননী নারী, নির্যাতনের বিভীষিকা মুছে ফেলে নতুন উদ্যমে জীবন শুরু করেছেন যে নারী এবং সমাজ উন্নয়নে অসামান্য অবদান রেখেছেন যে নারী এই পাঁচটি ক্যাটাগরিতে সফল নারীদের তৃণমূল পর্যায় থেকে বাছাই করে বিভাগীয় পর্যায়ে নির্বাচন ও সম্মাননা প্রদান করা হয়। প্রত্যেক ক্যাটাগরিতে পাঁচজন করে খুলনা বিভাগের ১০ জেলা থেকে মনোনীত ৫০ জন জয়িতার মধ্য থেকে পাঁচজন শ্রেষ্ঠ জয়িতা নির্বাচন করা হয়। তারা হলেন, শিক্ষা ও চাকরি ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনকারী নারী যশোরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) সাবিনা ইয়াসমিন, অর্থনৈতিকভাবে সাফল্য অর্জনকারী নারী কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার উত্তর ভবানীপুর গ্রামের সোনালী আক্তার, সফল জননী নারী খুলনার রূপসা উপজেলার কাজদিয়া গ্রামের ফরিদা বেগম, নির্যাতনের বিভীষিকা মুছে ফেলে নতুন উদ্যমে জীবন শুরু করা নারী খুলনার রূপসা উপজেলার মিলকী দেয়াড়া গ্রামের সালমা খাতুন ও সমাজ উন্নয়নে অসামান্য অবদান রাখা নারী যশোরের অভয়নগর উপজেলার কামকুল গ্রামের অর্চনা বিশ্বাস।সাবিনা ইয়াসমিন জানান, তিনি শ্রেষ্ঠ জয়িতা নির্বাচিত হলে তিনি মহিলাদের জন্য সৃজনশীল কিছু করার প্রস্তাব পান। এর পরিপ্রেক্ষিতে তিনি যশোর জেলার নির্যাতিত নারী ও শিশু অধিকার রক্ষায় আইনি সহযোগিতার লক্ষ্যে ‘অপরাজিতা যশোর’ শীর্ষক একটি ধারণাপত্র পেশ করেন। যার সেস্নাগন ‘অপরাজিতা যশোর থাকবে, নারী ও শিশু নির্যাতন রুখবে।’ এর লক্ষ্য পারিবারিক সহিংসতা, যৌন হয়রানি, যৌতুক, পাচার, বাল্যবিয়ে, রক্ষণাবেক্ষণ, শারীরিক লাঞ্ছনা, অ্যাসিড সন্ত্রাস, ইভটিজিং প্রভৃতি ধরনের নির্যাতনের প্রতিকার ও ক্ষতিগ্রস্তকে আইনি সহায়তা প্রদান। সেটি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এটুআই প্রকল্পের সার্ভিস ইনোভেশন ফান্ডের (এসআইএফ) অনুমোদন পেয়েছে। প্রকল্পটির সভাপতি হিসেবে যশোরের ডেপুটি কমিশনার ড. হুমায়ুন কবীর ও প্রকল্প পরিচালক হিসেবে তিনি কাজ করছেন। এ ছাড়াও আটজনের একটি পরামর্শক প্যানেল রয়েছে।যশোর জেলার সব শ্রেণী ও পেশার মানুষের কাছে ‘অপরাজিতা যশোর’কে পরিচিত করার জন্য ব্যাপক কর্মসূচি নেয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রকল্পের ব্যবস্থাপনায় যশোর সদর, ঝিকরগাছা, শার্শা, অভয়নগর ও চৌগাছা উপজেলায় অবহিতকরণ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়েছে। এছাড়া জয়তী সোসাইটি, বাঁচতে শেখা ও প্ল্যান বাংলাদেশের আয়োজনে অবহিত কর্মসূচি পালন করা হয়। এসব কর্মসূচিতে কয়েক হাজারো নারী-পুরুষ অংশগ্রহণ করে।প্রকল্প পরিচালক জানান, যশোর জেলার ৯৩টি ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে খুব শিগগিরই ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রকল্পের অবহিতকরণ সভা করা হবে। এভাব অবহিতকরণ সভার মাধ্যমে এক লাখ মানুসের কাছে অপরাজিতা যশোরের বাণী পেঁৗছে দেয়া হবে। এ দিকে ইতোমধ্যে এক লাখ মানুষের কাছে এসএমএস-এর মাধ্যমে অপরাজিতা যশোরের কথা পেঁৗছে দেয়া হয়েছে। যশোর জেলার নির্যাতনের শিকার সব শিশু ও নারীকে এই প্রকল্পের সেবা গ্রহণের অনুরোধ করা হয়েছে।তিনি জানান, সভাপতি এবং পরিচালক ছাড়াও আট জনের একটি প্যানেল রয়েছে। তারা ১০৯২১ হেল্পলাইনের মাধ্যমে প্রাপ্ত অভিযোগগুলো শোনেন এবং অপরাজিতা যশোরের মাধ্যমে শুনানি শেষে নিষ্পত্তি গ্রহণ করা হয়। এছাড়া হট লাইন ০১৭৫৫৬৬৩৩৪৪, ই-মেইল ংঁঢ়ঢ়ড়ৎঃ@ধঢ়ধৎধুরঃধলবংংড়ৎব.ড়ৎম, বিন:িি.িধঢ়ধৎধুরঃধলবংংড়ৎব.ড়ৎম এর মাধ্যমেও ভুক্তভোগীরা সুযোগ নিতে পারেন।