ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে চাঙ্গা হচ্ছে গ্রামীণ অর্থনীতি

আসন্ন ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে শহরের তুলনায় গ্রামে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, গরু ও পোশাক বেচাকেনা বাড়ায় চাঙ্গা হচ্ছে গ্রামের অর্থনীতি। আগামী ১২ বা ১৩ সেপ্টেম্বর দেশে কোরবানির ঈদ উদযাপিত হতে পারে। এ হিসাবে কোরবানির বাকি মাত্র দুই সপ্তাহ। শহর থেকে গ্রামের হাটগুলোতে সর্বত্রই কোরবানির প্রস্তুতি চলছে। শহরের চেয়ে বেশি গরু বিক্রি হয় গ্রামে। অনেক খামারি এ উপলক্ষে লাখ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছেন গরুর পেছনে। এছাড়া চামড়া, মসলা, দা, বঁটি, পরিবহন, পোশাকসহ বিভিন্ন খাতের উদ্যোক্তাদের ব্যাপক প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। এ সময় প্রবাসী ও শহরে থাকা স্বজনরা গ্রামের স্বজনদের কাছে বেশি অর্থ পাঠান। এবার ঈদে সম্ভবত ৫ দিনের ছুটি থাকায় চাকরিজীবীরা লম্বা ছুটি কাটাতে গ্রামে যাওয়ায় গ্রামে ভোগ ব্যয়ের পরিমাণও অনেক বেড়ে গেছে। পাশাপাশি চলতি সপ্তাহে বোনাস পাবেন সরকারি কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন ব্যাংকের চাকরিজীবীরা। সবকিছু মিলে দেশের অর্থনীতিতে কোরবানির আমেজ শুরু হয়েছে। তবে এর নেতিবাচক দিকও রয়েছে। বাজারে বাড়তি টাকার প্রবাহের কারণে মূল্যস্ফীতিও বেড়ে যাবে। শহর থেকে টাকা যাচ্ছে গ্রামে।
অর্থনীতিবিদরা বলেন, উৎসব পালন করতে ঈদের কয়েক দিন আগে থেকেই শহরের অধিকাংশ মানুষ গ্রামে স্বজনদের সঙ্গে ঈদ কাটাতে যান। মন্ত্রী, এমপি, রাজনৈতিক নেতাদের অধিকাংশই স্ব স্ব এলাকায় ভোটারদের খুশি করতে একাধিক কোরবানি দিয়ে থাকেন। বর্তমানে আমাদের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির ফলে গ্রাম ও শহরের মধ্যকার পার্থক্য অনেক কমে গেছে। আর শহর নির্ভরতা কমাতে আমাদের দেশীয় শিল্পকে উৎসাহ দিতে হবে। তাই গ্রামের অর্থনীতিকে আরও চাঙ্গা রাখতে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। এটা করা গেলে কর্মসংস্থানের সৃষ্টির পাশাপাশি গ্রামের অর্থনীতি আরও চাঙ্গা হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র বলছে, বাজারে বাড়ছে টাকার প্রবাহ। এ বছর রেমিটেন্স প্রবাহ কিছুটা বেড়েছে। ফলে ঈদুল আজহায় আরও বাড়বে। গত ঈদুল ফিতরে প্রবাসীরা প্রচুর রেমিটেন্স দেশে পাঠিয়েছে। সে সময় ১১৩ কোটি ৬০ লাখ ডলার রেমিটেন্স পাঠিয়েছে। এসব রেমিটেন্সের সিংহভাগই গেছে গ্রামে। পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাব অনুযায়ী, রাজধানীতে নিয়মিত বসবাস করছেন এমন জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ। এদের বড় একটি অংশ স্বজনদের সঙ্গে ঈদ আনন্দ ভাগাভাগি করতে গ্রামে ছুটে যান। এরা বাড়তি খরচের কথা চিন্তা করে গ্রামে যাওয়ার আগে থেকেই সাধ্য অনুযায়ী সঞ্চয় ভেঙে এবং বেতন-বোনাস বাঁচিয়ে সঙ্গে করে প্রচুর টাকাকড়িও নিয়ে গেছেন। এসব টাকা এখন বিভিন্ন প্রয়োজনে গ্রামেই হাতবদল হচ্ছে। এতে গ্রামে অর্থ সরবরাহ অনেক বেড়ে যায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, আমাদের