প্রতিবন্ধী মাসুদের দারিদ্র্য জয়

জীবনসংগ্রামে জয়ী হওয়া একটি নাম প্রতিবন্ধী মাসুদ রানা। অন্ধ হয়েও পোলট্রি শিল্পে তিনি সফলতা অর্জন করেছেন। মাসুদকে অন্ধত্বের চিকিৎসা করতে এক সময় তার বাবা-মা আর্থিকভাবে পথে বসেছিলেন। এখন সেই মাসুদ পুরো সংসারের হাল ধরেছেন। তিনি প্রমাণ করেছেন, প্রতিবন্ধীরা সমাজের বোঝা নয়, উপার্জনে অক্ষম ব্যক্তিই সমাজের বোঝা। পোলট্রি খামার করে এখন তার মাসিক আয় প্রায় দেড় লাখ টাকা। স্ত্রী, সন্তান, ভাইবোন, বাবা-মাকে নিয়ে ভালোই চলছে মাসুদের জীবন সংসার। তার এ সাফল্য হার মানিয়েছে একজন স্বাভাবিক মানুষকে।
টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলার পাথরাইল ইউনিয়নের মঙ্গলহোড় গ্রামে ১৯৮৩ সালে মাসুদের জন্ম। তার বাবা কৃষক মোঃ সামাদ মিয়া। সামাদ মিয়ার চার সন্তানের মধ্যে মাসুদ রানা সবার বড়। ৩ বছর বয়সে টাইফয়েড জ্বরে মাসুদের দুই চোখ অন্ধ হয়ে যায়। পরিবারের পক্ষ থেকে সে সময় চিকিৎসা করিয়ে ৫ লাখ টাকা খরচ করে মাসুদের চোখের আলো ফেরাতে পারেননি তার বাবা-মা। তার পর থেকে ধীরে ধীরে অন্ধ হয়ে যান মাসুদ। অন্ধ হলেও তার জীবনযুদ্ধ থেমে থাকেনি। ১৯৯৩ সালে ১১ বছর বয়সে তিনি টাঙ্গাইল শহরের বিবেকানন্দ স্কুলে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হন। লুইবেন হেলেন ক্লারের ব্রেইলি পদ্ধতিতে ১৯৯৯ সালে পঞ্চম শ্রেণী পাস করে বাড়ি ফিরে আসার পর নিজেকে পরিবারের বোঝা মনে করেন। পরে ওই বছরই বাড়ির পাশে মঙ্গলহোড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে একটি মুদির দোকান দেন। এর পর তিনি কিছুটা হলেও তার বেকারত্বের বোঝা কমাতে সক্ষম হন।
মাসুদ জানান, ২০০১ সালের শেষের দিকে গাজীপুরের টঙ্গী প্রতিবন্ধী প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে বাঁশ-বেতের কাজ শিখতে যান মাসুদ। সেখানেও নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারেননি। কিছুদিন কাজ শেখার পর বাড়ি এসে ফের কর্মজীবনে আটকে যান। বাবার কৃষি পেশায় নিজেকে সম্পৃক্ত করেন। তা থেকে উপাজিত অর্থে সংসার এবং ছোট তিন ভাই-বোন রাসেল, সোহেল ও সালমার পড়ালেখার খরচ চালাতে তাকে হিমশিম খেতে হতো। তখন প্রতিবন্ধী হিসেবে দাদা হামিদ মিয়ার কাছ থেকে পাওয়া ১৩ শতাংশ জমির ওপর ২০১১ সালে হাজারখানেক মুরগি নিয়ে তৈরি করেন লেয়ার মুরগির খামার। মাসুদের খামারে এখন প্রায় ২ হাজার ৩০০ লেয়ার মুরগি রয়েছে। প্রথম ২ বছর নিজেই সব কাজ করতেন। বর্তমানে তার খামারে কর্মচারী হিসেবে কাজ করছেন নীলফামারী জেলার জিয়াউর রহমান নামের এক যুবক। থাকা-খাওয়ার পর তাকে ৭ হাজার টাকা মাসিক বেতন দেয়া হয়। মাসুদ রানার খামার থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে অনেক বেকার যুবক খামার করেছেন। সংসারিক জীবনে মাসুদের স্ত্রী রেখা আক্তার আর একমাত্র মেয়ে অর্পা। অর্পা পাথরাইল মঙ্গলহোড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণীতে পড়ালেখা করছে। তিনি আরও বলেন, কোনো ধরনের আর্থিক সহযোগিতা ছাড়াই তার খামারটি এগিয়ে চলছে। মাসুদের স্বপ্ন এখন দুইটি। এক মেয়ে অর্পাকে সুশিক্ষিত করা এবং খামারটিকে আরও বড় করা। সেখানে সৃষ্টি হবে অনেক লোকের কর্মস্থান।
কর্মচারী জিয়া জানান, অন্ধ হলেও মাসুদ ভাই সব কাজ নিজেই করতে পারেন। স্থানীয় বাজারের ডিমের চাহিদা পূরণ করছে এখন মাসুদের খামার। প্রথম পর্যায়ে বার্ডফ্লু রোগে মুরগি মারা যাওয়ায় খামারের লোকসান হলেও তিনি ভেঙে পড়েননি। বর্তমানে তার মাসিক উপার্জন প্রায় দেড় লাখ টাকা। খামারে মুরগির খাবার দেয়া, পানি দেয়া, ডিম সংগ্রহ থেকে ডিম বিক্রি করা পর্যন্ত সব কাজই মাসুদ নিজে করছেন। পাথরাইল ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ওই গ্রামের আবদুল আজিজ চান খাঁ বলেন, মাসুদ একজন স্বাভাবিক মানুষের মতো জীবন যাপন করছে। চলাফেরা বা কাজকর্মে তাকে কখনোই প্রতিবন্ধী মনে হয় না। বরং মাসুদ স্বাভাবিক মানুষের জন্য একটি মডেলÑ যা অনুসরণ করে একজন স্বাভাবিক মানুষ সাবলম্বী হতে পারে।