গত ২৯ আগস্ট যশোর শহরতলির এক গ্রামের পারিবারিক সহিংসতার একটি অভিযোগের শুনানি ছিল। স্বামীর বিরুদ্ধে স্ত্রীর অভিযোগ ছিল, স্বামী তাকে অহেতুক মারধর করে এবং বাবার বাড়ি থেকে টাকা (যৌতুক) এনে দিতে বলে। এই নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে বাপের বাড়িতে আশ্রয় নেয়। এক বছর ধরে সেখানে আছে। কিন্তু স্বামী তার কোন খোঁজখবর নেয় না এবং ভরন-পোষণও দেয় না। উপরোন্তু তার কাছ থেকে শিশু মেয়েটিকেও ছিনিয়ে নিয়ে গেছে। ‘অপরাজিতা যশোর’ বিষয়টির মীমাংসা করেছে। স্বামী আড়াইশ টাকার স্ট্যাম্পে অঙ্গীকারনামা দিয়ে গেছে সে আর স্ত্রীকে মারধর করবে না এবং যৌতুকও দাবি করবে না।১৮ আগস্ট শুনানি ছিল শার্শার একটি অভিযোগের। বিয়ের পর স্ত্রীর মুখরার কারণে বনিবনা না হওয়ায় এক পর্যায়ে স্ত্রী বাপের বাড়িতে চলে যায় এবং সে স্বামী, শ্বশুর ও দেবরদের নামে আদালতে একটি মিথ্যা যৌতুকের মামলা ঠুকে। এ মামলায় স্বামী আটক হয় এবং ১৪ দিন কারাবাসও করতে হয়। এতে স্বামীপক্ষ দারুণভাবে বেঁকে বসে। তাদের কথা_ বিনা কারণে যে বউ স্বামীর মাজায় দড়ি তুলতে পারে সেই বউ ঘরে তোলা যায় না। এই অভিযোগের শান্তিপূর্ণ নিষ্পত্তি হয়েছে অপরাজিতা যশোরে। স্বামী তার স্ত্রীকে ঘরে তুলে নিয়েছে। তারা এখন সুখেই দিন কাটাচ্ছে।যশোর শহরের এক বাবার একটি ন্যক্কারজনক ঘটনা। সরকারি চাকরে এই বাবা তার মেয়েকে একটি পার্লার করে দেন। মেয়েটি কাজের সহযোগিতা করার জন্য ওই পার্লারে একটি মেয়ের নিয়োগ দেয়। সুনামের সঙ্গে পার্লারটি চলছিল। পার্লারের মালিক মেয়েটি জরুরি কাজের উদ্দেশ্যে কয়েকদিনের জন্য বাইরে যায়। এই ফাঁকে বাবা কর্মচারী মেয়েটিকে বিয়ে করে বসে। তার মেয়েটি বাড়িতে ফিরে পার্লারে যেতে চাইলে বাবা বাধ সেধে বলে ওটি আর তোমার নেই। সেটি এখন আমার দ্বিতীয় স্ত্রীকে দিয়ে দিয়েছি। এ অভিযোগটি অপরাজিতায় আসলে গত ১৮ আগস্ট শুনানি শেষে মেয়েটি পার্লারের মালিকানা ফিরে পেয়েছে এবং তার (স্বামী) প্রথম স্ত্রীকে প্রতি মাসে সম্মানজনকহারে মাসোয়ারা দেয়ার অঙ্গীকারনামায় স্বাক্ষর করেছে।এভাবে অপরাজিতায় রাজিয়া সুলতানা হ্যাপি, ফাতেমা আক্তার জবা, ময়নাসহ অনেকের অভিযোগ শান্তিপূর্ণভাবে মীমাংসা হয়েছে। তারা সবাই শান্তিতে আছে। মীমাংসিত অভিযোগগুলোর পরবর্তী পরিস্থিতি জানার জন্য ফলোআপের ব্যবস্থা থাকায় অতীতের ঘটনার পুনরাবৃত্তির কোন সুযোগ নেই বলে জানান সাবিনা ইয়াসমিন।প্রকল্প সূত্র জানায়, গত চার মাসে জেলার আটটি উপজেলা থেকে ১১৩টি অভিযোগ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে বাল্যবিয়ে সম্পর্কিত অভিযোগ ৪৩টি, যার ৩৪টি নিষ্পত্তি হয়েছে। বাকি নয়টি নিষ্পত্তির প্রক্রিয়ায় রয়েছে। যৌতুক সংক্রান্ত ৪২টি অভিযোগের মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে ২৯টি। চলমান আছে ১৩টি। পারিবারিক আদালত সংক্রান্ত নয়টি অভিযোগ আসে, যার মধ্যে ছয়টি নিষ্পত্তি হয়েছে এবং তিনটি নিষ্পত্তির অপেক্ষায় আছে। ১৯টি পারিবারিক সহিংসতার মধ্যে ১২টি মীমাংসা হয়েছে। এই অভিযোগের সাতটি চলমান আছে। অপরাজিতার এ ভূমিকার কারণে আদালতে মামলার জট কমছে। কয়েকজন ওসি ইতোমধ্যে বলেছেন, নারী ও শিশু নির্যাতন সংক্রান্ত কোনো মামলা এখন থেকে অপরাজিতার অনুমতি ছাড়া গ্রহণ করা হবে না।অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) সাবিনা ইয়াসমিন তার প্রশাসনিক কাজের বাইরে এই বাড়তি কাজটি করছেন। তিনি মনে করেন মানুষ হিসেবে সমাজের প্রতি তার দায়িত্ব রয়েছে। সেই বোধ থেকেই তিনি এ কাজ করছেন। এতে মানুষ উপকৃত হচ্ছে।