মোট জনসংখ্যার ৮০ শতাংশ গ্রামে বসবাস করে। ঈদ উৎসব পালন করতে শহরের অধিকাংশ মানুষ যান গ্রামের বাড়িতে। ফলে গ্রামে নিত্যপণ্যের চাহিতা ব্যাপক হারে বেড়ে যায়। ঈদকে কেন্দ্র করে বিনোদনের জন্য মানুষ শহর ছেড়ে গ্রামেই বেশি যায়। ফলে গ্রামীণ পর্যটন খাতেও যোগ হয় বাড়তি টাকার প্রবাহ। সার্বিক এই কর্মকা-ের কারণে সাধারণত অন্য মাসের তুলনায় এ সময়ে অতিরিক্ত অর্থের ব্যয় হয়। তিনি বলেন, ঈদুল আজহায় সবচেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় হয় গরু ও নতুন পোশাক ক্রয়ে। এ সময় গরুর ও পোশাকের চাহিদা বাড়ে ব্যাপক হারে। গরুর চাহিদা মিটাতে দেশের বিভিন্ন স্থানে গরুর খামার হয়েছে। সেখান থেকে মানসম্মত গুরু উৎপাদন হচ্ছে। এজন্য মানুষ এখন আমদানি গরু থেকে দেশি গরুর দিকে ঝুঁকছে। এজন্য ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারি উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ দিতে হবে। যাতে তারা গ্রামের চাহিদা মিটিয়ে রপ্তানি করতে পারে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, ঈদের সময় বেশির ভাগ লোকজন গ্রামে স্বজনদের সঙ্গে ঈদ কাটাতে যায়। শহর থেকে গ্রামমুখী হয় টাকা। এতে গ্রামে নিত্যপ্রয়োজনীয় চাহিদা বাড়ে। আর চাহিদা মিটাতে অর্থ ব্যয় হয়। অর্থনীতিতে এর ইতিবাচক দিক হলো বণ্টন ব্যবস্থায় একটি পরিবর্তন হয়। এতে অধিকাংশ মানুষের কাছেই টাকা পেঁৗছে যায়। আর নেতিবাচক দিক হলো মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধির কারণে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যায়। তিনি বলেন, গ্রামের অর্থনীতি মূলত কৃষিনির্ভর। গত কয়েক বছরে কৃষি খাতের ব্যাপক উন্নতি হয়েছে, উৎপাদন বেড়েছে। ফলে গ্রামের লোকজনের হাতে টাকা রয়েছে। উৎসবকে কেন্দ্র করে পণ্য ও যাত্রীবাহী পরিবহন এবং নৌযানের চলাচল বেড়ে যায়। এতেও টাকার প্রবাহ বাড়ে। যেমন যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হওয়ায় এখান থেকে বাড়তি অর্থ যাচ্ছে গ্রামে। একই সঙ্গে বাড়ছে দেশের প্রবৃদ্ধি। গ্রামনির্ভর এ দেশের প্রতিটি গ্রামের মহল্লাতে ৫ থেকে ৭টি এমন পরিবার খুঁজে পাওয়া যাবে, যাদের কোন না কোন সদস্য প্রবাসে থাকেন। তারা উৎসবকে কেন্দ্র করে রেমিটেন্স পাঠান সাধারণ সময়ের তুলনায় বেশি।
গরুর খামারিরা জানান, এবার রাজনৈতিক অস্থিরতা না থাকা, অর্থনৈতিক প্রবাহ বৃদ্ধি, কোরবানির চাহিদা বাড়ায় পাশাপাশি পশুর সরবরাহ ও মজুত ভালো থাকায় গতবারের চেয়ে বিক্রি বেশি হবে ও দাম স্থিতিশীল থাকবে। কড়াকড়ি সত্ত্বেও ভারত ও মায়ানমার থেকে গরু আসছে। এজন্য গরুর প্রত্যাশিত বিক্রি নিয়ে আশান্বিত ব্যবসায়ীরা। সব মিলিয়ে সর্বত্রই এখন কোরবানিকে ঘিরেই চলছে অর্থনীতির নড়াচড়া। প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য মতে, বর্তমানে দেশে গবাদিপশুর সংখ্যা চার কোটি ৯০ লাখ। এর মধ্যে গরু ও মহিষ দুই কোটি ৩৫ লাখ এবং ছাগল ও ভেড়া দুই কোটি ৫৫ লাখ। এবছর কোরবানির উপযোগী এক কোটি ৫ লাখ পশু রয়েছে। এর মধ্যে ৩৩ লাখ গরু ও মহিষ এবং ৭২ লাখ ছাগল ও ভেড়া। গত বছর কোরবানি হয়েছিল ৯৬ লাখ ৩৫ হাজার পশু। অর্থাৎ মন্ত্রণালয়ের হিসাব বলছে কোন কারণে ভারত থেকে গরু আমদানি না হলেও এ বছর পশুর সংকট হবে না।
ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের এক সমীক্ষায় বলা হয়, ঈদে পরিবহন খাতে অতিরিক্ত যাচ্ছে ৬০০ কোটি টাকা। এ উৎসবে ভ্রমণ ও বিনোদন বাবদ ব্যয় হয় ৪ হাজার কোটি টাকা। এসব খাতে নিয়মিত প্রবাহের বাইরে অতিরিক্ত যোগ হচ্ছে এক লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা। এর বাইরে আরও কয়েকটি খাতের কর্মকা- অর্থনীতিতে যোগ হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে সাড়ে ২০ লাখ সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীর সম্ভাব্য বোনাস বাবদ প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা, দেশব্যাপী ৬০ লাখ দোকান কর্মচারীর বোনাস ৪ হাজার ৮০০ কোটি টাকা, পোশাক ও বস্ত্র খাতের ৭০ লাখ শ্রমিকের সম্ভাব্য বোনাস ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, যা ঈদ অর্থনীতিতে বাড়তি আসছে।
কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ীদের সংগঠন হাই অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য মতে, প্রতি বছর প্রায় দেড় থেকে দু’হাজার কোটি টাকার কোরাবানির পশুর বাণিজ্য হয়। যার সিংহভাগ রয়েছে মফস্বল ঘিরে। আর এসব পশুর চামড়া সংগ্রহ করতে গ্রামে গ্রামে আগাম বিনিয়োগ করছেন চামড়া ব্যবসায়ীরা।
দেশে তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ তথ্যমতে, এ শিল্পে ৪০ লাখ শ্রমিক কাজ করে। এসব শ্রমিকের ৯৫ শতাংশই গ্রাম থেকে আসা। যার ৭০ শতাংশই ঈদের ছুটিতে গ্রামের বাড়ি যায়। যাওয়ার কয়েক মাস আগে থেকেই তারা টাকা জমাতে থাকে। এর সঙ্গে এবার শ্রমিকরা ঈদের মাসের বেতনসহ বোনাস নিয়ে বাড়ি যাবেন। বেসরকারি এই প্রতিষ্ঠানের তথ্য মতে, তাদের এক মাসের বেতন ও সঙ্গে ৩০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত বোনাসের টাকার পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ১২শ’ কোটি টাকা।
উল্লেখ্য, কোরবানিতে ব্যবহার হয় এমন পণ্যের মজুতও পর্যাপ্ত। প্রতি বছর দেশে পিয়াজের চাহিদা ২২ লাখ মেট্রিক টন। রসুনের চাহিদা ৫ লাখ মেট্রিক টন, আদা ৩ লাখ টন। এর উল্লেখযোগ্য অংশই কোরবানিতে ব্যবহার হয়। অন্যদিকে গরম মশলা বিশেষ করে এলাচ, দারুচিনি, লবঙ্গ, জিরা, তেজপাতার উল্লেখযোগ্য অংশ কোরবানিতে ব্যবহার হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুসারে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ২ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন এলাচ, ৭ হাজার ৬০০ মেট্রিক টন দারুচিনি, ১৭০ মেট্রিক টন লবঙ্গ এবং ৩৭০ মেট্রিক টন জিরা আমদানি করা হয়েছে। কোরবানির বাজারে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার লেনদেন হবে এসব পণ্যের। কোরবানির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ হল কামার আইটেম। ছুরি, বঁটি, দা, চাপাতি, কুড়াল, রামদা ছাড়া কোরবানিই সম্ভব নয়। সঠিক কোনো পরিসংখ্যান না থাকলে কোরবানিতে পণ্যটির বাজার এক হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায় বলে ধারণা করা হচ্ছে।