ফিরছে পাটের সুদিন

স্বাধীনতা-পূর্বকালে এ বাংলার একমাত্র রপ্তানি পণ্য ছিল পাট। ব্রিটিশদের কাছে যেমন নীল, পাট ইত্যাদি ছিল গুরুত্বপূর্ণ শোষণের আইটেম, ঠিক সেরকমভাবেই পশ্চিম পাকিস্তানিদের কাছেও তখন পাট পণ্যটি ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে গণমানুষকে শোষণের জন্য এর থেকে আর কী পণ্য থাকতে পারে! স্বাধীনতার দীর্ঘদিন পর পর্যন্তও পাট পণ্যটি বাংলাদেশের অন্যতম রপ্তানি পণ্য হিসেবে বিশ্বে বেশ কদর ছিল। এর গুরুত্ব ও প্রয়োজনের ওপর ভিত্তি করে তখন পাটকে বাংলাদেশের ‘সোনালি আঁশ’ বা ‘গোল্ডেন ফাইবার’ বলা হতো। কিন্তু একটা সময় পরে এসে এর গুরুত্ব দিনে দিনে কমতে থাকে। তার কারণ হলো দেশে-বিদেশে এখন পাটের চেয়ে কমমূল্যে কৃত্রিম তন্তু কিংবা সুতা তৈরি হয় যা দিয়ে পাটের বিকল্প হিসেবে কাজ চালানো হয়ে থাকে। সিল্ক, পলিথিনসহ আরও অনেক পণ্য আস্তে আস্তে পাটের জায়গা দখল করতে থাকে। অপরদিকে বাংলাদেশে আশির দশকের পর থেকে সেচ সুবিধা চালু হওয়ার কারণে কৃষিব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন সূচিত হয়। বদলে যেতে থাকে শস্য আবর্তনক্রম। দেশে বোরো আবাদের বিপ্লব হওয়ার কারণে পাট চাষের জন্য আর জমি পাওয়া যাচ্ছিল না। তাছাড়া বহির্বিশ্বে পাটের চাহিদা ও রপ্তানি কমে যাওয়া, দাম কমে যাওয়া, মুক্ত জলাশয়, পুকুর, নদী, খাল-বিলসহ পাট জাগ দেওয়া বা ভেজানোর জায়গা না থাকার কারণে বাংলাদেশের কৃষকরা আস্তে আস্তে পাট চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। সে জন্য দেশে একসময় স্থাপিত পাটকলগুলোও একে একে বন্ধ হয়ে পড়েছিল, যার কারণে দেশের অনেক শ্রমিক বেকার হয়ে গিয়েছিল। এটির ধাক্কাও প্রকারান্তরে তখন দেশের সার্বিক অর্থনীতির ওপরই পড়েছিল। কিন্তু পাটের আবার সুদিন ফেরানোর জন্য সম্প্রতি বর্তমান সরকার কিছু যুগান্তকারী ও যুগোপযোগী ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশের পরিবেশবান্ধব প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের পরিবেশের কথা চিন্তা করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে এসব ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন। তাছাড়া পাটকলগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে যেসব লোক কর্মসংস্থান হারিয়েছিল, তাদের আবার পুনর্বাসন করার বিষয়টি বঙ্গবন্ধুকন্যার মাথায় আগে থেকেই ছিল। আর সে কারণে ১. পাটের উন্নয়নের জন্য সরকারের প্রত্যক্ষ প্রণোদনায় সদ্য প্রয়াত জিন বিজ্ঞানী ড. মাকসুদুল আলম পাটের জীবনরহস্য আবিষ্কারের অংশ হিসেবে ‘জিন বিন্যাস’ বা ‘জেনোম সিকোয়েন্স’ বের করেছেন। সেই একই বিজ্ঞানীই আবার পাটের আরও উন্নয়নের জন্য ক্ষতিকর ছত্রাকজাতীয় রোগ যাতে পাটে ছড়াতে না পারে সে জন্য পাটের বিশেষ প্রকৃতির ছত্রাকেরও জীবনরহস্য আবিষ্কার করে গেছেন। ২. ২০১০ সালে রাসায়নিক উপাদান সমৃদ্ধ পলিথিন কিংবা কৃত্রিম তন্তু ব্যবহার রোধ আইন পাস করেছেন