‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ থেকে ‘অনন্যসাধারণ’

১৯৭০-এর দশকের শুরুতে সদ্য স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশকে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার। সাড়ে চার দশক পর গতকাল সোমবার সেই বাংলাদেশের অর্জিত অগ্রগতিকে ‘অনন্যসাধারণ’ বলে অভিহিত করলেন দেশটির বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে গতকাল ঢাকায় সাক্ষাতের পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম টুইটারে এক বার্তায় তিনি লিখেছেন বাংলাদেশের অসাধারণ অগ্রগতির গল্পের কথা।

গতকাল বিকেলে ধানমণ্ডির ইএমকে সেন্টারে নাগরিক ও তরুণসমাজের প্রতিনিধিদের উদ্দেশে বক্তব্য দেওয়ার সময় জন কেরি বলেন, বাংলাদেশের অগ্রগতির অংশীদার হতে পেরে যুক্তরাষ্ট্র গর্বিত। কয়েক বছর আগেও কেউ হয়তো ভাবেনি, আঞ্চলিক-আন্তর্জাতিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সঙ্গে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে কাজ করবে।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, সন্ত্রাসসহ বিভিন্ন ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র এখন বাংলাদেশকে সম্ভাব্য সব ধরনের সহযোগিতা করার প্রস্তাব দিয়েছে গতকাল বিভিন্ন আলোচনায়। সেগুলোর কোনটি গ্রহণ করবে, আর কোনটি করবে না—এ পছন্দ করার এখতিয়ার এখন ঢাকার।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি ইএমকে সেন্টারে তাঁর বক্তৃতায় কিসিঞ্জারের নাম একবারের জন্যও মুখে আনেননি। বরং বারবার তিনি বলেছেন সেই এডওয়ার্ড এম কেনেডির কথা, যিনি ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র সরকারের অবস্থানের বিরুদ্ধে গিয়ে এ দেশের নিপীড়িত মানুষের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন। এ অঞ্চল সফর করে দেশে ফিরে গিয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর ভয়ংকর অত্যাচারের বর্ণনা দিয়েছেন। কেরি বলেন, শুধু কেনেডি নন, ম্যাসাচুসেটও বাংলাদেশের পক্ষে ছিলেন। ১৯৭১ সালে কেনেডিভক্ত তরুণ কর্মী হিসেবে অন্যান্য শিক্ষার্থীর মতো তিনিও রাজপথে নেমেছিলেন বাংলাদেশের পক্ষে।

১৯৬২ সালে স্কুলের গণ্ডি পেরুনো কেরি স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে যখন কেনেডির পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়েছিলেন তখনো তিনি জানতেন না ভবিষ্যতে তাঁরা একসঙ্গে কাজ করবেন। পরবর্তী জীবনে সিনেটর কেনেডির সহকর্মী হিসেবে জন কেরির গুরু-শিষ্য জুটিকে এ যাবৎকালের সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি বলে দাবি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

বক্তৃতার শুরুতেই বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে তাঁর দেশের জনগণের সম্পর্ক বিনির্মাণে কেনেডির ভূমিকা তুলে ধরেন জন কেরি। তিনি বলেন, স্বাধীন বাংলাদেশ সফরে এসে কেনেডি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যে বটবৃক্ষ রোপণ করেছিলেন, তা এখন পরিণত ও বিশাল হয়ে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ব্যাপ্তিরই বহিঃপ্রকাশ ঘটাচ্ছে। জন কেরির আগে ২০১২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন বাংলাদেশ সফরের সময় এ দেশের উন্নতি ও অগ্রযাত্রার প্রশংসা করে বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে নিয়ে বাজি ধরতে পারে।

কিসিঞ্জারের সেই ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ তত্ত্ব কেবল বৈশ্বিক বিশ্লেষকদের কাছেই নয়, যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের কাছেও ভুল প্রমাণিত হয়েছে। দেশটির সাবেক রাষ্ট্রদূত ড্যান ডাব্লিউ মজিনা বাংলাদেশে দায়িত্ব পালনের সময়ও এ প্রসঙ্গে বলেছেন, কিসিঞ্জারের ওই তত্ত্ব সঠিক ছিল না।