জাতীয় সংসদে। আর শুধু আইন পাস করেই বসে না থেকে সে আইনকে বাস্তবায়ন করার অংশ হিসেবে একটি নির্দিষ্ট ঘনত্বের ও ব্যাসের মধ্যে থাকা পলিথিনের ব্যবহার নিষিদ্ধ করেন। পাশাপাশি ২০১৫ সাল থেকে বাধ্যতামূলকভাবে ধান, চাল, গম, ভুট্টা, চিনি ও সারÑ এ ছয়টি পণ্যের বাজারজাতকরণে পাটের মোড়কীকরণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। সম্প্রতি ওই ছয়টি পণ্যের মোড়কীকরণে সফলতা পাওয়ার পর আলু, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, কাঁচা শাকসবজিসহ আরও বারোটি পণ্যেও তা বাধ্যতামূলক করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ৩. প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কর্তৃক পাটকে সম্প্রতি কৃষিপণ্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। সে জন্য এটি এখন কৃষি মন্ত্রণালয়েরও সব সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতে পারবে। কৃষকরা কৃষি মন্ত্রণালয় থেকেও এর জন্য প্রণোদনা পাবেন। ৪. দেশে এখন পাট দিয়ে ১৩১ ধরনের পরিবেশবান্ধব পণ্য তৈরি করা হচ্ছে। কারণ পাটের তন্তু পচনশীল হওয়ায় তা পরিবেশবান্ধব। কৃত্রিম তন্তুর আগ্রাসন থেকে দেশের প্রকৃতিকে বাঁচানোর জন্য ‘প্যাকেজিং অ্যাক্ট’ বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশেই প্রায় ২০ লাখ কাঁচা পাটের অভ্যন্তরীণ বাজার সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমানে দেশে পাটের মোড়কের চাহিদা রয়েছে ৯০ হাজার পিসের। তবে বর্তমানে ছয়টিসহ নতুন বারোটি নিয়ে মোট আঠারোটি পণ্যে পাটের মোড়ক বাধ্যতামূলকভাবে ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে তা ৮৪ কোটিতে উন্নীত হবে। তাছাড়া ৫০ থেকে ৫৫ কোটি পাটের বস্তারও প্রয়োজন হবে তখন। এতে একদিকে যেমন পাটের ব্যবহার বৃদ্ধি পাবে, অপরদিকে পাটের দাম বৃদ্ধি পেলে কৃষকরা এর উৎপাদনে উৎসাহিত হবে। ৫. বর্তমানে এক মণ পাটের দাম বাজারে ১৮০০ থেকে ২০০০ টাকার মধ্যে। পাটের এমন মূল্যের জন্য পাটচাষিরা নতুন উদ্যমে আগ্রহান্বিত হয়ে পাট চাষের দিকে ঝুঁকছেন। ৬. পাটের জাগ দেওয়া কিংবা ভেজানোর জন্য ঢাকা ও খুলনা বিভাগের ২৮টি উপজেলার প্রতিটিতে ১০টি করে পুকুর খনন করে সেখানে সম্মিলিতভাবে পাট জাগ দেওয়ার ব্যবস্থা গ্রহণার্থে সরকার একটি প্রকল্প গ্রহণ করেছে। এতে পাটের মৌসুমে পাট জাগ দিয়ে পরে আবার সেটাতে বাকি সময় মাছ চাষ করা হবে। ৭. পাট আবাদের আরেকটি বড় দিক হলো এটির মাধ্যমে গোড়া পচে ও পাতা পড়ে মাটির গুণাগুণ বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়। কোনো জমিতে এক মৌসুমে পাট চাষ করা হলে পরে কমপক্ষে দুই মৌসুম পর্যন্ত এর পুষ্টি উপাদান কাজে খাটে। ৮. সর্বোপরি দেশে-বিদেশে এখন পরিবেশ বিষয়ে অনেক সচেতন হওয়ার কারণে দিন দিনই পাটের চাহিদা বেড়ে চলেছে। এভাবে দেশের অভ্যন্তরে চাহিদা বাড়তে থাকলে বিদেশে রপ্তানি বাড়ানো না গেলেও দেশের চাহিদা দিয়েই পাটের সুদিন ধরে রাখা সম্ভব।